“আজ্ঞে?”
“আপনি আসুন..” জোয়ারদারকে ডাকল।
এগিয়ে গেলেন জোয়ারদার। তাঁকে সার্চ করা হল।
কিকিরা আবার হাঁচলেন।
এবার কিকিরার পালা।
“নাম?”
“বিভুপদ হাঁস।”
“পাতি না রাজহাঁস?”
“রাজহাঁস। আমার বাবা ষষ্ঠীপদ হাঁসকে লোকে রাজাবাবু বলত আদ্রা-পুরুলিয়া বাউলডিঙ্গিতে আমাদের ঘরবাড়ি জমিজায়গা। চার-পাঁচ রকম কারবার, “বলতে বলতে কিকিরা আবার হাঁচলেন, বিরাট হাঁচি।
লোকটা দু পা পিছিয়ে গেল। বিরক্ত হয়ে বলল, “কী হয়েছে আপনার?”
“ঋতু পরিবর্তন। নতুন শীত আসছে। সর্দি..”
“সর্দি নিয়ে এসেছেন কেন?”
“রাস্তায় হল।”
জোয়ারদার বললেন, “আমার বন্ধু। আসার কথা ছিল।”
“নাকে রুমাল চাপা দিন।”
“আজ্ঞে দিয়েছি।”
লোকটা আবার এগিয়ে এসে কিকিরার গা হাতড়াতে না হাতড়াতেই উনি হেঁচে ফেললেন।
“হল কী মশাই আপনার?”
“হাঁচি।”
“হাঁসদের হাঁচি হয় শুনিনি। …যাকগে ওখানে গঙ্গাজল আছে, হাতটাত ধুয়ে নিন আপনারা। শুদ্ধ হয়ে নিন।”
কিকিরা শুদ্ধ হতে-হতে শুনলেন–প্রথম ঘণ্টা বাজছে।
ঘরের একদিকে একটা কাঠের বাক্স মতন ছিল। তালা খুলে তার ভেতর থেকে দুটো কালো জোব্বা বার করল লোকটি। বলল, “নিন পরে নিন। মাথা কান কপালও ঢেকে রাখবেন। খুলবেন না।”
জোয়ারদার কালো জোব্বা গায়ে চাপালেন।
কিকিরা একবার করে হাঁচছেন, আর কালো আলখাল্লা পরছেন। বুদ্ধি করে রুমালটা তিনি রঙিন এনেছিলেন, মেরুন রঙের। নয়ত ওই চেলা হয়ত রুমালটাও ফেলে দিতে বলত।
কিকিরাকে ভাল করে দেখে নিয়ে গেরুয়াধারী চলে গেল। বলে গেল, “আসছি।”
ও চলে যেতেই জোয়ারদার ফিসফিস করে বলল, “এবার ওই ঘরে যেতে হবে।”
কিকিরা মাথা হেলালেন।
“একটু হুঁশিয়ার থাকবেন। টাকা এনেছেন?”
“দুশো দুই।”
“দুশো দুই?”
“এখন দুশো; পরের দিন তিনশো। প্লাস একটা মোহর।”
“মোহর!”
“বাবার আমলের। কাজ হলে তবে…”
“মশাই, সাবধান।”
চেলাটি এসে পড়ল। “আসুন। প্রণামী হাতে রাখুন।”
সরু এক গলিপথের মতন প্যাসেজ দিয়ে কিকিরারা একটা ঘরের সামনে এলেন। দরজা বন্ধ।
শুদ্ধানন্দর চেলাটি দরজা খুলল ধীরে-ধীরে। কিকিরা আবার হাঁচলেন। লোকটা বিরক্ত হল। বলল, “যান, ভেতরে গিয়ে বসুন। মাটিতে। …প্রণামীটা?”
দুজনেই টাকা দিলেন।
কিকিরার হাত থেকে দু’শো টাকা পেয়ে লোটা বোধ হয় খুশি হল না। বলল, “আজ স্পেশ্যাল ছিল। মাত্র দুশো টাকা?”
কিকিরা বললেন, “আবার আসব। তিনশো দেব। সঙ্গে একটা মোহর। পুরনো আমলের।”
“যান।”
ঘরে ঢুকে কিছু আর দেখা যায় না। ঘুটঘুট করছে অন্ধকার। ধুনোর ধোঁয়া। তার সঙ্গে ধূপের গন্ধ। গন্ধটা এতই উগ্র যে, ধুনোর গন্ধকেও ছাড়িয়ে যায়।
চোখ সইয়ে নিতে সময় লাগল। ততক্ষণে ঘরের এক কোণে একটা লাল আলো, টুনি বাবের আলো যেমন হয়, এক ফোঁটা জ্বলে উঠেছে।
.
