“হ্যাঁ। তাঁর কাছে কেন?”
“ভেবে দেখলাম, সাহেব প্রেতসিদ্ধর ক্লায়েন্ট। বোধ হয় নতুন ক্লায়েন্ট। কালকের কথাবার্তা থেকে তাই মনে হল। তা সাহেব তো দেখলাম কাল শেষ পর্যন্ত প্রেতসিদ্ধ ভবনে চলে গেল। গিয়ে কী হল, কী দেখল, কী হয় সেখানে তার কিছু খোঁজ-খবর যদি নেওয়া যায়, ভালই হবে। তোমার জগুদা সরাসরি প্রেতসিদ্ধর কোনো খেলাই এখন পর্যন্ত দেখেনি। জোয়ারদার দেখেছেন।”
তারাপদ বলল, “খোঁজ পেলেন জোয়ারদারের?”
“পেয়েছি। আজ রবিবার। কাল সাহেবের দোকানে যাবার ইচ্ছে।” বলে কিকিরা সুবলের কাছে যাওয়া এবং জোয়ারদারের হদিস খুঁজে বার করার বৃত্তান্ত শোনালেন।
তারাপদ চা আনাতে যাচ্ছিল, বারণ করলেন কিকিরা। টেবিল থেকে তারাপদর সিগারেটের প্যাকেট-দেশলাই উঠিয়ে নিয়ে ধীরেসুস্থে একটা সিগারেট ধরালেন। তারপর বললেন, “তারাপদ আমি অনেক ভেবেছি। ভেবে দেখলাম, জগন্নাথের বাবার এবং মায়ের একটা ব্যাপার এখানে জড়িয়ে আছে। তোমায় আগেই বলেছি, জগন্নাথের বাবার অ্যাকসিডেন্ট আমার কাছে সাধারণ বলে মনে হচ্ছে না। তাঁর কাছে নিশ্চয়ই কিছু ছিল।” বলে কিকিরা চুপ করে থাকলেন। ভাবছিলেন কিছু। লম্বা করে সিগারেট টানলেন, বললেন আবার, “জগন্নাথের বাবা এই জিনিসগুলো তাঁর স্ত্রীকে রাখতে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, এমনভাবে লুকিয়ে রাখতে যেন কেউ টের না পায় কোনো দিন। জগন্নাথের মা স্বামীর কথামতনই জিনিসগুলো রেখেছিলেন। হয়ত একদিন জগন্নাথ তার মায়ের মুখ থেকেই জানতে পারত সব, কিন্তু ভদ্রমহিলা হঠাৎ মারা যাওয়ায় সেটা হয়নি।”
তারাপদ বলল, “আমিও আপনার কথা ভেবেছি স্যার। আমার মনে কিন্তু একটা খটকা রয়েছে। …আপনার প্রথম কথা আমি না হয় ধরে নিচ্ছি, জগুদার বাবা কিছু গুপ্তধন রেখে গেছেন। জগুদার মা ছাড়া সে-কথা অন্য কেউ জানত না। কিন্তু একটা কথা বলুন-জগুদা তার মায়ের একমাত্র ছেলে। মা কি ঘুণাক্ষরেও ছেলেকে এই গুপ্তধনের আভাস দেবেন না? বিশেষ করে জগুদারা যখন অত দুঃখকষ্ট করে মানুষ হচ্ছে, সংসার চালাচ্ছে?”
কিকিরা মাথাটা উঁচু করে ছাদের দিকে তুলে কিছু যেন লক্ষ করতে-করতে বললেন, “হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলেছ! কিন্তু ধরো সেই গুপ্তধন যদি এমনই হয়, যা সাধারণ অবস্থায় ছেলের কাছে বলা যায় না। হয়ত বলতে লজ্জা করে। হয়ত বললে ছেলে বিগড়ে যেতে পারে। তার ধারণা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। বা, এমনও হতে পারে তারাপদ, জগন্নাথ সাদামাটা নিরীহ ছেলে। কথাটা তার জানা থাকলে যদি পাঁচকান হয়ে যায়।”
“পাঁচকান?”
“জগন্নাথের বাড়ির শরিকদের কারও কারও কানে যেতে পারে।”
“আপনি কী বলতে চাইছেন?”
