“কিকিরা আমাদের কোথায় নিয়ে এলেন কে জানে!”
কথাটা কানে গিয়েছিল কিকিরার। বললেন, “ ‘দানব দমন’ পালার নাম শুনেছ? কোত্থেকেই বা শুনবে তোমরা! যোগেন পাণ্ডার রয়েল অপেরার পয়লা নম্বর পালা। তাতে ছিল : এ কী মল্লভূমি সেনাপতি, চতুর্দিকে শিবারব, অট্টহাসি হাসে ওই পিশাচের দল, কম্পিত আমার বক্ষ…”
বাধা দিয়ে তারাপদ বলল, “আমাদেরও বক্ষ কম্পিত হচ্ছে কিকিরা। এটা কি বাড়ি, না গোরস্থান?”
“ধৈর্য বস্তুটা তোমাদের একেবারেই নেই, তারাপদ। তোমরা ভাবো যা হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে হয়ে যাক। আরে বাবা, এটা ওয়ান ডে ক্রিকেট নয়। পাঁচ দিনের খেলা। ধৈর্যং, ধরয়তি বৎস?”
তারাপদরা হেসে ফেলল।
কথা বলতে বলতে বাড়ির ঢাকা বারান্দায় পৌঁছে গিয়েছিল ওরা। স্পষ্ট করে না হলেও বিরজুর লণ্ঠনের আলোয়, আর কিকিরার টর্চের দৌলতে বারান্দার খানিকটা চোখে পড়ল। বারান্দাটা যেন তিন ভাগে ভাগ করা। মাঝের ভাগটা এগিয়ে, পাশেরগুলো পিছিয়ে। গোল চাঁদোয়ার মতন ছাদ বারান্দাগুলোর।
বিরজু হাঁকডাক করার আগেই লণ্ঠন হাতে দুটি ছোকরা এসে গেল। মুটের কাছ থেকে মালপত্র নামিয়ে নেবে, নিয়ে যথাস্থানে রাখবে বোধ হয়।
কিকিরা বললেন, “বাবু কোথায়?”
একজন বলল, “বাবুর শরীর ভাল নয়। শুয়ে আছেন। বলতে বললেন, কাল সকালে দেখা হবে।”
কিকিরা বললেন, “ঠিক আছে। নাও তোমরা মালপত্র তুলে নাও। নিয়ে দোতলায়…! তাই না বিরজুবাবা?”
বিরজু বলল, “হ্যাঁ। সব ঠিক করা আছে।”
.
০২.
বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়ে গিয়েছিল। জোরে নায়, মাঝারিভাবে।
দোতলার একটা ঘরে কিকিরারা বসে ছিলেন। চা-খাওয়া শেষ হয়েছে। খানিকটা আগে। গোল টেবিলের ওপর থেকে কাপ, প্লেট, সসের বোতল, চামচ সব পরিষ্কার করে তুলে নিয়ে গিয়েছে কাজের লোক। ঘরের মধ্যে একটা গোল ধরনের টেবিল বাতি জ্বলছিল। কেরোসিনের বাতি। আলো মোটামুটিভাবে ছড়িয়ে পড়ছিল ঘরে। তবে লালচে আলোলা।
ঘরের জানলাগুলো বন্ধ। শার্সি, কাঠ দুইই। ঘরের এককোণে ফায়ার প্লেসের মতন জায়গাটায় একটা চৌকোনো উনুন মতন। তাতে কাঠকয়লার আঁচ। ঘরটা গরম রাখার চেষ্টা।
কিকিরা সিগারেট খেতে-খেতে বললেন, “এবার তা হলে শুরু করা যাক।”
তারাপদও সিগারেট খাচ্ছিল। বলল, “করুন, আর কত ধাঁধায় রাখবেন।”
কিকিরা বললেন, “বিগিনিংটা বলি তবে। দিন দশ-পনেরো আগে আমার কাছে কলকাতার বাড়িতে এক ভদ্রলোক দেখা করতে যান। আমার চেনা লোক। গোপবাবু। এক সময় গোপবাবু আমার প্রতিবেশী ছিলেন। প্রায়ই গল্পগুজব করতে আসতেন। ওই গোপবাবু এখন রঘুপতিবাবুদের কলকাতার অফিসে কাজ করেন।”
“কিসের অফিস?”
