“জগন্নাথের বাবা-মা সম্পর্কে কী বললেন?”
“বললেন, আজকাল সংসারে ধর্মও নেই, ধর্মের কলও নেই, বাতাসে আর কিছুই নড়ে না। তবে হ্যাঁ, ওই ওপরে একজন আছেন, তাঁর চোখে সবই পড়ে।
“তুমি জগন্নাথের বাবার কথা জিজ্ঞেস করলে না?”
“করেছি।”
“কী বললেন?”
“বললেন, কুকুরের পেটে কি ঘি সয় গো? যেমন ছিলি, তেমন থাকলে তো খেয়ে-পরে থাকতে পারতিস। লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু। সংসারটাকে ভাসিয়ে গেল।”
কিকিরার কান ছিল কথায়, বললেন, “লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু!”
“তাই তো বললেন।”
“তুমি আর কিছু জিজ্ঞেস করলে না?”
“অ্যাকসিডেন্টের কথা জিজ্ঞেস করলাম। বললেন, ওপর থেকে প্রথমে অতটা বোঝা যায়নি, পরে দেখা গেল কোমরের কাছে জোর জখম হয়েছিল জগুদার বাবা। ভেতরে ভীষণ লেগেছিল। দু-চার ঘণ্টার পর আর হুঁশও ছিল না।”
কিকিরা কী যেন বলতে যাচ্ছিলেন এমন সময় জগন্নাথ এসেছে বোঝা গেল। ফ্ল্যাটের সদরে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল বগলার সঙ্গে।
জগন্নাথ ঘরে এল একটু পরেই।
কিকিরা বললেন, “এসো হে জগন্নাথ! আছ কেমন?”
জগন্নাথ বলল, “ভাল নয়।”
“তোমায় বেশ শুকনো-শুকনো দেখাচ্ছে। বসো!”
বসল জগন্নাথ।
বগলার চা তৈরি হয়ে গিয়েছিল। চা আর কচুরি এনে দিয়ে গেল।
চা খেতে-খেতে কিকিরা জগন্নাথকে বললেন, “নতুন কিছু ঘটেছে নাকি?”
“আজ্ঞে, নতুন বলতে কাল বাড়ি ফিরে গিয়ে আবার একটা চিঠি পেলাম।“
“প্রেতসিদ্ধর?”
“হ্যাঁ। কাল শনিবার ছিল। অফিস থেকে বেরিয়ে একবার আমার এক মামার কাছে গিয়েছিলাম। জেলেপাড়ায়। নিজের মামা নয়। মায়ের মাসতুতো দাদা। হাত ভেঙে পড়ে আছেন বুড়ো বয়েসে। মামাকে দেখে বাড়ি ফিরে চিঠিটা পেলাম।”
“বয়ান কী? সেই আগের মতন? এনেছ চিঠিটা?”
জগন্নাথ পকেট থেকে চিঠি বার করে কিকিরাকে দিল।
তারাপদ ইশারায় কচুরি তুলে চা নিতে বলল জগন্নাথকে। এই চিঠির কথা সে জানে না। জগুদা সন্ধেবেলায় বাড়ি ফিরে গিয়ে চিঠিটা পেয়েছে, কাল ছিল শনিবার, আজ রবি, জগুদার সঙ্গে তার দেখা হয়নি।
কিকিরা চিঠি পড়া শেষ করে বললেন, “চিঠি তো একই। এবার তাড়া বেশি। তোমার মায়ের আত্মার সঙ্গে শুদ্ধানন্দর বড় ঘন ঘন দেখা হয়ে যাচ্ছে। তাই না?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ।”
“তা তুমি চুপ করে বসে আছ কেন? জানিয়ে দাও, তুমি শুদ্ধানন্দর সঙ্গে দেখা করতে যাবে।”
“যাব?”
“অবশ্যই যাবে।”
জগন্নাথ ভয়ে-ভয়ে বলল, “যদি কিছু হয়?”
