কিকিরা বললেন, “গাছের শেকড়টা বোধ হয় ওই বাবাতেই ছড়িয়ে আছে। এ যা দেখছ–এগুলো ওপরের ডালপালা।”
“মানে?”
“মানেটা বোঝবার চেষ্টা করো স্যান্ডেল উড! তুমি তো ডাক্তার। একটা লোক এসে তোমায় বলল, তার মাথা ব্যথা করছে, তুমি তখন কী করবে? ব্যথাটা কেন, কী থেকে হচ্ছে জানার চেষ্টা করবে না। এটাও হল সেইরকম। শুদ্ধানন্দ বাবাজি হল পরের ব্যাপার, আগের ব্যাপারটা তো জানতে হবে।”
তারাপদ হঠাৎ বলল, “স্যার, আমরা বোধ হয় এসে গিয়েছি।”
চন্দন দাঁড়িয়ে পড়ল।
ক’দিন আগে পূর্ণিমা গিয়েছে। আজ কোন তিথি কে জানে। এখনো চাঁদ ওঠেনি। কৃষ্ণপক্ষ। অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল।
কিকিরা ভাল করে দেখলেন। বললেন, “এই গলিটাই মনে হচ্ছে।”
চন্দন বলল, “হ্যাঁ, এই গলি। গাছটাও রয়েছে।”
“তবে এসো,” বলে কিকিরা পা বাড়ালেন।
জগন্নাথ যেমন-যেমন বলেছিল, গলির বাঁ দিকে লম্বা একটানা টিনের চালা, গুদোমখানার মতনই দেখতে। ডান দিকে ঠেলাঅলাদের আস্তানা। সরু গলি, ইট বাঁধানো। ভাঙা ঘরবাড়ি, আগাছা আর স্যাঁতসেঁতে জমিজায়গার এক ঘন গন্ধ রয়েছে। এই গলিতে বাতিও জ্বলে না।
একটু লক্ষ করলেই বোঝা যায়, গুদোমখানা বা ঠেলাগাড়ির আস্তানার পেছন দিকের গলি এটা। এই গলি দিয়ে মানুষই কোনোমতে চলতে পারে, আর কিছু করা সম্ভব নয়।
কবেকার এক পুরনো ভাঙা মন্দির, ভেঙে পড়া বাড়ির স্তূপ, গাঁ-গ্রামের মতন শ্যাওড়া আর কুলঝোঁপ, জোনাকি উড়ছিল কয়েকটা।
খানিকটা এগিয়ে কিকিরা বললেন, “ওহে, একসঙ্গে এসো না। পজিশন নিয়ে এগোও।“
চন্দন ঠাট্টা করে বলল, “আমরা কি যুদ্ধে যাচ্ছি, না, ডাকাতি করতে যাচ্ছি যে পজিশন নেব?”
কিকিরা মজার গলায় বললেন, “স্পাইয়িং করতে যাচ্ছি। স্পাইয়িং করার সময় ঘাপটি মেরে যেতে হয়, বুঝলে?”
“বুঝলাম।”
“তোমাদের কাছে টর্চ নেই?”
“না।”
“আমার কাছে আছে। আমি এখন টর্চ জ্বালাব না। নেহাত দরকার না পড়লে জ্বালাবই না। আমি আগে-আগে যাচ্ছি। তোমর পেছন-পেছন এসো। তফাতে থাকবে। কেউ যেন কাউকে চেনো না, এইভাবে আসবে।”
তারাপদ বলল, “ঠিক আছে। আপনি এগিয়ে যান।”
কিকিরা বিশ-পঁচিশ পা এগিয়ে গেলেন। তারাপদ বলল, “চাঁদু, তুই এগো। আমি সবার শেষে।”
সামান্য দাঁড়িয়ে থেকে চন্দনও পা বাড়াল।
তারাপদ অপেক্ষা করতে লাগল।
সামান্য পরে তারাপদর মনে হল, পেছনে যেন কার পায়ের শব্দ হচ্ছে। আসছে কেউ। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখবে কি দেখবে না করেও সে ঘাড় ঘোরাল না। গলি দিয়ে লোকজন আসতেই পারে। কৌতূহল দেখানো উচিত নয়।
তারাপদ খুব আস্তে-আস্তে হাঁটতে লাগল, যেন তার পায়ে চোট রয়েছে, জোরে-জোরে হাঁটতে পারছে না।
শব্দটা ক্রমশই কাছে এসে গেল।
হঠাৎ তারাপদর মনে হল, শ্ৰদ্ধানন্দর কোনো চেলা তাদের ওপর নজর রাখছে না তো? কিন্তু তাই বা কেমন করে হবে। ওরা যে আজ কাঁঠালতলার গলিতে গোয়েন্দাগিরি করতে আসছে এ-কথা অন্য কেউ জানে না। জগুদাও নয়।
তারাপদ ঘাবড়াল না। আগের মতনই হাঁটতে লাগল। সামনে চন্দন রয়েছে, তার আগে কিকিরা। বেমক্কা কিছু ঘটলে তারাপদ চেঁচাবে। তার চিৎকার শুনলে চন্দনরা ছুটে আসবে।
একেবারে ঘাড়ের ওপর কে যেন এসে পড়ল। দাঁড়াল তারাপদ। ঘাড় ঘোরাল।
অন্ধকার এমন নয় যে লোক দেখা যায় না। তারাপদ লোকটাকে দেখল। দেখে অবাক হল। কুচকুচে কালো, নাদুসনুদুস, টাক মাথা বয়স্ক এক ভদ্রলোক। ধুতি-জামা পরা। চোখে চশমা। হন্তদন্তভাবে হাঁটছিল। ঘাড়ে এসে পড়েছে।
তারাপদ ইচ্ছে করেই বলল, “দাদা, একটু সামলে…। ঘাড়ে এসে পড়ছেন যে!”
