সুবল হাতজোড় করে বলল, “ভীষণ অপরাধ হয়ে গিয়েছিল। হল কী জানেন, আমাকে যে ডেকে নিয়ে গেল সে একটা গুণ্ডা-ক্লাসের ছেলে। এক দোকানে ঢুকে গণ্ডগোল শুরু করে দিল। তার ক্যামেরা খারাপ করে দিয়েছে। মারপিট লেগে যাবার উপক্রম। ওদিকটা সামলে যখন এলাম, আপনি চলে গেছেন। আমি দাদা, ভেরি ভেরি সরি।”
কিকিরা হাসলেন। চুমুক দিলেন চায়ে। রাস্তাঘাটে গুণ্ডামি করার বয়েস সুবলের আর নেই। মাথায় তো টাক পড়ে গিয়েছে।
কিকিরা বললেন, “পাতিপুকুর চেনো?”
“পাতিপুকুর চিনব না, বলেন কী! ঘাড়ের পাশে পাতিপুকুর।“
“আসা-যাওয়া আছে?”
“আছে। আমাদের এক কোলিগ থাকে সেখানে। বঙ্কিম। তা ছাড়া হিরো রয়েছে।”
“হিরো?”
“নাটকের হিরো মধুময়।”
“একটা লোকের ঠিকানা আমার দরকার। পাতিপুকুরে থাকেন ভদ্রলোক। জোয়ারদার। বিশ্বনাথ জোয়ারদার। তাঁর বাড়ির ঠিকানা প্লাস কাজ-কারবারের ঠিকানা।”
“ছোকরা?”
“না, ছোরা নয়। মাঝবয়েসির ক্লাস।”
“কী নাম বললেন?”
“বিশ্বনাথ জোয়ারদার।”
সুবল কী যেন ভাবল। তারপর বলল, “ক’টা বাজল? আট, সোয়া-আট হবে!…দাঁড়ান, হিরোকে পেয়ে যেতে পারি। আজ রবিবার হলেও হিরো ভেরি বিজি। হয়ত কোথাও রিহার্সাল দিতে যাবে। ওকে একটা ফোন করি। হিরোর বাড়িতে ফোন আছে। আমার নেই। পাশের ফ্ল্যাট থেকে ধরতে হবে।…ভেরি আর্জেন্ট, কিকিরা?”
“ইয়েস, ভেরি-ভেরি।”
“তা হলে আপনি বসুন। গরম জিলিপি আসছে, খান। আমি ফোন করে আসি। বিশ্বনাথ জোয়ারদার, মাঝবয়েসি…”
“সাহেব-সাহেব পোশাক…?”
“ও. কে।”
সুবল চলে গেল।
কিকিরা চা শেষ করতে লাগলেন। কাল প্রেতসিদ্ধর বাড়ির বাগানে যে জোয়ারদার সাহেবের দেখা পেয়েছিলেন কিকিরারা, সেই ভদ্রলোকের সঙ্গে দু-চারটে কথা বলতে চান কিকিরা। জগন্নাথ প্রেতসিদ্ধর মুখোমুখি হয়নি, জোয়ারদার হয়েছিলেন। তিনিই বলতে পারেন, ওখানে কী হয়, কল্পবৃক্ষটি কী ধরনের ভেলকিবাজি দেখায়, কোন খেলা দেখায়!
গরম জিলিপির প্লেট এসে গেল সামান্য পরেই। যে-ছেলেটি জিলিপি এনেছিল তাকে দেখতে নেপালি-নেপালি। গাঁট্টাগোট্টা চেহারা, মাথার চুল ছোট। পরনে পাজামা, গায়ে কটকটে লাল গেঞ্জি। সুবলের পছন্দ আছে।
খানিকটা পরে সুবল ফিরল। ফিরেই বলল, “পেয়েছেন জিলিপি? দারুণ।”
“তুমি খাও।…হাত লাগাও।”
“লাগাচ্ছি। আগে জোয়ারদারের খবরটা দিয়ে নিই।” সুবল বসে পড়ল। বলল, “বিশ্বনাথ জোয়ারদার পাতিপুকুরেই থাকেন। পাড়ার পুরনো লোক। পয়সাঅলা। তাঁর একটা দোকান আছে এজরা স্ট্রিটে। ইলেকট্রিক্যাল গুডস বিক্রি হয়। বড় দোকান, চালু দোকান। পুরনো দোকানও। ভদ্রলোকের এমনিতেই মাথায় একটু ছিট ছিল। হালে তাঁর ছোট ভগ্নিপতি অ্যাকসিডেন্টে মারা যাওয়ায় কেমন খেপাটে হয়ে গিয়েছেন। ছোট ভগ্নিপতিটি ওঁর বন্ধু এবং ব্যবসার পার্টনার ছিলেন।”
কিকিরা মন দিয়ে শুনলেন সব। তারপর বললেন, “ভগ্নিপতির নাম?”
