তারাপদ কিছু বলার আগেই লোকটি নিজেই বলল, “দেখা হয়নি?”
মাথা নাড়ব কি নাড়ব না করে তারাপদ এমনভাবে মাথা নাড়ল যে হ্যাঁ-না কোনোটাই ঠিক করে বোঝা যায় না।
“তাড়াতাড়ি হয়ে গেল?” লোকটি বলল। গলার স্বরে যেন খানিকটা উপহাস। ওর হাতে একটা পাতায় মোড়া খাবারের ঠোঙা।
তারাপদ বুদ্ধি করে বলল, “আজ লোক বেশি। চলে এলাম।”
“ও! শনি-মঙ্গল বুঝি!”
“শুদ্ধানন্দজি এখানে কত দিন আছেন, দাদা?”
“কত দিন! ওই তো…গত বছর…তা ধরেন দেড় বছরটাক। “
“তা হলে বেশিদিন নয়।”
“ওই হল।…আয় ল্যাংড়া…।” লোকটি আর দাঁড়াল না, তার লেজুড়টিকে ডেকে নিয়ে গলির মধ্যে চলে গেল। নেড়ি কুকুরটার নাম ল্যাংড়া, না কি সে এক পায়ে ল্যাংড়া তারাপদ বুঝতে পারল না।
কিকিরা বললেন, “কে হে লোকটা?”
“এই গলিতে থাকে। যাবার সময় দেখা হয়েছিল।”
“প্রেতসিদ্ধর এজেন্ট নয় বলেই মনে হল।”
“কী জানি!”
“নাও, চলো।”
চন্দন বলল, “কিকিরা, এতরকম ঝাট না করে এখানকার থানায় একটা খবর দিয়ে দিলেই তো হয়।”
তারাপদ বলল, “থানায় খবর!..চাঁদু, তুই থানা দেখাস না। যা না, গিয়ে খবর দে। কচু হবে।”
কিকিরা বললেন, “থানা-টানা পরে, আগে কল্পবৃক্ষটিকে দেখি। আলাপ-পরিচয় হল না মহারাজের সঙ্গে, আগে থেকেই থানা-পুলিশ কেন! নাও, চলো। হাঁটতে হবে খানিকটা।”
.
চন্দনের জরুরি কাজ ছিল, সে নেমে গিয়েছিল আগেই, কিকিরা আর তারাপদ বাড়ি ফিরলেন সাড়ে আটটার পরই। তারাপদর বোর্ডিংয়ে ফিরতে ফিরতে রাত হবে। কিকিরার বাড়িতেই খাওয়া-দাওয়া সেরে সে নিজের আস্তানায় ফিরবে। মাসের মধ্যে চার-পাঁচটা দিন তার এইভাবেই কাটে।
বাড়ি ফিরে বগলাকে চা করতে বললেন কিকিরা। তারপর আরাম করে বসলেন।
তারাপদও গা ছড়িয়ে বসে পড়ল।
কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর কিকিরা বললেন, “তারাপদ, তোমার অফিসের বন্ধু জগন্নাথের বাড়িতে এমন কেউ নেই যে হাঁড়ির খবর-টবর দিতে পারে?”
মাথা নাড়ল তারাপদ। বলল, “না। হাঁড়ির খবরে আপনি কী করবেন?”
কিকিরা বললেন, “জগন্নাথের বাবা সম্পর্কে খোঁজ-খবর করা দরকার।”
“কেন?”
“আসল রহস্যটা বোধ হয় ওখানে।”
“আপনি তখনও কথাটা বললেন, স্যার। আমি কিন্তু বুঝিনি। জগুদার বাবা কবে মারা গিয়েছেন, এখন তাঁকে টানাটানি কেন? মরা মানুষের সঙ্গে কিসের সম্পর্ক…”
“তুমি কিছু বুঝলে না.” তারাপদকে কথা শেষ করতে না দিয়ে কিকিরা বললেন। “একটু মাথা খাটাও।”
“আপনিই বলুন।”
দু-চার মুহূর্ত কথা বললেন না কিকিরা, তারপর বললেন, “জগন্নাথের বাবা কী ছিলেন? না, জুয়েলার! তাঁর নিজের অবস্থা খারাপ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু তিনি তাঁর পেশা এবং নেশা কোনোটাই ছেড়ে দেননি। ভদ্রলোক একজন নামকরা স্টোন স্পেশ্যালিস্ট ছিলেন। বড় বড় কয়েকটা দোকানে আসা-যাওয়া করতেন, তাদের পাথর-টাথর পরখ করে দিতেন। ওঁর নিজের হাতে কোনো মক্কেল এলে উনি চেনা দোকান থেকে মালপত্র কিনিয়ে দিতেন। তাতে নিজের একটা কমিশন থাকত। তাই না? রাইট?”