জোয়ারদার গায়ে ঠেলা মারলেন।
কাছেই একটা তক্তাপোশ। তার ওপর ফরাস পাতা। দেখা না গেলেও অনুমান করে নিতে হয়।
জোয়ারদারের দেখাদেখি কিকিরা ফরাসের ওপর বসলেন। হাঁটু ভেঙে আসন করে। পায়ে লাগে। কিন্তু উপায় কী?
কিকিরার চোখ খানিকটা সয়ে গিয়েছে। অনুমানে মনে হল, এই ঘরটা হলঘরের মতন। বড়ই বলা যায়। কিকিরা যে-জায়গায় বসে আছেন, সেই জায়গাটা কি সামান্য ঢালু? হতে পারে। বেশ খানিকটা তফাতে, অন্তত গজ-তিরিশ দূরে একটা কী যেন রয়েছে। উঁচু মতন। ওখানেও কি কোনো তক্তাপোশ বা মঞ্চ পাতা আছে। হলঘরে কি কোনো স্টেজ বাঁধা আছে?
এমন সময় লাল মিটমিটে বাতিটা নিভে গেল। জ্বলল পর মুহূর্তে। আবার নিভল।
“উনি আসছেন?” জোয়ারদার বলল।
কিকিরা আবার হাঁচলেন, নাক পরিষ্কার করলেন।
এবার এক হালকা বেগুনি বাতি জ্বলে উঠল। বাতিটা এমন জায়গায় জ্বলল যাতে দূরের উঁচু জায়গাটা আবছাভাবে চোখে পড়ে।
কিকিরা ঠিকই অনুমান করেছিলেন। দূরে একটা মঞ্চ পাতা রয়েছে। ছোট। তক্তাপোশের ওপর মোটা কোনো জিনিস, তার ওপর কালো চাদর। দু পাশে দুই ধুনোর পাত্র, একটা থালায় গাঁদা ফুলের মালা। মঞ্চের দুধারে পেছনে দুই ত্রিশূল। একটা ত্রিশূলের ডগায় মরা কাক, অন্যটার মাথায় খুলি।
এমন সময় শব্দ হল ঘণ্টার। কে যেন পুজোর ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে, খুবই ধীরে খড়মের শব্দ করতে করতে পেছন থেকে এগিয়ে এল। মুখে অত সব শব্দ “ক্লীং রিং হিং। ওঁ অপসৰ্পন্তু তে ভূতাঃ যে ভূতাঃ ভুবি সংস্থিতা। যে ভূতাঃ বিকতারম্ভে পশ্য..চ হুং ফট। আং হ্রীং ক্রোং যং রং লং হৌং হঃ…ফট…।”
ইনিই তবে শুদ্ধানন্দ? একাদশ তন্ত্রমন্ত্র-সিদ্ধ শুদ্ধানন্দ প্রেতসিদ্ধ কল্পং বৃক্ষঃ! ফট বাবাজি!
কিকিরা ভাল করে লক্ষ করবার চেষ্টা করতে লাগলেন। বড়ই অস্পষ্ট। তবু শুদ্ধানন্দর চেহারা এবং পোশাকটি আন্দাজ করা যায়। পোশাক একেবারে ঘন রক্তবর্ণ। গায়ের চাদরটিও লাল। গলায় মোটা-মোটা রুদ্রাক্ষ-মালা। মাথার চুল ঘাড় পর্যন্ত, বাবরি ছাঁট। রুক্ষ ঝাঁকড়া চুল। কপালে রক্তচন্দন। দুটি চোখ লাল। তবে চোখের তলা কালো। ভূরু মোটা। টানা টানা। কিকিরার সন্দেহ হল, শুদ্ধানন্দ চোখের ভুরু আর চোখের তলায় কাজল লেপেছেন।
শুদ্ধানন্দ বসলেন। আসনে বসার মতন করে। চোখ বন্ধ। নিজের মনে বিদঘুঁটে মন্ত্র আওড়াচ্ছেন–তে ভূতাঃ যে ভূতাঃ…চ হুং ফট…ক্রোং যং বং লং হে হঃ…ফট।’
কিছুক্ষণ মন্ত্র আওড়ানোর পর শুদ্ধানন্দ হাত উঠিয়ে কী যেন ছুঁড়ে দিলেন। একবার ডাইনে, একবার বাঁয়ে। ধুনোর পাত্র থেকে ধক করে আগুন জ্বলে উঠল। নিভেও গেল।