“জানি না। ভগ্নিপতির নামে কী হবে।”
“এজরা স্ট্রিটে দোকান?”
“হ্যাঁ।“
“কোনো নাম নিশ্চয় আছে দোকানের?”
“জিজ্ঞেস করিনি। নামকরা পুরনো দোকান। ওখানে কাউকে বললে নিশ্চয় দেখিয়ে দেবে।”
কিকিরা ঘাড় হেলালেন। অর্থাৎ বোঝালেন, হ্যাঁ, তা ঠিকই।
জিলিপি খাওয়া শেষ করে কিকিরা উঠে পড়লেন। বললেন, “চলি হে সুবলস।”
“আসুন। কিন্তু, আপনি মশাই শরৎকালের বৃষ্টির মতন এলেন, আবার চলে যাচ্ছেন, ব্যাপারটা বোধগম্য হল না আমার! জোয়ারদার ভদ্রলোকটি কে? আপনি তার খোঁজ নিতে বেরিয়েছেন সাতসকালে!”
কিকিরা গম্ভীর মুখ করে ডান হাত তুলে তিনটে আঙুল দেখালেন। “ক্লীং রিং হিং।” চোখ নাচিয়ে-নাচিয়ে শব্দগুলো উচ্চারণ করলেন জোরে জোরে।
সুবল অবাক হয়ে বলল, “মানে? ক্রিং ক্রিং!”
“না, সাইকেলের ঘণ্টি নয়, সংস্কৃত মন্ত্র। ক্লীং রিং হিং!”
সুবল উঠে পড়েছিল। কিকিরাকে এগিয়ে দেবে নিচে পর্যন্ত।
বাইরে এসে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে কিকিরা বললেন, “সুবল, আমি এখন এক বিশুদ্ধ প্রেতসিদ্ধ কল্পবৃক্ষের খোঁজে বেরিয়ে পড়েছি। শুনলাম সেই মহাপুরুষ রাত্রের দিকে আত্মালোকে বিচরণ করেন। তাঁর দেহটি বিছানায় পড়ে থাকে, চৈতন্যটি বায়ুলোকে সাঁতার কাটতে কাটতে আত্মালোকে চলে যায়…”
সুবল হেসে ফেলেছিল। “দারুণ তো! মহাপুরুষটি কে? থাকেন কোথায়?”
“টেগোর ক্যাসেল স্ট্রিট…কাঁঠালতলা গলি। শুদ্ধানন্দ প্রেতসিদ্ধ কল্পবৃক্ষঃ।”
“ভেরি ইন্টারেস্টিং। আমায় নিয়ে যাবেন?”
“দাঁড়াও। মহাপুরুষকে আগে দেখি!”
নিচে রাস্তায় এসে কিকিরা বললেন, “চলি। পরে দেখা হবে।”
.
বাড়ি ফিরলেন না কিকিরা। সোজা তারাপদর বোর্ডিংয়ে।
ছোট একফালি ঘর নিয়ে থাকে তারাপদ। একাই। কোনোরকমে একটা তক্তাপোশ পাতার মতন জায়গা ঘরে, অবশ্য একটি টেবিলও আছে ছোট মতন, আর একটি মাত্র চেয়ার।
কিকিরা এসে দেখেন, তারাপদ দাড়ি কামাবার ব্যবস্থা করছে। সেফটি রেজার, সাবান, ব্রাশ, আয়না নিয়ে তৈরি।
তারাপদ বলল, “কিকিরা-স্যার, আপনি?”
“সাত-তাড়াতাড়ি দাড়ি কামাতে বসেছ?”
“আপনার জন্যেই। ভাবছিলাম একবার জগুদার বাড়ি যাব। আজ রোববার, জগুদা বাড়িতেই থাকবে।”
কিকিরা বিছানাতেই বসলেন। বললেন, “খুব ভাল কথা। যাও, ঘুরে এসো।”
“আপনি কোথায় বেরিয়েছিলেন? সোজা আমার কাছে?
মাথা নাড়লেন কিকিরা। বললেন, “আমি গিয়েছিলাম বিশ্বনাথ জোয়ারদারের খোঁজ করতে। কালকের সেই জোয়ারদার-সাহেব মনে পড়ছে?”
