তারাপদ চুপ। সে যেন ব্যাপারটা মেনে নিতে পারছিল না। আবার এত কথা শোনার পর সরাসরি অবিশ্বাস করতেও বাধছিল।
চুরুট ধরিয়ে কিকিরা বললেন, “দুটো জিনিস হতে পারে। হয় কোনো চোরাইঅলার কিছু মাল জগন্নাথের বাবার কাছে ছিল; না হয়, কোনো দোকান থেকেই জগন্নাথের বাবা কিছু সোনাদানা, পাথর চুরি করে আনছিলেন। জিনিসগুলো ওঁর ফতুয়ার ভেতরের পকেটে, না হয় কোমরে কষির মধ্যে ছিল। হাতে ছিল না, পকেটেও নয়। মোটরসাইকেলঅলা যদি সহজে সেগুলো পেত, ছেড়ে পালাত না, কেড়েকুড়ে নিয়ে চলে যেত। ও জগন্নাথের বাবাকে ফলো করে এসেছিল জিনিসগুলো হাতাতে, পারেনি। তারপর তাড়া খেয়ে পালিয়ে যায়।”
তারাপদর চোখের পলক পড়ছিল না। কিকিরা কি ঠিক বলছেন? পাথর-টাথরের কথা যদি সত্যি হয়, জগুদার বাবা যে কোনো জুয়েলারের দোকান থেকে দু-দশটা দামি পাথর চুরি করে আনছিলেন, একথা সে বিশ্বাস করে না। ছি ছি। জগুদার বাবা চোর? কিকিরার কি মাথা খারাপ হয়েছে? এক মৃত ভদ্রলোকের নামে তিনি চোর অপবাদ দিচ্ছেন। তারাপদ মনে-মনে অসন্তুষ্ট, বিরক্ত হয়ে উঠেছিল। ক্ষুব্ধ হয়েই বলল, “আপনি জগুদার বাবাকে চোর ভাবছেন?”
কিকিরা বললেন, “না, চোর ভাবিনি। আমি বলছিলাম, হয় এটা না হয় ওটা! যুক্তিতে তাই বলে। অঙ্কের নিয়ম আর কি! তা ছাড়া তুমি কেমন করে বুঝছ, একটা মানুষ, খুব একটা খারাপ অবস্থায় পড়ে হঠাৎ একদিন লোভের বশে এমন কাজ করবে না! করতেও তো পারে। তবু চোর কথাটা বাদ দিচ্ছি। চোরাই মাল তো বটেই..।”
“আপনি কি বলতে চাইছেন, এই চোরাই জিনিসগুলো জগুদার বাবা জগুদার মাকে লুকিয়ে রাখতে বলে মারা যান?”
“আমার তাই মনে হয়।”
“আপনি ভুল করছেন কিকিরা-স্যার।”
“হতেই পারে ভুল। চাণক্য শ্লোকে নাকি বলেছে, বুদ্ধিমানে আধাআধি ভুল করে, বোকারা পুরোটাই ভুল করে।”
তারাপদ জবাব দিল না কথার।
কিকিরা চুরুট টানতে টানতে চোখ বুজে থাকলেন সামান্যক্ষণ। তারপর চোখ চেয়ে তারাপদকে দেখলেন। “এতক্ষণ যা শুনলে সেটা হল স্টেজের পেছনের ব্যাপার। যবনিকার অন্তরালে। তোমার-আমার চোখে পড়ছে না। পরের ব্যাপারটা বাপু অন্ দি স্টেজ। শুদ্ধানন্দ প্রেসিদ্ধ।…যাক্ সিনেমার এখানে ইন্টারভ্যাল, পরের ব্যাপারটা কাল-পরশু হবে। তুমি শুধু জগন্নাথদের বাড়ির ব্যাপারটা খোঁজখবর করো। ওর বাবা, ওর জ্ঞাতিগুষ্টি…যা যা পারো জেনে নেবার চেষ্টা কোরো।”
তারাপদ শুনল। মনে হল, কেমন যেন মুষড়ে পড়েছে।
.
০৫.
