“কেমন করে?”
“কলকাতা থেকে তোক আসে রঘুপতিবাবুদের। কমপক্ষে হপ্তায় দু’দিন। দরকার পড়লে তিনদিন। অফিসের লোক। মেসেঞ্জার। একবেলার ব্যাপার। চিঠিপত্র নিয়ে আসে, কাগজে সইসাবুদ করাতে আসে; যখন যা দরকার হয় নোক এসে করিয়ে নিয়ে যায়।”
“আচ্ছা?”
কিকিরা আবার চেয়ার টেনে নিয়ে বসে পড়লেন। বললেন, “অফিস আর বাড়ি–দুইয়ের সঙ্গেই এইভাবে যোগাযোগ রাখেন রঘুপতিবাবু। না রাখলে চলে না। কারবারি লোক। টাকা-পয়সা আছে।”
“সিস্টেমটা ভাল!” তারাপদ বলল “গোপবাৰু কি লোকমুখে খবর পেয়েছিলেন?”
“চিঠি। রঘুপতিবাবু চিঠি দিয়েছিলেন গোপবাবুকে। লোকের হাতে চিঠি পান গোপবাবু।
“উনি, মানে গোপবাবু তা হলে রঘুপতিবাবুর বিশ্বস্ত লোক?”
“তা তো ঠিকই। গোপ খুবই কাজের লোক। রঘুপতির সঙ্গে আগেই পরিচয় ছিল–তবে তখন গোপ অন্য জায়গায় কাজ করতেন। রঘুপতিবাবুদের কাছে বছর দুই আছেন।”
চন্দন বার কয়েক পায়চারি করল ঘরের মধ্যে। “স্যার কিকিরা, সত্যি করে বলুন তো–এই ব্যাপারটার গন্ধ পেয়ে আপনি নিজেই ছুটে এলেন? নাকি এই কাজটার জন্য আপনাকে ডাকা হয়েছে? ডাকল কে? রঘুপতি রাঠোর? না, গোপবাবু?”
কিকিরা হেসে বললেন, “স্যান্ডেল উড, সহজ কথাটা বুঝলে না! গোপ আমার প্রতিবেশী আর বন্ধুর মতন ছিলেন। কিকিরার ক্যালিবার তিনিই জানেন রঘুপতির জানার কথা নয়। গোপই আমাকে পাঠিয়েছেন।”
“ও!…ভাল কথা। তা আপনি এখানে এসে রঘুপতিজিকে কেমন দেখলেন? মানে, তিনি আপনাকে দেখে কেমন ভাব করলেন? আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছেন, এইরকম ভাব করলেন কী?
কিকিরা অল্পক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “সেটাই বুঝতে পারছি না। উনি খুবই অবাক হয়েছিলেন আমাকে দেখে। বোধ হয় আমাকে আশাও করেননি। তবে মনে যাই থাক-মুখে আমাকে মেনে নিয়েছেন। হাবভাবে মনে হয়, খাতির করেন। আর থাকা-খাওয়ার কোনো অসুবিধে রাখেননি কোথাও! এই যে তোমাদের নেমন্তন্ন করে আনলুম এখানে–উনি জানেন। না করেননি। বরং বললেন–বেশ তো, ওরা আসুক না। ভালই হবে।”
তারাপদ কিছু ভাবছিল। বলল, “যা ঘটার আপনি আসার আগেই ঘটে গিয়েছে। তারপর আর কিছু হয়নি?”
কিকিরা মাথা নাড়লেন, “আগুন আর দেখা যায়নি। গেরুয়াধারীকেও নয়। তবে অন্য দু-চারটে খুচরো ব্যাপার হয়েছে। “
“যেমন?”
রঘুপতিবাবুর শরীর খারাপ হয়েছে। চুনিয়া নদী–যদিও সেটা নদী নয়–পাহাড়ি জল বয়ে-যাওয়া একটা স্রোত বলতে পারো–সেই চুনিয়া নদীতে একটা ক্যাম্বিসের ব্যাগ পাওয়া গেছে।”
“ক্যাম্বিসের ব্যাগ?”