“কী আর হবে। হবে না কিছু।”
“আমার কিন্তু ভয় করছে।”
“ভয় পাবার ব্যাপার নেই জগন্নাথ! তুমি জানিয়ে দাও, তুমি যাবে। কবে যাবে তাও আমি বলে দিচ্ছি।” বলে কিকিরা কিসের হিসেব করলেন মনে-মনে। শেষে বললেন, “আগামী শনিবার। …না, শনিবার থাক, রবিবার। আগামী রবিবার।”
জগন্নাথ তাকিয়ে থাকল।
কিকিরা হেসে বললেন, “ভয় করার কারণ নেই। আমি থাকব। কিন্তু একথা যেন কেউ না জানতে পারে। তোমার সঙ্গে থাকব আমি। প্রেতসিদ্ধর খাস ঘরে। যেখানে তিনি আত্মাদের আনেন-টানেন। আর বাইরে থাকবে এরা, তারাপদ আর চন্দন। দু-চারজন বাইরের লোক আরও থাকতে পারে। সে অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা।”
জগন্নাথ ঘাড় নাড়ল।
কিকিরা বললেন, “তুমি শুধু চিঠিতে লিখে দিও প্রণামী’ সম্বন্ধে আপনি চিন্তা করিবেন না। আমি যথাযোগ্য পুস্পাঞ্জলি দিব। তবে সামান্য নিরিবিলিতে কথাবার্তা বলিতে চাহি।”
.
০৮.
বাড়ি থেকে বেরোবার সময় কিকিরা বললেন, “স্যান্ডেল উড, পাঁজিতে আজ কী লিখেছে জানো? মঙ্গলবার কালরাত্রি–ঘ ৬/২৭ গতে ৮/৫ মধ্যে। যোগিনী-পূর্বে। মাসদগ্ধা। ক্লীং রিং হিং…।”
চন্দন আর তারাপদ হেসে উঠল। কিকিরাও হাসছিলেন। চন্দন বলল, “আপনি কি পঞ্জিকা-পণ্ডিত?”
“কে বলেছে হে! সংসারে সব জিনিস একটু-একটু চেখে রাখতে হয়। চিংড়ি মাছের পায়েস থেকে পঞ্জিকার কালরাত্রি পর্যন্ত। আজ মঙ্গলবার। যাচ্ছি তন্ত্রাচার্য শুদ্ধানন্দ প্রেতসিদ্ধ কল্পবৃক্ষর কাছে। এমন শুভ বা অশুভ দিন-যাই বলো একবার দেখে নিতে হয় বইকি! জয় মা তারা।”
তারাপদ হাসতে-হাসতে বলল, “আপনাকে কিন্তু সুপার্ব দেখাচ্ছে। মেটে ফিরিঙ্গি।”
কিকিরা হেসে ফেললেন। চন্দন বলল, “মেটে ফিরিঙ্গি কাকে বলে, জানেন?”
“না।”
“মেটেবুরুজের ফিরিঙ্গি।”
তিনজনে হাসতে হাসতে নিচে রাস্তায় নেমে এল। সন্ধে হয়নি তখনও তবু এই হেমন্তের মরা বিকেলে অন্ধকার নেমে গিয়েছিল।
কিকিরাকে সত্যিই অদ্ভুত দেখাচ্ছিল। লম্বা লম্বা ডোরাকাটা এক প্যান্ট পরেছেন। ডোরাগুলো কালো। প্যান্টের জমিটা খয়েরি রঙের। এ-প্যান্টের কাটছাঁট কোন দরজির কে জানে! পাগুলো সরু-সরু, কোমরের কাছে ঢোললা। গায়ে চেক শার্ট, শার্টের ওপর এক হাফ হাতা সোয়েটার। গায়ের কোটটা কুচকুচে কালো, তার ঝুল নেমেছে হাঁটু পর্যন্ত। গলায় এক সিল্কের মাফলার। মাথায় ফেলট হ্যাট। চোখে গোল কাঁচের চশমা। ফ্রেমটিও সেই রকম, তারের ফ্রেম কানে জড়ানো সেকেলে ছিরি, চশমার।
রাস্তায় এসে কিকিরা বললেন, “আমার নাম কী জানো?”
“কী?”
“বিভুপদ হংস।”
“হংস?”
“আজ্ঞে, হংস। হাঁস। ডাক্।” কিকিরা হাতের ছড়িটা দোলাতে দোলাতে গম্ভীরভাবে বললেন, “বিপদ হাঁস হল আদ্রা পুরুলিয়ার লোক। বাবা ষষ্ঠীপদ। হাঁস। বিভুপদ কাঠ, সিমেন্ট, মাটি, মশলা, গুড়-এর কারবারি। তার গাঁটে-গাঁটে দশ-পঞ্চাশ-একশোর বাজারি নোট গোঁজা থাকে। ভেরি রিচ, বাট ড্যাম্প ফুল। বিভুপদ তার বাবার সঙ্গে দুটো কথা বলতে চায়। বাবা পাঁচ বছর আগে হেভেনে চলে গেছেন। তাঁর একটা উইল ছিল। সেই উইল যে কেমন করে আগাগোড়া পালটে গেল কে জানে। বিভুপদ তার বাবার কাছে দুটো কথা জানতে চায়। ব্যস। …”
