চন্দন একটা ট্যাক্সি দেখতে পেয়ে হাত তুলে চেঁচাল, “ট্যাক্সি।”
ট্যাক্সি দাঁড়াল।
কিকিরারা উঠে পড়লেন। ট্যাক্সিঅলা যেন মজার চোখে দেখলেন কিকিরাকে।
“যাবেন কোথায়?”
কিকিরা বললেন, “নিমতলার দিকে।”
ট্যাক্সিঅলা অদ্ভুতভাবে “ও,” বলল।
ট্যাক্সিতে যেতে-যেতে তারাপদ বলল, “আচ্ছা স্যার, জোয়ারদারকে তো আপনি বিশ্বাস করলেন। ওই সাহেব যদি ফাঁসিয়ে দিয়ে থাকে।”
“দেবে না। ও নিজে বেশ চটে আছে।”
“তবু…”
“কোনো চিন্তা নেই। আমি কিকিরা দি ওয়ান্ডার। আমার এই মেটে ফিরিঙ্গি ড্রেসের তলায় ম্যাজিশিয়ান কিকিরা বিরাজ করছে হে! কল্পতরু আমার কিছু করতে পারবেন না। তবে ষণ্ডাদের দিয়ে মারধোর করলে মরে যেতে পারি। দেহ অতটা সইতে পারবে না।”
চন্দন বলল, “আমরা থাকব কিকিরা, ওয়াচ রাখব। আপনি শুধু একবার ত্রাহি-ত্রাহি চেঁচাবেন।”
তারাপদ হেসে বলল, “আগে বললে ক’টা পটকা কিনে আনতাম কিকিরা। কালীপুজোর রেশ চলছে।”
কিকিরা বললেন, “তারাপদ, ছেলেবেলায় আমাদের পাড়ার ক্লাবে যাত্রা হত। তাতে একবার আমি এক সেনাপতির পার্ট করেছিলাম। কথা কম কাজ বেশি মাকা পার্ট। মানে যখন-তখন আমাকে তরোয়াল বার করতে হত খাপ থেকে আর ঢোকাতে হত। আর বলতে হত, যথা আজ্ঞা মহারাজ।’ তা অন্য সময় তরোয়াল কোনো গণ্ডগোল বল না, খুললাম বন্ধ করলাম। কিন্তু মহারাজের যখন বিপদ, গুপ্তশত্রু এসে লাফিয়ে পড়েছে মহারাজের ঘাড়ে তখন আমার তরোয়াল খাপে আটকে গেল। কিছুতেই খুলল না। ওদিকে মহারাজেরও যাই-যাই অবস্থা। তখন কী করলাম বলো তো?”
“কী?”
“কোমর থেকে খাপসুষ্ঠু তরোয়াল খুলেই লড়তে লাগলাম। সে কী হাসির ধুম। লোকে চেঁচাতে লাগল–ওরে বেটা, খাপ থেকে তরোয়াল বার কর, খাপ নিয়ে কি লড়া যায়?”
তারাপদ আর চন্দন হো-হো করে হাসতে লাগল।
কিকিরাও হাসতে-হাসতে বললেন, “ম্যানেজ আমি করে ফেলব। তোমরা ভেব না।”
.
যথাস্থানে জোয়ারদার অপেক্ষা করছিলেন। কিকিরাকে দেখে চমকে গেলেন। বললেন, “ব্যাপার কী মশাই?”
“কিছু নয়। বিভুপদ হাঁস, আদ্রা-পুরুলিয়ার লোক, নানা ধরনের ব্যবসা। টাকার গাছ। ব্য–এই পর্যন্ত আপনি। বাকিটা আমি। আমার ওপর ছেড়ে দেবেন।”
“তা না হয় দেব। পারবেন?”
“দেখবেন তখন।”
“ওর কতকগুলো ষণ্ডামার্কা চেলা আছে..”
