টিকিটবাবু ছোকরা। বাঙালি। চন্দনদের দেখে নিয়ে হেসে কিকিরাকে বলল, “আপনার গেস্ট, দাদু?”
কিকিরা বললেন, “রেসপেক্টেল গেস্টস্! ইনি হলেন ডাক্তার, ধন্বন্তরি; আর উনি সেতার, কলকাতায় ওঁর খুব নাম সেতারে..” বলে হাত দিয়ে আঙুল নেড়ে সেতারবাদ্যটা বুঝিয়ে দিলেন। হেসে বললেন আবার, “চলি, রাহাবাবু। অনেকটা যেতে হবে। বৃষ্টি এসে গেলেই মরব।” পা বাড়িয়ে কী মনে পড়ে যাওয়ায় আচমকা জিজ্ঞেস করলেন, “নতুন আর কোনো খবর আছে?”
টিকিটবাবু মাথা নাড়লেন। “তেমন খবর কিছু নেই?”
“তেমন নেই, তা এমন খবর কী আছে?”
“এমনও বলার মতন নয়। তবে লোকে বলছে, যে-লোকটা মারা গিয়েছে। সেই লোক আর যাকে আগুনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যেত তারা এক নয়।”
“আচ্ছা! লোকে বলছে..! চলি, রাহাবাবু।”
ওভারব্রিজে উঠেই শীতের দাপটটা আরও বোঝা গেল। পৌষ মাস, ডিসেম্বরের একেবারে শেষ। কনকনে বাতাস আসছে ঝাঁপটা মেরে। আকাশে মেঘ। চারপাশ জুড়ে যে ভীষণভাবে মেঘ ডাকছে তা অবশ্য নয়, কিন্তু গুড়গুড় শব্দটা রয়েছে। দূরের বিদ্যুৎ-চমক চোখে পড়ার মতন নয়। বেশ অন্ধকার হয়ে গিয়েছে এরই মধ্যে। অথচ সবেই সন্ধে এখন। শীতের দিনে এই সময়টাকেই রাত বলে মনে হয়।
ওভারব্রিজের সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে কিকিরা বললেন, “ট্রেনে এলে কেমন?”
“এলাম। ভিড় মোটামুটি।…এক্সপ্রেস গাড়ি। শুনলাম–গাড়িটা সব সময় লেট রান করে বলে অনেকেই এই ট্রেনে আসতে চায় না, রাত্তিরের মেল নেয়।”
“তোমাদের বরাত ভাল হে! এ ট্রেন চার-পাঁচ ঘণ্টাও লেট করে। এর নাম লেট লতিফ ট্রেন। তোমাদের বেলায় মাত্র এক ঘণ্টা। কিস্ নয়।”
“আপনিই তো এই ট্রেনটায় আসতে বলেছিলেন।”
“ঠিকই বলেছিলাম। রাত্তিরের গাড়িতে এলে তোমাদের কষ্ট হত, আমারও বুড়ো হাড়ে সহ্য হত না।”
তারাপদ ঠাট্টা করে বলল, “আপনি বুড়ো!..এই বুড়ো হাড়েই কত ভেলকি দেখাচ্ছেন! এখন সাফসুফ বলুন তো কিকিরা-স্যার, আপনি হঠাৎ এই ময়ূরগঞ্জ নামক জায়গাটিতে এলেন কেন?”
কিকিরা বললেন, “বেড়াতে। বড়দিনের ছুটি কাটাতে।”
চন্দন বলল, “আপনি তা হলে বড়দিন করেন?”
“করি। আমার বাপ ঠাকুরদাও করেছেন। তোমরা করো না? কলকাতায় তোমাদের বড়দিন হয় না? সাহেব পাড়ায় বড়দিনের কথা বাদ দাও। দিশি পাড়ায় তোমাদের কেক খাবার বহর কম নাকি? কেক খাওয়া, পিকনিক করা, চিড়িয়াখানায় যাওয়া…! দেখো হে স্যান্ডেল উড, খাঁটি সাহেবরা চলে গেছে বটে–কিন্তু তাদের লেজের টুকরো পড়ে পড়ে আছে। ওদের ফুর্তি-ফাতা আমাদেরও করতে হচ্ছে অল্পস্বল্প।” কিকিরা টর্চের আলো দেখাতে লাগলেন। এখানের পথঘাট অন্ধকার।
তারাপদ বলল, “স্যার, আপনি যদি বড়দিনের ছুটি কাটাতে এখানে এসে থাকেন–ভাল কথা। আমরা তা হলে শুধু ছুটি কাটাব, নাথিং মোর।…ওই যে শুনলাম আপনার রাহাবাবু কি সব বললেন, ওর মধ্যে আমরা নেই। কী বলিস, চাঁদু?”
