কিকিরা বললেন, “জোয়ারদারসাহেব, আপনি খুব অবাক হচ্ছেন। অবাক হবারই কথা। আপনাকে আমি আরও অবাক করতে পারি। আচ্ছা দেখুন আপনাকে একটা জিনিস দেখাই।” বলে নিজের পকেটে হাত দিলেন কিকিরা। স্টিলের একটা সুচ বার করলেন। ইঞ্চি-দেড়েক লম্বা। একটু মোটা। সুচের মুখ সামান্য ভোঁতা। সুচটা নিজের ডান চোখে ছোঁয়ালেন, ভুরুর তলায়, চোখের আর নাকের কাছে গর্তে। বললেন, “এই দেখুন, এই সুচটা আমি চোখে ঢুকিয়ে দিচ্ছি সবটা।” বলে কিকিরা চোখের কোলে মুচ ঢোকাতে লাগলেন।
জোয়ারদার ভয় পেয়ে গেলেন। আজব মানুষ তো! চোখে সুচ ঢুকিয়ে যাচ্ছে। মরবে নাকি! মুখ শুকিয়ে যাচ্ছিল জোয়ারদারের। “মশাই, করছেন কী! প্লিজ স্টপ। প্লিজ।…আমার এ-সব সহ্য হয় না।”
কিকিরা বারো আনা সুচ ঢুকিয়ে ফেলেছিলেন। বার করলেন এবার। বার করে চোখ বন্ধ রেখেই পকেট থেকে রুমাল টেনে নিয়ে চোখটা চাপা দিলেন। মুছলেন সামান্য। তারপর রুমালটা নিয়ে টেবিলের ওপর ফেলে দিলেন। তাকালেন এবার। ডান চোখ খুলেই।
হাসি-হাসি মুখ করে কিকিরা প্রথমে রুমালটা দেখালেন। দেখিয়ে টেবিলের ওপরই ফেলে রাখলেন। তারপর ডান চোখটা দেখালেন। বললেন, “কী? রক্তটক্ত দেখলেন?”
“না।”
“সুচটা তো আমি চোখে ঢুকিয়ে ছিলাম।”
“হ্যাঁ।”
“আরও কিছু দেখবেন?”
“না, মশাই। থাক।”
কিকিরা রুমালটা তুলে নিলেন টেবিল থেকে। “আপনি যদি একটা চেক লেখেন এখন, আপনার কালির রং পালটে যাবে!”
“মানে?”
“দেখুন না। পরীক্ষা করুন।”
জোয়ারদার চোখ নামিয়ে চেক বই টানতে যাচ্ছিলেন। বই নেই। কাগজপত্র সরালেন। ড্রয়ার টানলেন। চেক বই? টেবিলের ওপরেই তো ছিল।
কিকিরা এবার হেসে ফেললেন। রুমাল তোলার সময় চেক বইটা তুলে নিয়েছিলেন। জোয়ারদার বোঝেনি।
চেক বই ফেরত দিতে-দিতে কিকিরা বললেন, “জোয়ারদারসাহেব, কিছু মনে করবেন না। এ হল লোককে ধোঁকা দেবার খেলা। চোখে যেটা ঢোকালাম ওর মধ্যে স্প্রিং ছিল। গাড়ির শক অ্যাবজরভার বোঝেন! সেইরকম অন্যটা ক্লিন হাত সাফাই। দুটোই। আমি একজন ওল্ড ম্যাজিশিয়ান, ক্লাসিক্যাল টাইপ। লোকে আমাকে বড় চেনে না। এই ছোকরারা চেনে,” বলে তারাপদকে দেখালেন।
তারাপদ বিনয় করে বলল, “উনি হলেন কিকিরা দি ওয়ান্ডার, কিকিরা দি গ্রেট!”
জোয়ারদার ভীষণ ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। বললেন, “আমার এখানে ম্যাজিক কেন? ম্যাজিক দেখাবার জায়গা এটা? আশ্চর্য লোক মশাই.আপনারা!”
কিকিরা বললেন, “না, ম্যাজিক দেখাবার জায়গা এটা নয়। কিন্তু সাহেবমশাই, আপনি গত পরশু দিন, শনিবার, সন্ধেবেলা কী দেখতে গিয়েছিলেন কাঁঠালতলা গলিতে?”
