তারাপদ ভাঙা ফটকের কাছেই কিকিরাদের পেয়ে গিয়েছিল। কিকিরাই নিচু গলায় ডেকে নিয়েছিলেন তারাপদকে।
ওরা তিনজনে গাছপালার আড়ালে এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল যে, এই বাড়িতে কারা আসছে সেটা নজর করা যায়। এখনো চাঁদ ওঠেনি। চাঁদ না উঠলেও অন্ধকার সামান্য ফিকে হয়েছে। আকাশের একপাশে চাঁদ উঠি-উঠি করছে।
কিকিরা ভেবেছিলেন, জায়গাটা একবার দেখেশুনে আজ চলে যাবেন। বেশি উঁকিঝুঁকি মারার চেষ্টা করবেন না। প্রথম দিনে ধরা পড়ার সম্ভাবনা বেশি। কিছুই যে জানেন না। সাবধান হতে পারবেন না। প্রেসিদ্ধর চেলারা কখন কোন দিক থেকে দেখে ফেলবে কে জানে!
কিন্তু প্রেতসিদ্ধর আখড়ায় পৌঁছে দেরি হতে লাগল। ২০১২
এর মধ্যে দুটো ঘণ্টা পড়ে গিয়েছে। পেটা ঘড়িতে ঘণ্টা বাজানোর মতন করে ঢং করে ঘণ্টা বাজাচ্ছিল কেউ।
এখন আর ঘণ্টা বাজছে না।
চন্দন হাত বাড়িয়ে কিকিরাকে ঠেলা দিল। চাপা গলায় বলল, “সাহেব!”
কিকিরা তাকালেন। তারাপদও দেখল।
কোট-প্যান্ট পরা একটা লোক ভাঙা ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে কী যেন দেখছিল। অল্পক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে সে সামনের দিকে পা বাড়াল। দাঁড়াল, আবার। বুঝতে পারছিল না কোন দিকে যাবে। কিকিরাদের বড় কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছে লোকটি।
লোকটা জোরে-জোরে কাশল। তারপর গলা চড়িয়ে ডাকল, “কে আছে?”
বারকয়েক ডাকাডাকির পর সাহেব যখন বিরক্ত হয়ে পায়চারি করছে, বাড়ির দিক থেকে একজনকে এগিয়ে আসতে দেখা গেল।
সাহেব কিছু বলার আগেই লোকটা যেন কী বলল। শোনা গেল না।
পকেট হাতড়ে সাহেব এক টর্চ বার করেছিল বোধ হয়। আলো জ্বলল। ছোট টর্চ নিশ্চয়। সঙ্গে-সঙ্গে তার হাত থেকে টর্চ কেড়ে নিল লোকটা, প্রেতসিদ্ধর চেলা। টর্চ নিবিয়ে দিল।
সাহেব এবার খাপ্পা হয়ে উঠেছিল। চেঁচিয়ে বলল, “এটা কী?”
লোকটা বলল, “এখানে আলো নিয়ে আসা বারণ। লিখে দেওয়া হয়েছিল। চিঠি কই?”
সাহেব পকেট থেকে কী-একটা বার করল।
অন্ধকারেই লোকটা চিঠি দেখল, না, চিঠির চেহারা দেখেই বুঝে নিল সব কে জানে! বলল, “জোয়ারদার?”
“বিশ্বনাথ জোয়ারদার। পাতিপুকুর থেকে আসছি।…কী জায়গা তোমাদের! খুঁজে পাওয়া যায় না। এমন জায়গায় মানুষ আসে?”।
“দরকার পড়লেই আসে। …কথা বলবেন না। আসুন।” বলে লোকটা ফিরতে লাগল। ফিরতে-ফিরতে বলল, “দেরি করে এলে ঘরে ঢুকতে দেবার নিয়ম নেই। গুরুজি আসনে বসে পড়েছেন। ঘর বন্ধ। দেখি কী বলেন।“
দু’জনের কথাবার্তা অস্পষ্টভাবেই শোনা যাচ্ছিল। শেষে আর কথা শোনা গেল না, ওরা এগিয়ে তফাতে চলে গেল।
তারাপদ বলল, “বাঙালিসাহেব।”
কিকিরা বললেন, “জোয়ারদার। বাবা বিশ্বনাথ।”
চন্দন বলল, “ক’জন হল কিকিরা?”
