মথুরবাবু চাবি কুড়িয়ে নিলেন।
কিকিরাও উঠে দাঁড়ালেন। তারাপদ উঠে পড়ল।
কিকিরা উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “চলি মথুরবাবু। নাকি শুদ্ধানন্দ প্রেতসিদ্ধর মালিক মহারাজ!”
মথুরবাবু আঁতকে উঠলেন।
কিকিরা বললেন, “আপনি পাকা লোক। অনেকে মন্দির-চন্দির বসিয়ে ভাল রোজগারের পথ করে নেয়। আপনি বন্ধক তেজারতি চুরি জোচ্চুরির কারবারের সঙ্গে আর-একটি ভাল কারবার ফেঁদেছেন। কিন্তু আপনার চেলাটি–প্রেসিদ্ধ একেবারে নবিশ। কিস্যু জানে না।”
“জা-জা…জানে না?”
“আজ্ঞে না। ওর খেলায় অনেক খুঁত। গন্ধকের গুঁড়ো ছড়িয়ে কি বোকা বানানো যায়! আপনার নাক থাকলে গন্ধ পাবেন। আর ওই মরা কাক, মড়ার খুলির মাথায় আলোর পিটপিট করে জ্বলে ওঠা মশাই, বাচ্চাদের যে জ্ঞানের আলো’ খেলনা পাওয়া যায়–এ তো তাই, ব্যাটারি আর তার নিয়ে বসে খেলা। দেখানো! বলবেন। আত্মা এলে যে আলোর কাঁটা ছোটে–সেটা কী? ঘড়িতে রেডিয়াম দেখেননি? ছি ছি–এগুলো কি খেলা! নবিশ একেবারে!…আরও একটা কথা মথুরামোহনমশাই! জগন্নাথের মা বলে যে জিনিসটিকে প্রেসিদ্ধ হাজির করেছিলেন, তার জন্যে দুটো বেশি পয়সা খরচ করলে পারতেন। কারিগর ভাল নয়; মামুলি ডামিও করতে পারে না। নাইলনের পরদা ফেলে কত আর সামলানো যাবে। টেপ-রেকর্ডটাও খারাপ। জগন্নাথের মায়ের গলা শুনেই বোঝা যাচ্ছিল বাজে টেপ…।”
মথুরবাবু উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। ভয়ে কাঠ। ঘামছিলেন। “চলি, প্রেতসিদ্ধ বাবামশাই। একটা কথা বলে যাই। জোয়ারদারসাহেব পুলিশ নিয়ে আপনাদের আখড়ায় গিয়েছেন। নিচে আমাদের সঙ্গে এসেছেন এক অফিসার, লালবাজার থেকে। তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। আমাদের কোনো ক্ষতি হলে…”
মথুরবাবুর গলা উঠছিল না। “আপনি কে?”
“কিকিরা দি ম্যাজিশিয়ান। ওরফে বিভুপদ হাঁস।”
“আপনি এত জানলেন কেমন করে?”
“সর্দি, রুমাল, ইনফ্রা রেড চশমা। একসময় স্নাইপারস্কোপিক বাইনোকুলার বলা হত যাকে, তারই একটা লেটেস্ট মডেল। আমি ওই মজার চশমাটি পরে নিতাম ঘরে বসে। প্রেতসিদ্ধর চেলারা ভাবত, আমার সর্দি হয়েছে বলে নাকে রুমাল চাপা দিচ্ছি। এ-হল আমাদের রুমালের খেলা! চশমা বদল করে নিতাম ঘরে ঢুকে। অন্ধকারে আপনার প্রেসিদ্ধর বাহাদুরি প্রায় সবই দেখতে পেতাম।..যাক, চলি। চলো হে জগন্নাথ, চলো তারাপদ।“
ওরা উঠে দাঁড়িয়েছিল।
মথুরবাবু হতভম্ব হয়ে বললেন, “এই চাবিটা..?”
জগন্নাথ বলল, “ওটা মামুলি চাবি। নকল। আসলটা গঙ্গার জলে ফেলে দেব।”
মথুরবাবু মাথার চুল ছিঁড়ে পাগলের মতন দাপাতে লাগলেন।
কিকিরা হাসতে-হাসতে বললেন, “একটু মাথা ঠাণ্ডা করে নিন। পুলিশ এলে দুটো কথা তো বলতেই হবে।”
২.১ ময়ূরগঞ্জের নৃসিংহ সদন
০১.
