সেই আগুনের আলোয় কিকিরা শুদ্ধানন্দকে দেখে নিতে পারলেন অল্পের জন্য। চেহারায় না থোক সাজে-পোশাকে চারপাশের সাজেসজ্জায় একটা গা-ছমছমে ভাব হয়।
আগুন নিভে যাবার পর শুদ্ধানন্দ আরও একবার মন্ত্র আওড়ালেন। তারপর কথা শুরু করলেন।
“জোয়ারদারবাবু, তুমি এসেছ?”
“আজ্ঞে!”
“পরশু তিন যামে ভন্তরালিকা স্তরে তোমার আত্মীয় বাসুদেবের সঙ্গে দেখা হল। আহা, বেচারি ব্রীহিবৃক্ষের তলায় অবস্থান করছিল। বলল, কোন্ অপরাধে কে জানে সে নিম্নগামী হতে পারছে না। বাধা পাচ্ছে। আগামী অমাবস্যার পর সে আসতে পারবে।”
“আর কিছু জানাল মহারাজ?”
“বলল, ও যখন আসবে মুখোমুখি তোমায় শুনিয়ে যাবে।”
“বড় বিপদে পড়েছি মহারাজ! ব্যবসার ব্যাপার। বাড়িতেও খানিকটা অসুবিধে হচ্ছে। ভাগনেটা…”
“ধৈর্য ধরো জোয়ারদার। আত্মা দেহধারী জীব নয়। তার আসতে কষ্ট, যেতেও কষ্ট। সে কষ্ট তুমি বুঝবে না।”
“আগামী অমাবস্যা?”
“হ্যাঁ।”
“সে কবে?”
“দেরি নেই।”
জোয়ারদার চুপ করে গেলেন।
সামান্য পরে শুদ্ধানন্দ বললেন, “তোমার সঙ্গীটি এসেছে দেখছি।”
কিকিরা হাতজোড় করে বিনীতস্বরে বলল, “আজ্ঞে হ্যাঁ।”
“কী নাম?”
“বিভুপদ হাঁস। পিতার নাম ষষ্ঠীপদ হাঁস। তিনি পাঁচ বছর আগে স্বর্গে গিয়েছেন। নিবাস বাউলডিঙি, আদ্রা-পুরুলিয়া।”
“পেশা?”
“মহারাজজি, পেশা আর কী বলব! ব্যবসা! কাঠগোলা, সিমেন্ট, মশলাপাতি, গুড়, এই সব। একটা ছোট কলকারখানা…ইচ্ছে তো ছিল, কিন্তু বড় বিপদে পড়ে গিয়েছি।”
“কী বিপদ?”
“কী বলব মহারাজ! আমার শিবতুল্য বাবা একটা উইল করে গিয়েছিলেন। আমরা তিন ভাই। উইলে আমার ছিল অনেক কিছু। এখন এক অন্য উইল বার করে ভাইরা…কী বলব, মহারাজ!”
“বুঝেছি।…উইল জাল হয়েছে।”
“কেমন করে হল! জগতে কাউকে বিশ্বাস নেই।” বলতে বলতে আবার হাঁচলেন কিকিরা। নাকে-মুখে রুমাল চাপা দিলেন।
“পিতা গিয়েছেন কবে?”
“তা পাঁচ বছর। “
“পাঁচ বছর!…পঞ্চম হল ভৌরিক স্তর, পঞ্চদশ গৌরিব। পাঁচ হলে সেই আত্মা অর্ধ-নিদ্রিত।…তা এই সব আত্মাকে আনানো কঠিন। ওঁদের নিদ্রাকাল তো মানুষের মতন নয়।”
“আজ্ঞে হ্যাঁ…কিন্তু কী করব! আপনি আমায় সাহায্য করুন।”
শুদ্ধানন্দ চুপ করে থাকলেন। তারপর আবার কী যেন ছুঁড়লেন ধুনোর পাত্রে। এবারে আর আগুন জ্বলল না, ধোঁয়া হল সামান্য।
নিজের মনে কয়েকটা অদ্ভুত মন্ত্র আওড়াতে আওড়াতে শুদ্ধানন্দ বললেন, “দেখি…। খোঁজ করতে হবে। সময়সাপেক্ষ।”
কিকিরা বললেন, “আমি আপনার কাছে এসে পড়েছি। আপনি না পারলে কে পারবে মহারাজজি। খরচের জন্যে আপনি ভাববেন না। আমি ব্যবসাদার মানুষ…বিপদ উদ্ধারের জন্যে দু-চার হাজার টাকা খরচ করায় আমার আটকাবে না।”
“বুঝলাম, কিন্তু তুমি বড় অধৈর্য হচ্ছ! এ-সব কাজ..”