“ক্যানভাস ব্যাগটার ভেতরে একটা হাতুড়ি। বরদস্ত হাতুড়ি। হাতলটা ধরো হাতখানেক মতন, আর লোহার মুণ্ডুটা বিঘতখানেক।
তারাপদ আর চন্দন মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। কিছুই বুঝল না।
শেষে তারাপদ বলল, “কিকিরা, এ যে ডিটেকটিভ নভেল হয়ে যাচ্ছে। রহস্য আর রহস্য। আগুন, আগুনের ওপর হাঁটা, অজ্ঞাত ব্যক্তির মৃত্যু, গৃহস্বামীর অসুস্থতা, তারপর হাতুড়ি..পর-পর-ওরে বাব্বা!” গলায় খানিকটা হালকা ভাব তারাপদর। মনে-মনে অবশ্য অন্যরকম ভাবছিল।
কিকিরা বলেন, “তোমাদের সেই গান আছে না–মেঘের পরে মেঘ জমেছে, এ অনেকটা সেইরকম। মিস্ত্রির পর মিস্ত্রি!”
“রঘুপতিবাবু সব জানেন?”
“জানেন। শুধু একটা জানেন না। হাতুড়ি জানেন না।”
“কী বলছেন উনি?”
“বলছেন, তিনি কিছুই ধরতে পারছেন না। তাঁর বাড়ির কাছে এ-সমস্ত ঘটনা ঘটল কেন?”
“আপনি কিছু বুঝতে পারছেন?”
“বোঝার চেষ্টা করছি।” বলে উঠে দাঁড়ালেন কিকিরা। হাই তুললেন। আগুনের কাছে গেলেন আবার, “ঠাণ্ডাটা বড় বেয়াড়াভাবে পড়েছে হে, তারাপদ! বুড়ো হাড়ে আর সহ্য হয় না। এদিকে যদি এই বৃষ্টি চলতে থাকে তবে একেবারে কফিন!
“কফিন?”
“কবরের বাক্স।”
“আপনি কবরে যাবেন কেন?”
“কবরটা আমার বেশ লাগে। বাক্সর মধ্যে আরামে থাকলুম। থাকতে-থাকতে বেরিয়ে এলুম।”
“বেরিয়ে এলেন? বলেন কী!..আপনি কি ভূত-শক্তি?”
“না, ভূত নয়। তবে পারি। বন্ধ বাক্স থেকে বেরিয়ে আসতে পারি। ম্যাজিক। হুডিনির ম্যাজিক। কিকিরা দ্য গ্রেট ম্যাজিকটাকে আরও এক কাঠি ইমপ্রুভ করে নিয়েছে। প্রবেশ করব ধুতি-চাদর পরে। বেরিয়ে আসব গেরুয়া আলখাল্লা পরে খঞ্জনি বাজাতে বাজাতে। হাউ বিউটিফুল।” বল কিকিরা হেসে খঞ্জনি বাজাবার ভঙ্গি করলেন।
.
০৩.
সকালে বৃষ্টির চেহারা দেখে মনে হচ্ছিল, দুপুর বা বিকেল নাগাদ বাদলা আবহাওয়াটা কাটলেও কাটতে পারে। ঝিরঝির বৃষ্টি থামছিল, হচ্ছিল আবার থামছিল। আকাশে মেঘ থাকলেও সেটা ঘন নয়, সাদাটে। দু-চারবার মেঘ সরে আলোও উঁকি দিয়ে গেল।
রঘুপতিকে ঘিরে কিকিরারা বসে ছিলেন। দোতলায়। রঘুপতির বসার ঘরে।
বসার ঘরটি বড় নয়, মাঝারি। সেকেলে বাড়ি। কাঠের কড়ি বরগা। জানলা-দরজা বড়। জানলায় শার্সিও রয়েছে। ভেতরের দেওয়াল শক্তপোক্ত, সাধারণ প্লাস্টার। ঘরের দু’দিকে দুই দেওয়াল আলমারি, এমনি আলমারিও একজোড়া, ভারী গোছের সোফা সেটি। দেওয়ালে দু-চারটে ছবি, হরিণের মাথা একটা, দেওয়াল ঘড়ি। মোটামুটি সবই আছে–তবে খুব সাজিয়েগুছিয়ে রাখা নয়।
বসার ঘরের গা-লাগিয়ে ঝুল বারান্দা।
তারাপদরা রঘুপতিকে দেখছিল।
রঘুপতির বয়েস পঞ্চাশ পেরিয়েছে বোঝা যায়। তবে শরীরের কাঠামো মজবুত। উনি মাথায় তেমন লম্বা নন, মাঝারি হতে পারেন। প্রায়-গোল মুখ। থুতনির দিকটা ফোলা। গালে দু-চারটি দাগ আছে বসন্তের। ফরসা রং গায়ের। মাথার চুল পাতলা। মাঝখানে সিঁথি।