চন্দন কিছু বলল না।
শীত এখানে সত্যিই বেশি। আজ বাদলা বাদলা ভাব হয়েছে বলে আরও শীত পড়েছে, না, মেঘলার দরুন শীত খানিকটা চাপা রয়েছে, আপাতত তা বোঝা মুশকিল; মেঘ কাটলে বোঝা যাবে।
কিকিরা ঠিকই বলেছিলেন। এ তো রাস্তা নয়, যেন পাহাড়তলির হাঁটা পথ। উঁচু-নিচু গর্ত, ছোট-ছোট ঝোপ, পাথরের টুকরো ছড়ানো। গাছপালাও দাঁড়িয়ে আছে সার বেঁধে। বিশাল বিশাল গাছ। অন্ধকারে বোঝা না গেলেও মনে হচ্ছিল, তেঁতুল, কাঁঠাল, অশ্বথ ছাড়া এত বড় বড় গাছ বড় একটা হয় না।
সকাল না হলে বোঝা যাবে না জায়গাটা কেমন। কিকিরা অবশ্য লিখেছেন–খুবই স্বাস্থ্যকর জায়গা, অনেকেই জল-হাওয়া বদলাতে আসে, তবে ভিড়-ভাড়াক্কা বেশি হয় না। থাকার মতন ঘরবাড়ি এখানে কম।
তারাপদ আবার বলল, “কিকিরা-স্যার, আপনি যে কথা বলছেন না?”
কিকিরা বললেন, “তোমরা কি বেড়াল! আঁশের গন্ধ ছাড়া নাকে কিছু ঢেকে।”
তারাপদ বলল, “এই অভ্যেস আপনিই করিয়েছেন।”
“বলো! যা মন চায় বলো!”
“এক-এক করে বলি!”
“যেমনভাবে তোমাদের ইচ্ছে।”
তারাপদ বলল, “তা হলে বলি। এক নম্বর পয়েন্ট হল, আপনি আগেভাগে কিছু না জানিয়ে রাতারাতি এখানে আসা ঠিক করে ফেললেন। আসার আগে আমার কাছে একটা দু লাইনের চিঠি পাঠালেন। ব্যাপার কী? না, আমি বড়দিনের ছুটি কাটাতে অমুক জায়গায় যাচ্ছি। পৌঁছেই তোমাদের চিঠি দেব। ঠিক কি না?”
“ঠিক। কারেক্ট।”
“এখান থেকে আপনি যে চিঠি দিলেন–তাতে লিখলেন, তুরন্ত চলে এসো।.কী খাসা জায়গায় আছি না এলে বুঝবে না! ঘণ্টায়-ঘণ্টায় খিদে পায়, মুরগি ভেরি চিপ, দুধে মাত্র ওয়ান-টেনথ জল থাকে। শাকসবজি টাটকা। বড়দিন কাটাবার পক্ষে আদর্শ জায়গা। লিখেছিলেন তো?”
“কারেক্ট।”
“তারপর কী লিখেছিলেন?”
“কী লিখেছিলাম! মনে পড়ছে না।”
“স্যার, আপনি আমাদের লেজে খেলাচ্ছেন কেন! এতদিন আপনার শাগরেদ করছি। …আপনি লিখেছিলেন–এখানে এলে তোমাদের হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতে হবে না। অলস বিলাসে কাটিবে না বেলা…। লিখেছিলেন না?”
কিকিরা নিরীহ গলায় বললেন, “লিখেছিলাম বুঝি! তা লিখতে পারি। মাঝে-মাঝে আমায় পদ্য ভর করে। ছেলেবেলায় পড়েছিলুম।”
“এবার বলুন। প্লিজ!”
কিকিরা সামান্য চুপ করে থেকে বললেন “ধৈং ধরতি রাঘব..” বলে নিজেই হেসে ফেললেন।
তারাপদরা হেসে ফেলল। বলল, “স্যার, আপনি তো ইংলিশদের নাক ভাঙার ব্রত নিয়েছেন, হঠাৎ স্যাংক্রিট কেন?”
