রঘুপতির চোখে চশমা ছিল। কাচের রং ঘোলাটে। স্পষ্ট করে তাঁর চোখ দেখা যাচ্ছিল না।
ভদ্রলোককে দেখলেই অভিজাত, রাশভারী, বৈষয়িক বলে মনে হয়।
কিকিরা আগেই পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন তারাপদদের, সাধারণ কথাবার্তা হয়েছে রঘুপতিবাবুর সঙ্গে ওদের।
কিকিরা বললেন, “বৃষ্টিটা থেমে যাবে মনে হচ্ছে।”
রঘুপতি বললেন, “এ-সময় দু-চারদিন বৃষ্টি হয়। শীতের বৃষ্টি।
“যদি বরষে মাঘের শেষ’। “
“মাঘ এখন দেরি রয়েছে,” রঘুপতি বললেন, “ডিসেম্বরের এন্ডে এরকম হয়। কলকাতাতেও হয়। গত বছর তো জানুয়ারিতে গোড়া থেকেই এখানে বর্ষাকাল ফিরে এসেছিল আবার। সাত-আটদিন তুমুল বৃষ্টি।”
তারাপদ বলল, “আপনি প্রতি বছর এই ডিসেম্বরে এখানে থাকেন?”
“শীতটা থাকি। কখনো দেরি করে এসে একেবারে জানুয়ারি মাসটা কাটিয়ে ফিরে যাই। কখনো নতুন বছর পড়তেই। বিশ-বাইশ বছরের মধ্যে বার-দুই শীতটা এখানে থাকতে পারিনি।”
“জায়গাটা আপনার ভাল লাগে?”
“লাগে।…ঠাকুরদার স্মৃতি। বাবা বেঁচে থাকতে এবাড়িতে পুজোয় আর এই শীতে হইহল্লা হত বেশ। তারপর যা হয়, ধীরে ধীরে আসা-যাওয়া কমতে লাগল। আত্মীয়স্বজন সরে গেল একে-একে। আমি আমার স্ত্রী শীতকালটা বরাবরই এখানে কাটাতাম। আমি এখন একলা। মায়া তো ছাড়তে পারি না।” বলে রঘুপতি একটু যেন ম্লান হাসলেন, “তোমরা কি এসব বুঝতে পারবে! বুড়োদের সেন্টিমেন্ট।”
তারাপদ হেসে বলল, “আপনি আবার বুড়ো কোথায়?”
“ফিফটি সিক্স।”
“ছাপ্পান্ন! বোঝা যায় না।”
“আমার বড় ছেলে মেরিনে আছে। তার বয়সেই ছাব্বিশ-সাতাশ। “
“শুনেছি। কিকিরা বলেছেন।”
“কিকিরা!” রঘুপতি হাসলেন, তারপর কিকিরার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনি এরকম একটা নাম বেছে নিলেন কেন? কিঙ্কর নামটাই তো বেশ ছিল মশাই।”
কিকিরা হেসে বললেন, “জাপানি-জাপানি মনে হয় বলে! মিসিকিরা ওকাকুরা কিকিরা।”
রঘুপতি হেসে ফেললেন। তারাপদরাও হাসতে লাগল।
হাসি থামলে কিকিরা বললেন, “এ বাড়িতে কি নতুন কোনও লোক এসেছে?”
“নতুন?” রঘুপতি তাকালেন।
“কাল বিকেলে একটা লোককে দেখেছিলাম। আজ সকালেও দেখলাম।”
“কেমন দেখতে?”
“গাঁট্টাগোট্টা। কালো।”
“ও! আপনি পুজনের কথা বলছেন! ওর নাম পুজন। এবাড়িতেই থাকে।”
“দেখিনি কিনা–তাই বলছিলাম।”
“দেখেননি!” রঘুপতি হাতের চুরুটটা আবার জ্বালাতে লাগলেন। “পুজন ছিল না। ছুটি নিয়ে বাড়ি গিয়েছিল। কালই ফিরেছে।”
“আপনার পোয্য তা হলে কম নয় রঘুপতিবাবু”, কিকিরা হাসতে হাসতে সাদামাটা গলায় বললেন, “মানুষ আপনি একলা, এখানে থাকেনও বছরে দেড়-দু-মাস-লোকজন কিন্তু পুষতে হয় অনেক।”
চুরুট টেনে রঘুপতি বললেন “তা হয়। সকলেই কাজের লোক। ঘরবাড়ি রয়েছে, জমিজায়গার খোঁজ নেওয়া আছে, দেখাশোনারও দরকার করে। ওরাই তো সব করছে। আমি আর কী করি!”।
কিকিরা মাথা নাড়লেন! যেন বললেন, তা তো ঠিকই।
রঘুপতির যেন কী দরকার পড়েছিল, বললেন, “বসুন আপনারা; আমি আসছি–দু-চার মিনিট।”
উনি উঠে গেলেন। ঘরে চুরুটের গন্ধ। বাইরে মিহি বৃষ্টি।
কিকিরা ইশারা করে ঝুল বারান্দাটা দেখালেন। বললেন, “ওই হচ্ছে সেই বারান্দা, যেখান থেকে রঘুপতিবাবু সেই সন্ন্যাসীকে দেখতেন। আগুন নিয়ে যে খেলা দেখাত।” জোরে জোরেই কথাটা বললেন কিকিরা। রঘুপতি যদি কাছাকাছি কোথাও থেকে থাকেন কথাটা শুনলেও শুনতে পারেন।
চন্দন প্রথমে তাকিয়ে থাকল বারান্দার দিকে, তারপর সামান্য ইতস্তত করে উঠে গেল বারান্দার কাছে। তাকিয়ে-তাকিয়ে দেখল বাইরে। বৃষ্টির ঝাপসার দরুন দুরের কিছু দেখা যাচ্ছিল না।
চন্দন বলল, “জায়গাটা এখান থেকে কতদূর?”
