কিকিরা উঠে দাঁড়ালেন। চুপ করে থাকলেন সামান্য সময়। তারপর পাঁচ-দশ পা সরে ফায়ার প্লেসের মতন জায়গাটায় গিয়ে দাঁড়ালেন। সেখানে চৌকোনা উনুনের মতন পাত্রে কাঠকয়লার আঁচ উঠেছিল। কিকিরা নুয়ে পড়ে সিগারেটের টুকরোটা আগুনে ফেলে দিলেন। দিয়ে হাত সেঁকতে লাগলেন।
তারাপদরা অপেক্ষা করতে লাগল।
শেষ পর্যন্ত কিকিরা সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। বললেন, “রঘুপতিবাবু একদিন শেষ বিকেলে নিজের ঘরের ব্যালকনিতে বসে ছিলেন, হঠাৎ চোখে পড়ল দূরে এক জায়গায় আগুন জ্বলছে। ঠিক দাউ দাউ করে যে জ্বলছে তা নয়–খানিকটা জায়গা জুড়ে জ্বলছে; শুকনো পাতাটাতায় আগুন ধরিয়ে দিলে যেভাবে জ্বলে, সেইভাবে জ্বলছে।”
তারাপদ চন্দনের দিকে তাকাল। চন্দন কিকিরার দিকে তাকিয়ে আছে একদৃষ্টে।
কিকিরা বললেন, “রঘুপতিবাবু প্রথমে ভেবেছিলেন, শীতের সময় বনে-জঙ্গলে, পাহাড়ে বড় বড় গাছের তলায় ঝরে পড়া শুকনো পাতা জড়ো করে যেভাবে আগুন জ্বালানো হয়–সেইরকমই ব্যাপার। তবে শুধু পাহাড়ে-জঙ্গলে নয়–এমনিতেও সাফসুফ রাখার জন্য লোকে এখানে-ওখানে জঞ্জাল জ্বালিয়ে দেয়। সাধারণ দৃশ্য বলে তেমন নজর করতে চাননি। কিন্তু হঠাৎ তাঁর নজরে পড়ল, একটা লোক সেই আগুনের ওপর হাঁটছে। হাঁটতে-হাঁটতে দাঁড়িয়ে পড়ল মাঝখানে, আগুনটাও ধীরে ধীরে নিভে এল।“
চন্দন বলল, “আগুনের ওপর হাঁটছে?”
“হ্যাঁ।”
“মানে–সেই–কী যেন বলে-ফায়ার ওয়ার্কিং না কী যেন!”
“বলে।”
তারাপদ বলল, “আগুনের ওপর হাঁটবে কেন? ব্যপারটা কী?”
কিকিরা বললেন, “লোকটাকে কেমন দেখতে ছিল সেটা শোনো। তার গায়ে টকটকে লাল-গেরুয়া রঙের আলখাল্লা। মাথার চুল বড়বড়কাঁধ পর্যন্ত ছড়ানো। লম্বা দাড়ি।”
“সাধু-সন্ন্যাসী?”
“বেশভূষা সেইরকম।”
“তারপর?”
“আগুন নিভে যাওয়ার পর লোকটিও অদৃশ্য হয়ে গেল।…রঘুপতিবাবু এই ধরনের অদ্ভুত দৃশ্য দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। তবু তিনি ভয় পাননি। ভেবেছিলেন, চোখের ভুল বা নিজে ঠিক মতন ধরতে পারেননি ব্যাপারটা।”
“তা হতে পারে।“
“আগে সবটা শোনো,” কিকিরা বললেন। বলে তারাপদদের দিকে এগিয়ে এলেন। “এই একই দৃশ্য যদি তুমি বারবার দেখোতখনো কি মনে হবে চোখের ভুল?”
তারাপদ চন্দনের মুখের দিকে তাকাল। চন্দন বলল, “রঘুপতিবাবু এই একই ব্যাপার–আবার দেখেছেন। “
“পর-পর তিনবার। দু-তিনদিন অন্তর।”
“বলেন কী!”
“এর পর যা ঘটল সেটা বড় মারাত্মক ব্যাপার। ভয়ঙ্কর। যে জায়গায় ঘটনাটা দেখা যেত ওরই কাছাকাছি এক জায়গায় একটা লোককে মরে পড়ে থাকতে দেখা গেল।”
তারাপদ আঁতকে ওঠার শব্দ করল। সঙ্গে সঙ্গে তার মনে পড়ে গেল স্টেশনের টিকিটবাবুর কথা। কী যেন বলছিলেন ভদ্রলোক! একই লোক নয়–এইরকম কিছু একটা বলছিলেন কিকিরাকে।
চন্দন বলল, “মারা গেল কীভাবে?”
