“মাঝে-মাঝে জিভের স্বাদ পালটাতে হয়।…তবে কি জানো, এখানে রাঘব মানে রামচন্দ্র নন, রঘুপতি রাঠোর।”
“রঘুপতি রাঠোর! দারুণ নাম! ছত্রপতি বংশের নাকি?” বলে হাসল তারাপদ।
“জানি না।…আমি যেখানে উঠেছি-নৃসিংহ-সদন, তার মালিক এই রঘুপতি।”
“আচ্ছা।”
“দেখলে বুঝতে পারবে। মানুষটিকে মালুম করতে পারবে খানিকটা। সেইসঙ্গে বাড়িটা দেখলেও চমৎকৃত হবে।”
“চমৎকৃত!
“ওই হল বাবা!..তা এই রাস্তায় হাঁটতে-হাঁটতে অত কথা বলা যাবে না। আগে বাড়িতে চলো। একটু জিরিয়ে নিয়ে ডবল ডোজ চা, ডবল ডিমের ওমলেট, পটেটো ফ্রাই, টমাটো সস খাও–পেট জুডোেক–তারপর আস্তে-আস্তে সব শুনবে। এখন রাস্তা দেখে পথ হাঁটো, নয়ত হোঁচট খাবে।” বলে টর্চের আলোটা আরও কাছাকাছি ছড়িয়ে দিলেন।
চন্দন বলল, “জায়গার নাম ময়ূরগঞ্জ, অথচ রাস্তা আর মাঠ দেখে মনে হচ্ছে–এর নাম হওয়া উচিত ছিল পাখরগঞ্জ।”
কিকিরা মজা করে বললেন, “নামের মহিমা আছে হে! পরে শুনো–এখন সাবধানে এগোও আর খানিকটা, তারপর মাঠ ধরব। শর্টকাট। মাঠ পরিষ্কার।”
মুটে দুটো সামনেই ছিল। যেতে-যেতে নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল নিচু গলায়। ওদের গায়ে ভুট কম্বলের মতন জামা, গামছায় কান-মাথা জড়ানো। চেনা রাস্তা বলে ওদের যেন কোনো অসুবিধেই হচ্ছিল না, অন্ধকারের মধ্যে দিয়েও চলে যাচ্ছিল দিব্যি।
খানিকটা তফাতে দু-চার ঘর কুঁড়ে। একটা ঝুপড়ি। টিমটিপে বাতি জ্বলছে। মাঠে যেন আরও জোর বাতাস। আকাশের কোনো প্রান্তেই তারা নেই। মেঘ ডাকছিল আগের মতনই।
কিকিরা বললেন, “রাত্তিরে ঠিক বুঝছ না, জায়গাটা কিন্তু সত্যিই ভাল।
“স্বাস্থ্যকর বলছেন?”
“খুবই স্বাস্থ্যকর। যেসব বাঙালিবাবু পুজোয় আর বড়দিনে জল-হাওয়া বদলাতে বেরিয়ে পড়ে, তারা এখনও এই জায়গায় খবর পায়নি। পেলে আর রক্ষে রাখবে না। মধুপুর-দেওঘর করে তুলবে। জায়গাটা কিন্তু পুরনো। বাঙালিবাবুদের বাড়িও আছে কিছু।”
“কই, চোখে তো পড়ছে না?” চন্দন বলল।
“এ-পাশে চোখে পড়বে না। আমরা শর্টকাট করে যাচ্ছি। বড় রাস্তা ঘুরে গেলে দেখতে পেতে। বাহারি নামও আছে বাড়ির : “সন্ধ্যানীড়’, “রুবিভিলা’, “মিতালি-লজ’, “ব্লু হাউস’, “মুন লাইট। আবার “দীননাথ’, মাতৃস্মৃতি’–তাও আছে।”
“সব বাড়িই কি একদিকে, না…?”
“উঁহু! দু-চারটে স্টেশনের বাঁদিকে, বাকিগুলো এদিকে।”
“আপনার নৃসিংহ-সদন?”
“একেবারে শেষদিকে। লাস্ট।”
“তা আপনার গৃহস্বামী রঘুপতি রাঠোর কোথাকার লোক?”