“তা অনেকটা। সরাসরি ছ’ সাতশো গজ হবে। হেঁটে যেতে হলে বেশ খানিকটা।”
“এখান থেকে কি অত দূরের জিনিস স্পষ্ট করে দেখা যায়?”
“চোখের জ্যোতি থাকলে যায়। তবে খালি চোখে মোটামুটি বোঝ যাবে।…আর যদি দূরবীন চোখে আঁটো-না-দেখার কিছু নেই।”
“রঘুপতিবাবু কি বায়নাকুলার দিয়ে দেখেছেন?”
“হ্যাঁ। উনি বলছেন–প্রথম দিন নয়, পরে তাই দেখেছেন।”
“ওঁর কাছে আছে যন্ত্রটা?”
“চলনসই একটা আছে।”
“উনি একটা বায়নাকুলার রাখতে গেলেন কেন?”
“শখ!..শখ করে মানুষ কত জিনিস তো রাখে; ক্যামেরা, টেপ রেকর্ডার, বায়নাকুলার, বন্দুক…”।
“রঘুপতিবাবুর বন্দুকও আছে?”
“আছে। এতবড় বাড়ি যার, যথেষ্ট বিষয়-সম্পত্তি, আর যে-জায়গায় থাকেন–জঙ্গলে, একেবারে একপ্রান্তে–তাতে একটা বন্দুক রাখতে দোষ কী! বন্দুকের লাইসেন্স আছে।”
তারাপদ বলল, “কিকিরা, ওই জায়গাটা তো আপনি দেখেছেন।”
“দেখেছি।…তোমাদেরও দেখাব। কিন্তু এই বৃষ্টিই সব ভেস্তে দিচ্ছে। “
আরও দু-একটা কথা বলাবলির মধ্যে রঘুপতি ফিরে এলেন। এসে বললেন, “একটা চিঠি পাঠিয়ে এলাম। এখানে আমার এক বন্ধু আছেন। পশুপতিবাবু। স্টেশনের দিকে থাকেন। রমা কুটির’। ভদ্রলোককে আমি চিকিৎসা করি। উনি বাতের রোগী। শীতে বাদলায় বাতটা বাড়ে। ওষুধটা পালটে দিলাম।”
“আপনি চিকিৎসা করেন?” চন্দন অবাক হয়ে বলল।
“হোমিওপ্যাথি?” রঘুপতি সহজভাবে হাসিমুখে বললেন, “যে-জায়গায় আমরা থাকি, নিজের কখন কী দরকার পড়ে হুট করে, একটু-আধটু হোমিওপ্যাথি জেনে রাখা ভাল। আর আমি তো এই বিদ্যেটা অনেকদিন ধরেই চালাচ্ছি। আমার স্ত্রী অ্যালোপ্যাথি ওষুধ খেতে চাইতেন না। খেলেই নানারকম কমপ্লেন করতেন। তাঁর ওপর দিয়েই হাত পাকিয়েছিলাম প্রথমে।” বলেই হঠাৎ চুপ করে গেলেন। কী যেন ভাবলেন। তারপর চন্দনকে বললেন, “ডাক্তার, আমার স্ত্রী যখন মারা গেলেন তখন অবশ্য অ্যালোপ্যাথিই চলছিল। গুপ্ত-ডাক্তার চিকিৎসা করছিল। ইট ওয়াজ সো সাডেন! সব শেষ হয়ে গেল। ওঁকে নিয়ে আর কলকাতায় যেতে পারলাম না। গেলে অন্তত ভাল চিকিৎসা করাতে পারতাম। মরা বাঁচা ভগবানের হাত। তবু মানুষ তো চেষ্টা করে। আমার কপাল খারাপ। দুদিনের মধ্যে সব হয়ে গেল। সুস্থ মানুষ, কী যে হল–চোখের পলকে চলে গেল। “ রঘুপতি চুপ করে গেলেন।