“আমি বলতে চাইছি,” বাধা দিয়ে কিকিরা বললেন, “দুটো জিনিস হালে ঘটতে পারে। এক, জগন্নাথদের বাড়ির কেউ-না-কেউ কোনোভাবে এই খবরটা জেনেছে, বা জানত। জগন্নাথের মায়ের জীবিত অবস্থায় সে বা তারা। গুপ্তধন হাতাবার সাহস করতে পারেনি। ভেবেছিল মহিলা অনেক বুদ্ধিমতী এবং শক্ত ধাতের মানুষ, সুবিধে হবে না। এখন অবস্থা পালটে গেছে।”
দাড়ি কামিয়ে গাল মুছতে মুছতে তারাপদ বলল, “বেশ, আপনার একটা অনুমান শুনলাম। দ্বিতীয়টা কী হতে পারে?”
“দ্বিতীয়টা এই হতে পারে–যার জিনিস জগন্নাথের বাবার কাছে ছিল, কিংবা ধরো চুরি গিয়েছিল–সেই লোক এতদিনে হাজির হয়ে পড়েছে। সে চাইছে নিজের জিনিস ফেরত নিতে।”
তারাপদ অবাক হয়ে বলল, “প্রেসিদ্ধ কি সেই লোক?”
কিকিরা বললেন, “প্রেতসিদ্ধ তার এজেন্ট হতে পারে।”
তারাপদ কথা বলতে পারল না।
.
০৬.
জোয়ারদারের দোকান খুঁজে পেতে অসুবিধে হল না। নাম বলতেই দেখিয়ে দিল অন্য-এক দোকানের কর্মচারী।
দোকানটা যে পুরনো বোঝাই যায়। সাবোর্ডের মাথায় লেখা আছে শুভারম্ভের সালটা। হিসেব করলে প্রায় পঞ্চাশে দাঁড়ায় এখন। তা পঞ্চাশ বছরের চেহারায় খানিকটা ভাঙাচোরা ময়লা ছাপ তো পড়বেই।
বড় দোকান বইকি! রাস্তার গা ঘেঁষে দোকান, মালপত্র সাজানো; কাঠের তক্তার “ল’; বোধ হয় ওখানে আরও মালপত্র ঠাসা আছে। কাঠের এক পার্টিশান একদিকে। পার্টিশানের ওপাশে জোয়ারদারের অফিস।
নানান ধরনের পাখা, ল্যাম্প, বাহারি আলোর শেড থেকে ইলেকট্রিক ইস্ত্রি, হিটার, মিটার কী না আছে দোকানে! ইলেকট্রিক তার, সুইচ, প্লাগ, মায় ইনভারটার পর্যন্ত।
দোকানে জনা-তিনেক কর্মচারী, একজন বুড়োসুড়ো ক্যাশবাবু।
তারাপদ সঙ্গেই ছিল। কিকিরা তারাপদকে ইশারায় বুঝিয়ে দিলেম যেন সে সঙ্গে-সঙ্গে থাকে তাঁর।
দোকানের এক কর্মচারী এগিয়ে এল। অন্যরা খদ্দের সামলাচ্ছে। ভিড় এমন কিছু নেই।
“কী চাই আপনার?” কর্মচারী এগিয়ে এসে বলল।
কিকিরা আগেভাগেই সব ছকে এসেছিলেন। বললেন, “মিস্টার জোয়ারদার কে? আপনাদের মালিক না?”
“হ্যাঁ, কেন?”
“তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চাই। দোতলা একটা বাড়ির ইলেকট্রিকের সবরকম কাজ হবে। ফিটিংস সুন্ধু। আমার এক বন্ধু মিস্টার জোয়ারদারের কথা বললেন। এখানে কোনো ঠগ-জোচ্চুরি নেই, খারাপ মাল বিক্রি হয় না, দামটাও ঠিকঠাক…। তাই না, তারাপদ?”
তারাপদ মাথা নাড়ল।
কর্মচারীটি যেন ধাঁধায় পড়ে গেল। দোতলা একটা বাড়ির ইলেকট্রিকের সমস্ত কাজকর্মের জিনিস যাবে এই দোকান থেকে? সে তো অনেক টাকার কাজ। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে হাজার বারো-চোদ্দ। মালপত্র দামি কিনলে আরও বেশি।