“আমার কাছে পিস্তল আছে।”
“পিস্তল?” জোয়ারদার আঁতকে উঠলেন।
“আসল নয়। নকল। ম্যাজিশিয়ানের পিস্তল। ফায়ার হবে, গুলি বেরোবে না। … চলুন।”
দু’জনে পা বাড়ালেন গলির দিকে। চন্দন আর তারাপদ তফাতে থেকে গেল। তারা সামান্য পরে যাবে।
ব্যবস্থায় কোনো ফাঁক নেই। কিকিরার মনে হল, এ যেন কোনো নিষিদ্ধ এলাকায় ঢোকার মতন।
শুদ্ধানন্দর বাড়ির বাইরে থেকে ভেতর বোঝার উপায় নেই। বাইরেটার যতই ভাঙাচোরা, ঝোঁপঝাড়ভরা চেহারা হোক না কেন, ভেতরটা তেমন নয়। বাড়ি যে বেশ পুরনো, আদ্যিকালের, সেটা বোঝা যায়; বোঝা যায় এককালে সাহেব-সুবোই থাকত, কুঠিবাড়ির ছাদ আর বাংলোবাড়ির খোলামেলা বারান্দা। বারান্দাগুলো বড়, চওড়া। দেওয়ালের থাম মোটা-মোটা। আর্চগুলোও বেশ বড়। তবে সবই ভাঙাচোরা, ফাটাফুটো। ইলেকট্রিকও আছে। মিটমিটে আলো এদিকে-ওদিকে জ্বলছে। গুটি দুয়েক। তাতে আলো তেমন হয় না।
শুদ্ধানন্দর এক চেলা জোয়ারদারকে ডেকে নিয়ে গেল। এই লোকটা সেদিনের সেই ষণ্ডা কি না বোঝা গেল না। হতে পারে, নাও পারে। লোকটাকে দেখলে মনে হয়, গঙ্গার ঘাটে দলাইমলাই করে বেড়ায় পালোয়ান ধরনের চেহারা।
কিকিরার কোনো অসুবিধে হল না। জোয়ারদার যে শুদ্ধানন্দর স্থায়ী মক্কেল একথা জানার পর তার খাতির বোধ হয় বেড়ে গিয়েছে। তা ছাড়া জোয়ারদার আগে থেকেই বলে কয়ে ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন বলে কিকিরাকে ষণ্ডা-লোকটা কিছু বলল না। শুধু চেয়ে-চেয়ে দেখল বিচিত্র পোশাকের কিকিরাকে।
ঘরের গালাগানো প্যাসেজ দিয়ে দু-তিনটে ঘর পেরিয়ে একটা মাঝারি ঘরে নিয়ে গিয়ে জোয়ারদারদের বসাল লোটা। তারপর বলল, “মহারাজকে খবর দিচ্ছি।”
এই ঘরটায় দেখার মতন কিছুই নেই। ন্যাড়া দেওয়াল। একপাশে এক টিমটিমে বাতি। বসার জন্য কাঠের বেঞ্চি। একটিমাত্র চেয়ার। দেওয়ালের রং বোঝা যায় না, এমন ময়লা। ফাটা দাগ। সিমেন্টের মেঝেও ফেটে গিয়েছে। দেওয়ালে অবশ্য টিকটিকি-গিরগিটির অভাব নেই।
জোয়ারদার কী বলতে গিয়ে চুপ করে গেলেন, তারপর ঠোঁটে আঙুল চেপে ইশারায় বোঝালেন, এখানে কথাবার্তা না বলাই ভাল।
খানিকটা পরে অন্য একজন এল। এর চেহারা ঠিক ষণ্ডামার্কা নয়। ছিপছিপে। বড় বড় বাবরি চুল। পরনে গেরুয়া লুঙ্গি, গায়ে আলখাল্লা, একটা সুতির মোটা চাদর রয়েছে গায়ে।
ইশারায় ডাকল জোয়ারদারদের।
পাশের ঘরে এনে লোকটি বলল, “জুতো খুলুন। টুপি পরা চলবে না। পকেটে চামড়ার জিনিস থাকলে রেখে দিন। টর্চ রাখবেন না। এখানে রেখে যান। “
জোয়ারদার জানেন সব। ক’ দফা এলেন। জুতোটুতো খুলতে লাগলেন।
লোকটা চলে গেল।
জোয়ারদার নিচু গলায় বললেন, “এরপর সার্চ হবে।”
কিকিরা বললেন, “আন্দাজ করেই এসেছি।” বলে বেশ জোরে হেঁচে ফেললেন।
“হাত দিয়ে ঘেঁটেঘুঁটে দেখবে।”
“বুঝতে পারছি।” বলতে না বলতে আবার হাঁচি।
“হল কী আপনার?”
“সিজন চেঞ্জ, ঠাণ্ডা লেগে গিয়েছে।”
সামান্য পরে আবার সেই লোকটি ফিরে এল। এসে বলল, “রেখেছেন সব?”