“সাহেবকে নিয়ে পাঁচজন। প্রথমে এসেছিল টাক, সেকেন্ড এল দাড়িঅলা বুড়ো, তিন নম্বর এল–রোগাসোগা চশমা চোখে, মাস্টার-মাস্টার চেহারার লোকটা, চার নম্বর হল তোমার সেই পাজামা-পাঞ্জাবি পরা ছোকরা। আর লাস্ট এই জোয়ারদার।”
তারাপদ বলল, “আরও আসবে নাকি?”
“শনিবারের বাজারে পাঁচজন–মন্দ কী! এখানেই তো পঞ্চমুখী হয়ে গেল।”
ধীরে-ধীরে কথা বলছিল ওরা। গলার শব্দ উঠছিলই না। গায়ে-গায়ে তিনজনে দাঁড়িয়ে আকাশে চাঁদ উঠে এল।
চন্দন বলল, “দাঁড়িয়ে থেকে আর লাভ আছে?”
কিকিরা ভাবলেন সামান্য। তারপর বললেন, “না। আজকের মতন এখানেই ইতি। ভেতরে উঁকি মারার চেষ্টা করে লাভ নেই, ধরা পড়ে যাব। ওটা পরে হবে। জায়গাটা তো দেখা হয়ে গেল। আমি সকালের দিকেও খোঁজ নিতে পারব দু’-একদিনের মধ্যেই।”
“তা হলে ফেরা যাক।”
“চলো।”
সাবধানেই বাড়ির চৌহদ্দির বাইরে এল তিনজনে। জ্যোৎস্না ফুটতে শুরু করেছে। হাওয়া আসছিল গঙ্গার দিক থেকে। কাছেই গঙ্গা। এই সরু গলিটা দিয়ে এগিয়ে গেলে কি গঙ্গা পাওয়া যাবে? কে জানে!
ফিরতি পথে তারাপদ বলল, “কিকিরা-স্যার, কী মনে হচ্ছে আপনার?”
কিকিরা বললেন, “মনে হচ্ছে, কল্পবৃক্ষটির গাছে রাই ফ্রুট ভালই ফলেছে।”
চন্দন জোরে হেসে উঠল।“রাইপ ফ্রুট!”
“গাছে ফল-ফুল ছাড়া আর কী ধরবে হে! এ-গাছ আবার ফুল ধরার গাছ নয়, ফলং বৃক্ষঃ। মানে ফল-ধরা গাছ।” কিকিরা রগুড়ে গলায় বললেন, পাকা লোক, প্রেতসিদ্ধ মহাপুরুষ উনি! পাকা ফল ফলাতে কতক্ষণ!”
তারাপদ বলল, “মহাপুরুষকে একবার যে দেখতে ইচ্ছে করছে, কিকিরা?”
“হবে। তর সও। এত তাড়াতাড়ি কি সব হয়! ধৈর্য ধরতে হবে, মাথা খাটাতে হবে। তবে না!”
হাঁটতে-হাঁটতে গলি দিয়ে বড় রাস্তায় এসে পড়ল তারাপদরা।
সঙ্গে-সঙ্গে লোডশেডিং। কলকাতা বলে শহর। আলো না গেলে কি হয়!
ঝপ করে অন্ধকার হয়ে যাওয়ায় তিনজনেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। অচেনা জায়গা। কোন দিকে এগোবে যেন ঠাওর করতে পারছিল না। চোখ সইয়ে নিতে সময় লাগল সামান্য। ধীরে-ধীরে জ্যোৎস্নাও ফুটে উঠেছিল। এ-দিকটায় দোকানপত্র বেশি নেই। বসতবাড়িও কম। পর-পর বুঝি গুদোম-ঘর। কাঠগোলাও রয়েছে। লণ্ঠন, কুপি, মোমবাতি জ্বলে উঠতে লাগল একে-একে।
কিকিরা তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে পা বাড়াতে যাচ্ছেন এমন সময় তারাপদ সেই ঢ্যাঙা লোকটিকে আবার দেখল। সঙ্গে তার নেড়ি কুকুরটাও। লোকটি বোধ হয় বাড়ি ফিরছে।
তারাপদর সঙ্গে লোকটির চোখাচুখি হয়ে গেল। চলে যেতে গিয়েও দাঁড়িয়ে পড়ল সে। হয়ত তারাপদদের তিনজনকে দেখছিল। তখন তারাপদ ছিল একলা মানুষ; এখন তিনজন হয়ে গেল কেমন করে?
