কর্মচারীটি বলল, “দাঁড়ান দেখছি,” বলে পার্টিশানের ওপারে এক ঘরে ঢুকে গেল।
কিকিরা ফিসফিস করে তারাপদকে বললেন, “সাইনবোর্ডে দেখলাম লেখা আছে, কনট্রাকটারস। ঢিল ছুড়লাম। দেখি কী হয়!”
সামান্য পরেই কর্মচারীটি ফিরে এসে বলল, “আসুন।”
পার্টিশানের গা-লাগানো কাঠের এক খুপরি। চেয়ার, টেবিল, ফোন, লোহার আলমারি, ছোট এক লোহার সিন্দুক।
কিকিরাদের খুপরির মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে লোকটি চলে গেল।
টেবিলের ওপাশে জোয়ারদারসাহেব বসে।
কিকিরা নমস্কার করে বলল, “আমার নাম কে, কে, রায়। আপনিই তো। মিস্টার বিশ্বনাথ জোয়ারদার? পাতিপুকুরে থাকেন?”
জোয়ারদার একটু অবাক হলেন। নমস্কার জানিয়ে বললেন, “বসুন।”
লোহার হালকা চেয়ার। দু জনেরই বসার ব্যবস্থা ছিল। কিকিরা তারাপদকে বসতে বলে নিজে বসলেন।
তারাপদ বসল।
কিকিরা জোয়ারদারকে দেখছিলেন। প্যান্ট-শার্ট পরে বসে আছেন। ভদ্রলোক। গায়ের কোটটা আলমারির পাশে দেওয়ালে গাঁথা হুকে। হ্যাঁঙারসমেত ঝোলানো। ভদ্রলোকের বয়েস পঞ্চাশ কি সামান্য বেশি। লম্বাটে মুখ। গালের হাড় উঁচু। আধ-ফরসা গায়ের রং, মাথার চুল কিছু-কিছু পাকতে শুরু করেছে। চশমাটা টেবিলে নামানো। টেবিলে কাগজপত্র, বিল, চেই পড়ে আছে। জলের গ্লাস, চায়ের কাপ।
কিকিরার মনে হল, জোয়ারদারসাহেব তেমন স্বাস্থ্যবান নন। চোখে-মুখে অসুস্থতার ছাপ ফুটে রয়েছে।
জোয়ারদার বললেন, “বলুন, কী দরকার। আমার কথা কে বলল আপনাদের?”
কিকিরা খুব সহজেই সুবলের নাম বলে দিলেন। পারলে সুবলের বাবার নামই বলে ফেলতেন। নামটা তিনি জানেন না।
“আপনার দোকানের পুরনো কাস্টমার,” কিকিরা হেসে-হেসে বললেন।
জোয়ারদার কিছুই মনে করতে পারলেন না। খদ্দের কত আসে কত. যায়। কে আর মনে রাখে সকলকে। তবে জোয়ারদার ব্যবসাদার মানুষ, কথা বলতে জানেন। হেসে বললেন, “ও!…আচ্ছা! পুরনো খদ্দের আমার অনেক। বাবার আমলে এখানে ক’টা আর দোকান ছিল। এখন তো গিজগিজ করছে।…তা বলুন, আপনার দরকারটা শুনি।“
কিকিরা হাসি-হাসি মুখ করে বললেন, “আপনারা তো ইলেকট্রিকের সমত রকম কাজকর্মের কনট্রাক্ট নেন।”
“কনট্রাক্ট …ইয়ে, মানে…সেভাবে এখন আর নিই না। আগে নিতাম। আজকাল লোকজন পাওয়া বড় মুশকিল। হাতেপায়ে ধরতে হয়। কাজে ফাঁকি মারে। পাটির কাছে কথা শুনতে হয় আমাদের। অনর্থক ফ্যাচাং আর ভাল লাগে না। বয়েসও হচ্ছে।”
“কনট্রাক্ট আর নিচ্ছেন না?”