তারাপদরা সবেই ট্রেন থেকে নেমে দাঁড়িয়েছে, প্ল্যাটফর্মের আলোগুলো হঠাৎ কমে এল। একে তো ছোট স্টেশন, লোকজনও তেমন একটা নামল না গাড়ি থেকে বা উঠল না, তার ওপর আলোগুলো কমে আসতেই কেমন যেন ফাঁকা-ফাঁকা নিঝুম মতন মনে হল জায়গাটা।
এদিকে আবার আকাশে মেঘ ডাকছে। একে পৌষের শীত, সময়টাও সন্ধে হয়-হয়, রীতিমত উত্তুরে বাতাস দিচ্ছে কনকনে, এর ওপর যদি বৃষ্টি শুরু হয়–তবে তো হয়ে গেল।
তারাপদ কিছু বলতে যাচ্ছিল চন্দনকে, এমন সময় কানে এল, “হ্যা-ল-লো!”
কিকিরা। হাত দশেক মাত্র তফাতে। এগিয়ে আসছিলেন তিনি।
তারাপদ আর চন্দন কিকিরাকে দেখতে লাগল। দেখার মতনই বেশভূষা। গরম প্যান্ট, ঢলঢল করছে; গায়ে পুরো-হাতা বেঢপ এক পুলওভার; রং ঠিক বোঝা যাচ্ছে না, গাঢ় মেরুন রং বোধ হয়, মেরুনের সঙ্গে সাদার নকশা। রোগা-পাতলা, মাথায় লম্বা কিকিরার গায়ে জিনিসটা যা মানিয়েছে–আহা! কিকিরার গলায় বড়সড় মাফলার, মাথায় এক কাশ্মীরি টুপি, হাতে ছড়ি আর টর্চ।
এগিয়ে এসে কিকিরা বললেন, “ট্রেন লেট। প্রায় এক ঘণ্টা।”
তারাপদ বলল, “চার ঘণ্টাও হতে পারত। ট্রেনের ইঞ্জিন বিগড়ে গিয়েছিল। একটা ছোট জংশন স্টেশনে গাড়ি থামল, তারপর ছাড়ল যখন–ট্রেন আর এগোয় না, ইঞ্জিনের চাকা রেল লাইনে স্লিপ করতে লাগল। শুধু চাকা ঘুরে যায় বনবন করে।”
“বলো কী?”
“রেলের লোকগুলো বালতি বালতি বালি ঢালতে লাগল লাইনে, চাকার পাশে। সে এক কাণ্ড। শেষ পর্যন্ত চাকাগুলো গ্রিপ পেল।”
কিকিরা বললেন, “আজকাল ট্রেন মানেই ট্রাবল। হয় এটা, না হয় ওটা। নাও নাও চলো; আর দাঁড়িয়ে থাকা নয়।” বলেই কিকিরা মুটে ডাকতে লাগলেন।
মালপত্র কম। দুটো সুটকেস, দুটো হোল্ডঅল, একটা বেতের ঝুড়ি।
একটা মুটে হলেই চলত; সুটকেসগুলো চন্দনরা হাতে-হাতে নিতে পারত। কিকিরা দু’জন মুটে ঠিক করলেন। বললেন, “নৃসিংহ-সদন খানিকটা দূর হে, মাইলটাক পথ। রাস্তাও তোমাদের কলকাতার মতন নয়, পাথর, গর্ত, এবড়োখেবড়ো, মাঠ-ময়দানের ভেতর দিয়েও যেতে হবে শর্টকাট করে, ওরাই নিক, তোমরা ফ্রি হ্যাঁন্ডে চলো।” বলে একটু হাসলেন।
চন্দন তামাশা করে বলল, “ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ করতে করতে?”
মুটেরা মাল উঠিয়ে নিল। নৃসিংহ-সদনের রেট পাঁচ টাকা করে।
কিকিরা বললেন, “আরে পাঁচ কাহে ছ’ করকে মিলি তুহার। হোড়া জলদি জলদি চল্; আগর পানি আ যায়ি তো…”
ওভারব্রিজের আগেই টিকিটবাবুর সঙ্গে দেখা। চন্দন পকেট থেকে তাদের টিকিট বের করে এগিয়ে দিল।