লোকটি কোনো কথা বলল না। যেন কানেই তুলল না কথাটা। দেখলেও না তারাপদকে। হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে গেল। ওর তাড়া দেখে মনে হল, কোনো দিকে খেয়াল রাখার মতন অবস্থা এখন আর মশাইটির নেই। আশ্চর্য!
হাঁটতে-হাঁটতে তারাপদ লোকটিকে দেখছিল। ও কি প্রেতসিদ্ধর কাছে যাচ্ছে? বোধ হয় সেখানেই যাচ্ছে।
গলিটা একেবারে সোজা নয়, ডাইনে-বাঁয়ে বাঁক আছে। লোকটা কোথায় মিলিয়ে গেল।
চন্দন বা কিকিরাকেও দেখতে পাচ্ছিল না তারাপদ। আড়ালে পড়ে গিয়েছে ওরা। খানিকটা এগোতেই বাঁ দিকের এক ভাঙাচোরা একতলা বাড়ির সদর খুলে গেল আচমকা। শব্দ হল। এরকম একটা দরজা এখানে থাকতে পারে কে জানত! দরজার চেহারা দেখলেই ভয় করে। কালো ঝুল যেন। বোঝাই যায় না ওটা দরজা না অন্য কিছু।
দরজা খুলে ঢ্যাঙামতন একটা লোক বেরিয়ে এল। তার পেছন-পেছন এক নেড়ি কুকুর। কুকুরটা ডেকে উঠেছিল। তারাপদর পায়ের কাছে ছুটে আসতে-না-আসতেই ঢ্যাঙা লোকটা ধমক দিল কুকুরটাকে।
তারাপদকে দেখতে-দেখতে লোকটা বলল, “কোন বাড়ি চাই?” ওর গলার স্বর ভাঙা, খসখসে।
তারাপদ ঘাবড়ে গেল। বলল, “এটা কাঁঠালতলার গলি নয়?”
“হ্যাঁ।”
“এখানে শুদ্ধানন্দ গুরুজি?”
“ও!…সিধে হাঁটতে হবে।”
“কতটা?”
“পাঁচ-সাত মিনিট।” বলে লোকটা উলটো দিকে পা বাড়াতে গিয়ে থেমে গেল। বলল, “ঘন্টা পড়েছে?”
“ঘণ্টা?”
“ঘণ্টা পড়ার পর বাবার ওখানে ঢোকা যায়।”
“ও।”
“প্রথম ঘণ্টাও পড়েনি?”
“শুনিনি।..তবে একজনকে যেতে দেখলাম।”
“আজ শনিবার না? ঘণ্টা পড়ে যাবে।” বলে লোকটা আর দাঁড়াল না। এগিয়ে গেল। আর সঙ্গে সঙ্গে দূর থেকে ঢং করে ঘণ্টা বেজে উঠল।
.
০৪.
বাড়িটা যে কার ছিল, কিসের ছিল–কিছুই বোঝা যায় না। অনেকটা কুঠিবাড়ির মতন দেখতে। চারপাশে গাছপালার জঙ্গল। ভাঙাচোরা পাঁচিল। একসময় হয়ত কোনো সাহেব কোম্পানির ঘাঁটি ছিল, কিংবা কোনো সাহেবসুবো থাকত, ব্যবসা বাণিজ্য দেখাশোনা করত। এখন বাড়িটার কিছু কিছু কোনোরকমে দাঁড়িয়ে আছে, বাকিটা ভেঙে পড়েছে।