“একেবারে নিই না-তা বলব না। নিই।”
কিকিরা স্পষ্টই বুঝতে পারলেন জোয়ারদার হিসেব করে কথা বললেন। অর্থাৎ এখন ঝামেলার কাজ নেন না বড় একটা, তবে তেমন কাজ হলে নিতে আপত্তি নেই।
তারাপদ হতাশ হবার ভান করে বলল, “তা হলে আমরা…”
“আপনাদের ব্যাপারটা আগে শুনি।”
কিকিরা বেশ গুছিয়ে দোতলা বাড়ির ইলেকট্রিকের কাজকর্মের কথা বললেন।
জোয়ারদার ততক্ষণে সিগারেট ধরিয়ে নিয়েছেন। কিকিরাদেরও দিয়েছেন। তারাপদ সিগারেট নেয়নি।
শেষে জোয়ারদার বললেন, “বাড়িটা কোথায়?”
“টেগোর ক্যাসেল স্ট্রিট।”
“টে-গোর ক্যাসেল!” জোয়ারদার কেমন থতমত খেয়ে গেলেন।
কিকিরা কথা বললেন না, জোয়ারদারকে দেখছিলেন।
নিজেকে সামান্য সামলে নিয়ে জোয়ারদার বললেন, “বলেন কী মশাই! ওখানে বাড়ি! ও জায়গাটা তো সেই কী বলে, ধ্বংসস্তূপ হয়ে গেছে। ওখানে বাড়ি। এত জায়গা থাকতে শেষে…”
কিকিরা বললেন, “খুব সস্তায় পেয়ে গিয়েছিলাম। মর্টগেজ প্রপারটি থেকে কোর্টকাছারি…তা সে যাক, বলতে গেলে মহাভারত। সেই বাড়ি ভেঙেচুরে নতুন করে করাতে হল। আপনি দেখলেই বুঝতে পারবেন।”
“কোথায় বাড়িটা? মানে, ঠিক কোন জায়গায়!”
“কাঁঠালতলা বলে লোকে।”
জোয়ারদার যেন চমকে উঠলেন। “কাঁঠালতলার গলি!…বলেন কী! ওই গলিতে ভদ্রলোক বাড়ি করে। আরে ছি-ছি, সে তো একরকম ব্লাইন্ড লেন। ওখানে নতুন বাড়ি কোথায়? আরে মশাই, ওখানে এক বেটা তান্ত্রিক…ডেঞ্জারাস! সে বেটা ওখানে…”
“শুদ্ধানন্দ প্রেতসিদ্ধ কল্পবৃক্ষঃ…! “কিকিরা কল্পবৃক্ষ-এর বিসর্গে জোর দিলেন।
জোয়ারদারের মুখ হাঁ হয়ে থাকল। চোখের পাতা পড়ছিল না। শেষে বললেন, “চেনেন বেটাকে?”।
“না। নাম শুনেছি।”
“নাম শুনেছেন। দেখেননি?”
“না।” কিকিরা মাথা নাড়লেন, “আপনাকে দেখেছি।”
“আমাকে?” জোয়ারদারের যেন ফাঁস লেগে গেল গলায়, “কবে দেখলেন আমাকে?”
“গত পরশু! শনিবার সন্ধের পর।”
জোয়ারদার রীতিমত হতবাক। বিহ্বল। তাকিয়ে থাকলেন বোকার মতন।
কিকিরা হাসি-হাসি মুখে বললেন, “কী! ঠিক বলিনি?”
“আপনি কে মশাই? ডিটেকটিভ? লালবাজারের লোক?”
মাথা নেড়ে হাসতে-হাসতে কিকিরা বললেন, “না।”
“না!” জোয়ারদার ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলেন। ঢোক গিললেন বার দুই। নানারকম ভাবতে লাগলেন। তারপর হঠাৎ বললেন, “তা হলে কি আপনি ওই কালো আলখাল্লার দলে ছিলেন?”
“কালো আলখাল্লা “
“বুঝেছি। ওদের দলে আপনি ছিলেন। ওখান থেকেই আপনি আমার নাম শুনেছেন। জোয়ারদার হঠাৎ কেমন খেপে গিয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, তার আগেই কিকিরা বাধা দিলেন।
কিকিরা বললেন, “না, আপনাকে আমি আগেই দেখেছি। প্রেতসিদ্ধর চেলা এসে আপনাকে যখন হাত চেপে ধরল।”
জোয়ারদার যেন অগাধ জলে পড়েছেন! কে এই লোকটা? কাস্টমার না পুলিশের লোক? না চিটিংবাজ!