“জানি। আপনি ইচ্ছে করলে পারেন মহারাজ।”
“পারি?” শুদ্ধানন্দ একটু চুপ করে থেকে হঠাৎ তালি দিলেন হাতে। ঘন্টি নাড়লেন। সঙ্গে-সঙ্গে সব অন্ধকার। ঘুটঘুটে হয়ে গেল ঘর।
একেবারে স্তব্ধ ভাব। নিঃসাড়।
কিছুক্ষণ পরে শুদ্ধানন্দের গম্ভীর গলা শোনা গেল, “হে ধেনুক, আপনি কি এসেছেন?”
কোনো সাড়াশব্দ নেই।
অপেক্ষা করে শুদ্ধানন্দ বললেন, “হে সর্বগামী ধেনুক, আমি আপনাকে আহ্বান করছি। যদি এসে থাকেন–দেখা দিন।”
কেউ দেখা দিল না।
শুদ্ধানন্দ আবার ডাকলেন, “ধেনুক! আপনি কি আসবেন না?”
হঠাৎ যেন একটি জোনাকি জ্বলে উঠল শুদ্ধানন্দের পিছনে, ত্রিশূলের দিকে। জোনাকির আলো বারকয়েক নাচল। মনে হল, মরা কাকের মাথার দিকেই জোনাকি নাচল।
“আপনি এসেছেন?”
একটা শব্দ হল। খট খট।
“হে ধেনুক। আমার এখানে একজন হতভাগ্য অতিথি এসেছেন। তিনি “তাঁর পিতার কাছে একটি কথা জানতে চান। পিতা ভৌরিক স্তরে আছেন। পুত্রের নাম বিভুপদ। …আপনি কি তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন?”
জোনাকির মতন আলোর কণাটি স্থির হয়ে থাকল।
শুদ্ধানন্দ বললেন, “ঠিক আছে।”
আলোর কণাটি নিভে গেল।
শুদ্ধানন্দ বললেন, “বিভুপদ?”
“মহারাজ?”
“আপনি আসুন অন্য একদিন।”
“রবিবার আসব মহারাজ। সোমবার আমাকে একবার আদ্রা যেতে হবে।”
“রবিবার?”
“আমাকে কৃপা করুন মহারাজ।”
“আসুন।..অর্থাৎ অর্থাদি বিষয়ে…”
“আপনি ভাববেন না।”
.
০৯.
ঘোলাটে মেঘলা-মেঘলা আকাশ দেখে বোঝা যায়নি ঝপ করে অমন বৃষ্টি নামতে পারে। একটা দিন সন্ধে থেকে ঘণ্টা-দুই মোটামুটি বৃষ্টি হয়ে গেল। কলকাতার রাস্তাঘাটে কোথাও-কোথাও যদিবা জল দাঁড়িয়ে থাকে, পরের দিন আবার সব শুকনো।
বিকেলবেলা তারাপদ এল অফিস ফেরত। কিকিরা বাড়ি নেই।
সামান্য পরে এল জগন্নাথ। কথা ছিল আমার। তারাপদর সঙ্গেই আসতে পারত সে, পারেনি অন্য একটা কাজে আটকে গিয়ে।
তারাপদ আর জগন্নাথ বসেবসে গল্পগুজব করছে, চা খাচ্ছে, এমন সময় কিকিরা এলেন। হাতে একটা মোটা প্যাকেট।
“গিয়েছিলেন কোথায়?” তারাপদ বলল।
“আজ একটু শীত শীত লাগছে! ম্যালারু হবে নাকি হে?” প্যাকেটটা রাখতে রাখতে কিকিরা বললেন, “ছেলেবেলায় যদি মাকে বলতাম, মা আমার শীতশীত করছে, সঙ্গে-সঙ্গে মা বলতেন, তোর কম্পজ্বর হবে। আমাদের ওদিকে কম্পজ্বরটা ভালই হত। কত যে কুইনিন মিকশচার খেয়েছি তারাপদ, খেয়ে-খেয়ে লিভারটাই নষ্ট হয়ে গেছে।”
তারাপদ ঠাট্টার গলায় বলল, “আপনাকে দেখলেই সেটা বোঝা যায়। যা বলছিলুম, গিয়েছিলেন কোথায়?”