পরের দিন সাতসকালে কিকিরা একা-একাই বেরিয়ে পড়লেন। কলকাতা শহরের নানান এলাকায় তাঁর চেনাজানা লোজন রয়েছে, কেউ-কেউ বন্ধুর মতন, কেউ বা মুখচেনা, কিন্তু পাতিপুকুরে কেউ আছে বলে তাঁর মনে পড়ল না। না পড়ুক খোঁজ করতে করতে একটা হদিস তো পাওয়া যেতে পারে। সম্ভাবনা রয়েছে।
কিকিরা ঠিক করে নিয়েছিলেন, এ-বেলা অন্তত চার জায়গায় তিনি যাবেন। প্রথম যাবেন বদ্যিনাথ চক্রবর্তীর বাড়ি। মানিকতলায় থাকেন বদ্যিনাথ, জমি কেনাবেচার ব্যবসা ছিল, হয়ত এখনো আছে, বেলগাছিয়ার দিকে কাজ-কারবার করেছেন ভদ্রলোক। দেওঘরে আলাপ হয়েছিল কিকিরার সঙ্গে। ঠাকুর-দেবতায় ভীষণ ভক্তি। মানুষটিও আলাপী। কিকিরার সঙ্গে বার দুই-চার দেখাও হয়েছে পরে। পাতিপুকুরের খোঁজ দিলেও দিতে পারেন। কেননা ওপাশের জমি-জায়গার কারবার করা তাঁর পক্ষে সম্ভব।
মানিকতলার বাড়িতে বদ্যিনাথকে পাওয়া গেল না। উনি শরীর সারাতে ভুবনেশ্বর গিয়েছেন। মানিকতলা থেকে সোজা পল্টনবাবুর কাছে গ্রে স্ট্রিটে। পল্টনবাবু নেই। মধ্যমগ্রামে গিয়েছেন।
কিকিরার লিস্টে তিন নম্বর ছিল সুবল দেব। সুবল থাকে বেলগাছিয়ায়। সরকারি চাকরি করে আর নাটক করে বেড়ায়। হাসি-তামাশার অভিনয় ভালই করে। বকেশ্বর, ফাজিল, তবে কাজের লোক।
সুবলকে পাওয়া গেল। সবে ঘুম থেকে উঠে এক পট চা আর মগের মতন দুটো কাপ নিয়ে বসে-বসে চা খাচ্ছে, সামনে সকালের টাটকা কাগজ! রবিবারের সকাল বলে কথা।
কিকিরাকে দেখে সুবল প্রায় লাফিয়ে উঠল।“আরে দা-দ্দা–আপনি। শুভ প্রাতঃকাল! সকালে উঠে এ কার মুখ দেখছি..”
“দি গ্রেট কিকিরার মুখ দেখছ!”
“বসুন বসুন, আমার কী সৌভাগ্য!”
“তোমার মতন লুডিক্রাম লয়টারিং ল্যাল্যাফায়িং…”
“দাদা, প্লিজ, নো মোর “এল’! আপনি কি আজ “ল’-এর ঝাঁকা মাথায় করে এনেছেন! হরিফায়িং ব্যাপার!”
দু’জনেই হেসে উঠলেন জোরে।
কিকিরা বসলেন।
সুবল বলল, “দাদা, আগে চা হোক, তারপর দুটো টোস্ট ডিম…”
মাথা নাড়লেন কিকিরা। বললেন, “নো টোস্ট! গরম জিলিপি খাব। আনাও। তোমার সেই বুলেটটা, আছে?”
“না। বেটা নবদ্বীপ চলে গেছে। ওর মায়ের কাছে।…আপনি ভাববেন না। ব্যবস্থা আছে। চা দিয়ে শুরু করুন।”
সুবল এক মগ চা ঢেলে দিল। বলল, “দুধ-চিনি মিশিয়ে নিন, আমি আসছি।” সুবল ভেতরে চলে গেল।
কিকিরা দুধ-চিনি মিশিয়ে চায়ে চুমুক দিলেন। বাহুল্য নেই, কিন্তু গোছানো, ফিটফাট ঘর। বইয়ের আলমারি, রেকর্ড-প্লেয়ার, একরাশ রেকর্ড, পেপার পাল্পের মা দুগ, দু-চারটে ফোটো। সুবলের থিয়েটারের ফোটোও টাঙানো রয়েছে।
ফিরে এল সুবল। বসতে বসতে বলল, “বলুন দাদা? এই সকালে আমার মতন বখাটেকে মনে পড়ল?”
কিকিরা বললেন, “বলছি। তার আগে বলি, তুমি সেদিন আসছি বলে পালালে। আমি রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকলাম হাঁ করে, শেষে চলে এলাম।”