“ট্রাভেলিং এজেন্সির অফিস। রঘুপতিবাবুদের অনেকরকম ব্যবসা। বড় ব্যবসা বলতে, জাহাজের ঠাণ্ডি মেশিন সারানোর একটা কারবার, সেটা কলকাতায়। বজবজে এক কারখানা আছে; সেখানে–ওই তোমার কী বলে–ড্যাম্প পুফ পাউডার তৈরি হয়, কেমিক্যাল প্রোডাক্ট। ঘরবাড়ি বানানোর সময় লাগে জিনিসটা। আর ওই ট্রাভেলিং এজেন্সি’। মিশন রোয়ে অফিস।…তা গোপবাবু একদিন এসে বললেন, তাঁর মালিক একটা ঝঞ্ঝাটে পড়েছেন, আমি যদি ব্যাপারটা একটু দেখি বড় ভাল হয়। বিনি পয়সার কাজ নয়, যা লাগে পাওয়া যাবে। “
“আপনি রাজি হয়ে গেলেন?”
“নিমরাজি। ব্যাপারটা না বুঝে কি রাজি হওয়া যায়!…তবে মুশকিল হল কি জানো, আমি যাঁর সঙ্গে কথা বলব সেই রঘুপতিবাবু তো এখানে–ময়ূরগঞ্জে। ঘটনাটাও এখানকার। গোপবাবু ভাল করে কিছু বলতে পারেন না। আমায় ধরেবেঁধে লোক দিয়ে এখানে পাঠিয়ে দিলেন। তোমাদের কোনোরকমে একটা খবর দিয়ে চলে এলাম আমি। এসেই কিন্তু চিঠি দিয়েছি।”
চন্দন মাথা নাড়ল। “তা দিয়েছেন। আমি আবার ভেবেছিলাম দিন কয়েক দিঘা ঘুরে আসব। ছুটি নিয়েছিলাম।”
“দিঘা! ও তো ঘরের কাছে। পরে যাবে যখন খুশি।” সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে হাত নাড়লেন কিকিরা, যেন দিঘার ব্যাপারটা হাত নেড়ে দূরে হটিয়ে দিলেন। এবার একটু মন দিয়ে শোনো।”
“বলুন।”
“গোড়ার কথা একটু বলি,” কিকিরা বললেন, “রঘুপতিবাবু যদিও কলকাতাতেই থাকেন, তবু বছরে বার দুই করে এখানে–তাঁদের নৃসিংহ সদনে আসেন। এই বাড়িটার ওপর তাঁর খুবই মায়া-মমতা। পৈতৃক বাড়ি। ষাট-সত্তর বছর হতে চলল। তা ছাড়া এখানে রঘুপতিবাবুদের কিছু জমি-জায়গা বিষয়-সম্পত্তি আছে। মাঝে-মাঝে খোঁজ-খবরও নিতে হয়।”
“শীতকালেই আসেন বুঝি?”
“বর্ষার গোড়ায় আসেন একবার। ধানী জমি আছে। চাষবাসের ব্যবস্থা করে দিয়ে যান। আর আসেন শীতের মুখে। কালীপুজো নাগাদ। এই সময়টায় এসে এক-দেড় মাস থেকে যান টানা। আসেন বাড়ির টানে। ওঁর স্ত্রী এখানেই মারা গিয়েছিলেন–সেটাও একটা কারণ। তা ছাড়া বাইরে বাড়িঘর থাকলে লোকে একবার শরীর সারাতে আসে–এটা বনেদি রেওয়াজই বলতে পারো।”
তারাপদ বলল, “রঘুপতিবাবু এবারে কবে এসেছেন?”
কালীপুজোর পর। নভেম্বর মাসের শেষদিকে।
“তারপর?”
“এসে ভালই ছিলেন। অন্য-অন্যবার আসার পর যেভাবে সময় কাটে সেইভাবেই দিন কাটছিল। সকাল-বিকেল ঘরে বেড়ান অনেকটা, চেনা লোকজনের সঙ্গে গল্পগুজব করেন, বইটই পড়েন–মানে দিনগুলো আরাম আয়াস করেই কাটাচ্ছিলেন। হঠাৎ একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। বরং বলতে পারো, ঘটতে লাগল।”
“কী ঘটনা?”