জোয়ারদার বললেন, “আমি দেখতে যাইনি। আমাকে একজন বলল, ওখানে গেলে ওই শুদ্ধানন্দ আমাকে বাসুর গলা শোনাবে।”
“বাসু কে?”
“আমার বন্ধু।”
“আপনার ভগ্নিপতি এবং পার্টনার।”
“কেমন করে জানলেন?”
“আমি পিশাচসিদ্ধ।” বলে কিকিরা হাসতে লাগলেন।
“আপনি মশাই লোকটি কে?”
“কিকিরা দি ম্যাজিশিয়ান।…এখন বলুন তো, স্যার, সেদিন কি আপনি বন্ধুর গলা শুনেছিলেন?”
“একটা গলা শুনেছিলাম।”
“বন্ধুর?”
“মনে হল না বাসুর! সর্দিতে গলা বসে গেলে, কিংবা ফোনের লাইনে গোলমাল হলে যেরকম গলা শোনা যায়, সেইরকম এক গলা শুনলাম।”
“আচ্ছা! তা আপনি কি গলা শুনতেই গিয়েছিলেন, না, কোনো বিশেষ কথা ছিল?
জোয়ারদার খানিক চুপ করে থেকে বললেন, “ছিল। বিজনেস সিক্রেট। পার্সোনাল ব্যাপার।”
“কথা হল?”
“না।…গলাটা শুনলাম, বুঝলাম না। শুদ্ধানন্দ বলল, বাসুর আত্মা একটা লেভেলের এপারে আসতে পারছে না। কোথাও গোলমাল হচ্ছে। আত্মারা নিজের মরজিতে আসে; আবার আসতে চাইলেও সব-সময় পারে না ভিড়ে আটকে যায়। আসছে হপ্তায় আবার চেষ্টা করা যাবে।”
তারাপদ মুচকি হাসল। কিকিরাও হাসিমুখে বললেন,কত নিল? মানে কত টাকা?”
“একশো এক। বেটা বলল, পরের দিন যদি ঠিকঠাক এসে যায় বাসু, কথা বলে, পাঁচশো এক লাগবে।“
কিকিরা মাথা দুলিয়ে বললেন, “বাঃ!…দুশো, পাঁচশো, হাজার…! বাঃ! ভাল ব্যবসা।…তা জোয়ারদারমশাই, কালো আলখাল্লার ব্যাপারটা একটু বলবেন। শুনতে ইচ্ছে করছে।”
জোয়ারদার বললেন, “সে এক ভুতুড়ে কাণ্ড মশাই। ও আপনি বুঝতে পারবেন না। আমি বললেও ধরতে পারবেন না। চোখে দেখতে হবে আপনাকে। অবশ্য চোখে দেখবেনই বা কী! সব অন্ধকার, কালো; যারা থাকে তাদেরও একটা করে কালো আলখাল্লা পরতে হয়। কাঁধ থেকে পা পর্যন্ত তো বটেই, ঘাড় থেকে মাথা পর্যন্ত ঢাকা থাকে, অনেকটা সেই ইংরেজি সিনেমায় দেখা সেকেলে সাধুসন্ন্যাসীর মতন, যাকে ওই ‘রোব’-টোব বলে। ধরুন না, মেয়েদের ওয়াটার পুফের মাথা ঢাকার যেমন ব্যবস্থা থাকে–সেইরকম মাথা ঢাকা।…মশাই, একে অন্ধকার তায় কালো আলখাল্লা, তার ওপর ঘাড়-মাথা ঢাকা, কেউ কারও মুখও আঁচ করতে পারে না।”
তারাপদ বলল, “আলখাল্লা সঙ্গে নিয়ে যেতে হয়?”
না, না, ঘরে ঢোকার আগে এক জায়গায় বসিয়ে দেবে। দিয়ে বলবে, জামা-জুতো খুলে ওই আলখাল্লা পরে নিতে। ওরাই দেয় আলখাল্লা।”
কিকিরা বললেন, “যে ঘরে আপনারা ঢুকলেন, ঘরটা কেমন? সেখানে কী কী আছে?”
“আমায় জিজ্ঞেস করবেন না। আমি বলতে পারব না। জীবন আমার বেরিয়ে যাচ্ছিল। ..আপনি নিজেই যান না, দেখুন গিয়ে।”
“যাবার খুব ইচ্ছে। যাব কেমন করে?”