“ওপর থেকে নিচে পড়ে গিয়ে। মাথায় লেগেছিল। বড় পাথরের ওপর পড়ে গিয়েছিল লোকটা।”
“পুলিশ কী বলল?”
“এ-সব ছোটখাটো জায়গায় থানা বলে একটা আখড়া অবশ্য থাকে। কিন্তু তারা কোনো কর্মের নয়। নামকো বোস্ত থাকা। চুরি ছাঁচড়ামি হলে লাঠি নিয়ে ঘোরে, ডাকাতি হলে টহল মেরে আসে। বিহারের এই ছোট জায়গায় অন্য ক্রাইম আর কী হতে পারে চুরিচামারি ছাড়া! মরে গেছে তো গেছে। পুলিশ কিছুই করল না, করতে পারল না। অ্যাকসিডেন্ট কেস। সাবডিভিশনের থানার ওপরঅলাকে জিজ্ঞেস করে লাশ পুড়িয়ে দিল।”
“লাশ পুড়িয়ে দিল?”
“কী করবে! এখানে কি মর্গ আছে?…লাশ পচতে শুরু করেছে, মাথার ওপর শকুনের ঝাঁক নেমেছে.”
“লোকটা কে?”
“কেউ জানে না। এখানকার লোক নয়।”
“আইডেন্টিফিকেশন হল না?”
“না।”
তারাপদ উঠে গেল হাত সেঁকতে। বৃষ্টি বোধ হয় পড়েই চলেছে। শীত যেন বেড়েই উঠছিল।
কিকিরা বললেন, “একটা ব্যাপার কী জানো? অজানা-অচেনা একটা লোক ওইভাবে মারা যাওয়ার পর আগুন জ্বলার ব্যাপারটাও বন্ধ হয়ে গেল। আর কেউ আগুনের ওপর দিয়ে হাঁটল না।”
“তার মানে–যে-লোকটা আগুন জ্বালাত, জ্বালিয়ে আগুনের ওপর হাঁটত–সেই লোকটাই মারা গেল।”
“তাই তো দাঁড়াচ্ছে।”
তারাপদ হঠাৎ বলল, “আপনি আসার আগেই এসব ঘটনা ঘটে গিয়েছে?”
মাথা নাড়লেন কিকিরা। “আমি যেদিন এখানে এলাম–তার তিন-চারদিন আগে লোকটা মারা গিয়েছে। আমি এসেছি, একুশে ডিসেম্বর। আঠারোই ডিসেম্বর লোকটা মারা গিয়েছে।”
“আপনি এসে লোকটাকে দেখেননি?”
“না।”
“সে কি সাধু-সন্ন্যাসী ছিল?”
“এরা বলছে, নয়। যে-লোকটা আগুনের ওপর দিয়ে হাঁটত–তার বড় বড় চুল ছিল ঘাড় পর্যন্ত, দাড়ি ছিল। যে-লোকটা মারা গেল– তার চুল-দাড়ি ওরকম ছিল না।”
“তা হলে তো আলাদা লোক!”
“তা তুমি কেমন করে বলতে পারো? চুল-দাড়ি লাগিয়ে স্টেজে তো লোকে কত কী সাজে! নারদমুনি, আলমগির…!”
চন্দন বুঝতে পারল, কথাটা বলার আগে সে খেয়াল করেনি তেমন করে। ঠিকই তো! চুল-দাড়ি নকলও হতে পারে।
তারাপদ বলল, “একটু বুঝতে দিন স্যার। সব গুলিয়ে যাচ্ছে। তার আগে একটা কথা বলুন। আপনি বললেন, আপনার বন্ধু গোপবাবু আপনাকে এখানে পাঠিয়েছেন। ঠিক কিনা!”।
“বিলকুল ঠিক।”
“তিনি আছেন কলকাতায় রঘুপতিবাবু আছেন এখানে, ময়ূরগঞ্জে। এখানে কি ফোন আছে যে দুজনের মধ্যে কথা হয়ে যাবে রাতারাতি?”
কিকিরা বললেন, “এখানে ফোন নেই। তবে রাতারাতি না হোক-চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে খবরাখবর দেওয়া-নেওয়া হয়ে যায়।”