“সাত পুরুষ আগে কোথা থেকে এসেছিলেন কে জানে! এখন বাঙালি। রাঠোর পদবিটাকে বাড়িয়ে নিয়ে রায় রাঠোর করে নিয়েছেন।”
“তা হলে তো স্যার আপনার জাত–কিঙ্করকিশোর রায়!” তারাপদ হেসে ফেলল।
“গৃহস্বামীর বয়েস?” চন্দন জিজ্ঞেস করল।
“বয়েস, পঞ্চাশের ওপর। বাহান্ন-তিপান্ন। মাতৃভাষা বাংলা। পত্নী বিগত। দুই পুত্রের মধ্যে একজন এখন জাহাজে-জাহাজে ঘুরে বেড়াচ্ছে সমুদ্রে। মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। অন্যজন কলকাতার বাড়িতে। সে বেচারির ছেলেবেলায় পোলিও হয়ে পা দুটো জখম হয়ে গেছে। দাঁড়াতে পারে না ভাল করে। কলকাতায় তাকে দেখাশোনা করার লোক আছে বলে তাকে কলকাতার বাড়িতেই রাখতে হয়। এখানে তাকে রাখার নানান অসুবিধে। খুব কমই এখানে এসেছে। তা ছাড়া রঘুপতিবাবু নিজেও কলকাতাতেই বেশি থাকেন।”
তারাপদ কিছু বলতে যাচ্ছিল এমন সময় জোরে মেঘ ডেকে আকাশময় ছড়িয়ে পড়ল। বিদ্যুও চমকে গেল কাছেই।
কিকিরা বললেন, “তাড়াতাড়ি পা চালাও। বৃষ্টি এসে পড়লে ভিজে ন্যাতা হয়ে যেতে হবে।”
চন্দনরা জোরে হাঁটতে লাগল। হাঁটতে-হাঁটতে বলল, “কিকিরা-স্যার—ঘটনাটা কি এই রঘুপতি রাঠোরকে নিয়ে?”।
“হ্যাঁ।..এখন আর কথা নয়, কাজ। মুখ বন্ধ করো, পা চালাও; রানিং লাগাও।
.
বৃষ্টি আসেনি। বৃষ্টি আসার তোড়জোড় অবশ্য বেড়েছে। তারাপদরা নৃসিংহ-সদন-এ পৌঁছে গিয়েছিল।
বাড়ি দেখে তারাপদ বলল, “কিকিরা, এটা কি ভূতের বাড়ি?”
কিকিরা সেকথার কোনো জবাব না দিয়ে একটি লোককে দেখিয়ে দিলেন। লোকটির হাতে লণ্ঠন। বছর চল্লিশ বয়েস হতে পারে, ঠিক ছোকরা নয়, আবার বয়স্কও নয় তেমন। হাতে লণ্ঠন, গায়ে গরম চাদর, পরনে ধুতি। স্বাস্থ্যবান চেহারা।
লোকটিকে দেখিয়ে কিকিরা বললেন, “চন্দন, এর নাম বিরজু। আদিতে বিরিজলাল। আমি বলি বিরজুবাবা। নামটা হিন্দুস্থানি হলে কী হবে বিরজুবাবা বারো-চোদ্দ বছর বয়েস থেকে এবাড়িতে।” বলে বিরজুর দিকে তাকালে কিকিরা, “এ বাড়িতে তোমার কত বছর চলছে বিরজুবাবা?”
“পঁচিশ বছর।“ পরিষ্কার বাংলায় বলল বিরজু। “বুড়োবাবু আমায় বিরজু বলে ডাকতেন।”
“বুড়োবাবু? মানে রঘুপতিবাবু?”
“না। বাবুর বাবা।”
তারাপদরা আর কিছু বলল না। বাগানের সরু পায়ে-চলা পথ ধরে এগিয়ে যেতে লাগল। চারপাশে গাছপালা। আগাছার জঙ্গলে বাগান যেন ভরে আছে। গাছগাছালির গন্ধ। বাতাসের ঝাঁপটা আরও বাড়ছিল। অন্ধকারেই বাড়িটা আবছাভাবে অনুমান করা যাচ্ছিল। পুরনো বাড়ি। কত পুরনো তা এই অন্ধকারে বোঝা যায় না।
তারাপদ নিচু গলায় চন্দনকে বলল, “চাঁদু, থিয়েটারের সিনে যেমন ভাঙা দুর্গ আঁকা থাকে–সেইরকম দেখাচ্ছে না বাড়িটা?”
চন্দন বলল, “আমি কিছু দেখতে পাচ্ছি না; কালোকালো দেওয়ালই দেখছি। “