“রাইট!” তারাপদ মাথা হেলাল।
বগলা চা এনেছিল। এগিয়ে দিল। দিয়ে চলে গেল।
চায়ে চুমুক দিয়ে কিকিরা আরামের শব্দ করলেন। পরে বললেন, “এই ভদ্রলোক, জগন্নাথের বাবা, একদিন বর্ষাকালে বৃষ্টির মধ্যে বাড়ি ফিরছিলেন। তখন সন্ধে। এমন সময় এক মোটরবাইকঅলা এসে তাঁকে বাড়ির কাছাকাছি, পাড়ার মধ্যে আচমকা ধাক্কা মারে ভদ্রলোক রাস্তায় পড়ে যান। আশেপাশের রিকশাঅলারা চেঁচামেচি করে উঠতেই মোটরবাইকঅলা পালিয়ে যায়। রাইট?”
মাথা হেলিয়ে সায় দিল তারাপদ। চা খেতে লাগল।
কিকিরা বললেন, “জগন্নাথের বাবাকে ধরাধরি করে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হয়। সেখান থেকে হাসপাতাল। দিন-তিনেক পরে তিনি মারা যান।”
“কোথায় যে চোট লেগেছিল জগুদা জানে না। বলতে পারে না, তারাপদ বলল।
“কোমরের কোনো বেকায়দা জায়গায় লাগতে পারে বা ধরো পড়ে যাবার পর মাথাতেও লাগতে পারে। হেড ইনজিউরি।”
“হতে পারে। অ্যাকসিডেন্ট ইজ অ্যাকসিডেন্ট…”।
কিকিরা তারাপদকে দেখতে-দেখতে বললেন, “আমি যদি বলি ওটা অ্যাকসিডেন্ট নয়!”
“নয়?” তারাপদ অবাক হয়ে বলল।
“ধরো, জগন্নাথের বাবার কেউ পিছু নিয়েছিল। যে-লোকটা পিছু নিয়েছিল সে জেনেশুনে ইচ্ছে করে জগন্নাথের বাবাকে ধাক্কা মেরেছে।”
“জেনেশুনে? আপনি বলছেন কী, কিকিরা?জগুদার বাবাকে কি তবে জখম করার, খুন করার চেষ্টা হয়েছিল?”
“খুন না হোক, অন্তত জোর জখম।“
“কেন?”
“কেন!…কেন তা ভেবে দেখে আমার মনে হয়েছে, জগন্নাথের বাবার কাছে অত্যন্ত মূল্যবান কিছু ছিল। কী থাকতে পারে? সোনাদানা, না, পাথর? সোনাদানা থাকার চেয়েও যেটা সম্ভব সেটা হল পাথর। দু-চার টুকরো দামি হীরে, চুনি, ক্যাটস আই..”
“কী বলছেন আপনি, কিকিরা? হীরে, চুনি নিয়ে একটা লোক বৃষ্টির মধ্যে বাড়ি ফিরবে? তা ছাড়া জগুদার বাবা ওসব পাবেনই বা কেমন করে?”
“কেন? ওঁর পক্ষেই তো পাওয়া সম্ভব।” কিকিরা হাত বাড়িয়ে চুরুটের খাপ টেনে চুরুট বার করতে লাগলেন। বললেন, “কোনো জুয়েলারের দোকান থেকে আনছিলেন। কিংবা কোনো জুয়েলারের দোকানে বেচতে নিয়ে গিয়েছিলেন।”
“বেচতে? জগুদার বাবা! আপনি ভুলে যাচ্ছেন–জগুদার বাবার যা অবস্থা ছিল…”
“জানি হে জানি। অবস্থা ভাল ছিল, না ওঁর। কিন্তু এই কলকাতা শহর বলে নয়, সর্বত্র স্মাগল্ড বা চোরাই সোনা, পাথর বেচাকেনা হয়। ধরো, কোনো চোরাইঅলা জগন্নাথের বাবার মারফত কিছু পাথর বিক্রি করতে চেয়েছিল। বলবে, তা কি সম্ভব? আমি বলব, সম্ভব। সম্ভব ওই জন্যে যে, সব কারবারের মতন এ-সব কারবারেরও একটা সার্কেল আছে। রিং। ওরা। পরস্পরকে চেনে। কারবার করে। বিশ্বাসও করে।”
