কিকিরা বললেন, “একসময় মাটি দিয়ে, ছেঁড়া কাপড়চোপড়, তুলো, কাঠের গুঁড়ো পুরে ডামি করা হত। দিনকাল পালটে গিয়েছে। এখন যা ডামি করে আসল-নকল বোঝা যায় না।”
বগলা চা নিয়ে এসেছিল। চা রেখে দিয়ে চলে গেল।
চায়ের কাপ তুলে নিয়ে তারাপদ বলল, “নিন, চা খেয়ে নিন। তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়তে হবে।”
কিকিরা বললেন, “সন্ধের মুখে-মুখে পৌঁছতে পারলেই ভাল।”
“কেন?”
“লুকিয়ে-চুরিয়ে দেখতে হবে প্রেতসিদ্ধর আখড়া। কারও চোখে পড়তে চাই না। তবে আজকাল তো পাঁচটা বাজলেই অন্ধকার হয়ে যায়। আমরা ঠিক সময়ে পৌঁছে যাব।”
চন্দন চা খাচ্ছিল; বলল, “স্যার, আজ শনিবার। আজ প্রেতসিদ্ধর আখড়ায় গ্যাদারিং বেশিই হতে পারে। তাই নয়?”
কিকিরা মজার গলায় বললেন, “শনিবার বারবেলার পর টাইমটা ভাল। মনে হয়, মক্কেল ভালই হবে। চলো, দেখা যাক কী হয়!”
চা খাওয়া শেষ করে উঠতে উঠতে সামান্য সময় লাগল। তারপর উঠে পড়ল তিনজনে।
.
ট্যাক্সিতে যেতে-যেতে কিকিরা বললেন, “তারাপদ, জগন্নাথের জ্ঞাতিগুষ্ঠি যারা একই বাড়িতে থাকে ওর সঙ্গে, তাদের তুমি চেনো?”
মাথা নাড়ল তারাপদ। বলল, “চেনা বলতে দু’-একজনকে দেখেছি। জগুদার বাড়িতে আমি বার তিন-চার গিয়েছি। তখনই যা দেখেছি। সকলকে নয়, দু-একজনকে চিনি।”
“জগন্নাথ তার জ্ঞাতিদের সম্পর্কে কিছু বলে না?”
“কারও কারও সম্পর্কে বলে।”
“যেমন?”
তারাপদ রাস্তা দেখছিল। কলকাতার রাস্তায় বাতি জ্বলে উঠেছে। আজ খানিকটা মেঘলা রয়েছে। বৃষ্টি হবার আশা অবশ্য নেই। কিন্তু মেঘলার দরুন, ধুলো আর হালকা কুয়াশা মিলে অন্যদিনের তুলনায় ঝাপসা ভাবটা বেশিই হয়েছে আজ।
তারাপদ বলল, “জগুদা কী বলে জানতে চাইছেন?…জগুদার মুখে দু’জনের। কথা বেশি শুনেছি। একজন তার কাকা, জ্ঞাতিসম্পর্কে। পুরো নাম জানি না, জগুদা বলে, কুমারকাকা। অন্যজন জগুদার দাদা হয় সম্পর্কে, বাচ্চুদা। দু’জনেই নচ্ছার টাইপের। জগুদাকে বিরক্ত করে, খোঁচায়, তামাশা করে তাকে নিয়ে। আসলে ওরা জগুদাকে পছন্দ করে না। জগুদাও ওদের দেখতে পারে। না।”
চন্দন বলল, “তুই একদিন একটা লোকের সঙ্গে কথা বলছিলি কলেজ স্কোয়ারে দাঁড়িয়ে, সেই লোকটা?” বলে চন্দন তারাপদকে ইশারায় যেন বোঝাতে চাইল, ঘাড়ে-গদানে হওয়া একটা লোক কি না!
তারাপদ ভাবল একটু। বলল, “কবে বল তো?”
“আরে সেই যে ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটে নাটক দেখতে গেলাম..”
“ও! না, না, সে তো আমাদের বিল সেকশানের জয়ন্তদা। জয়ন্তকুমার। এ অন্য। এর নাম জানি না। জগুদা বলে কুমার কাকা। আমি ভদ্রলোককে দেখেছি। চোখে চিনি। হিন্দি সিনেমার ফাইটারদের মতন দেখতে। সলিড বডি।”
“বয়েস কত?” কিকিরা জিজ্ঞেস করলেন।
“ক-ত আর! বছর বিয়াল্লিশ-চুয়াল্লিশ। দারুণ বডি।”
“ও! আর তোমার ওই বাচ্চুদা?”
“সেটাকে একেবারে পাড়ার গুণ্ডা বদমাশের মতন দেখতে। চেহারা দেখলে আপনি হাসবেন। ল্যাকপ্যাক করছে। তবে স্যার, তার ড্রেস, চোখে গগলস, গলায় রুপোর চেন, মাথার চুল দেখলে বুঝতে পারবেন পাড়ার ঘাঁটিতে তার প্রেস্টিজ আছে। রেসিং সাইকেল নিয়ে ঘোরে। সাইকেলে নাকি ব্রেক নেই, ঘন্টিও নয়।”
চন্দন হেসে ফেলে বলল, “ব্রেকলেস বাচ্চু। …ব্রেক থাকবে না পায়ে ব্রেক মেরে সাইকেল থামাবে, ঘণ্টি থাকবে না–তোর ঘাড়ে পড়তে পড়তে পড়বে না, বেরিয়ে যাবে শাঁ করে, এ-সব হল কায়দা। যার যত কায়দা সে তত বড় হিরো। জানিস?”
জানে তারাপদ।
কিকিরা বললেন, “ব্রেকলেসবার বয়েস কত?”
“জগুদার চেয়ে এক-আধ বছরের বড়। জগুদা যা বলে।
“এরা দু’জন করে কী?”
তারাপদ বলল, “বাচ্চু কিছুই করে না। পাড়ার কাছে কোথায় একটা লন্ড্রি খুলেছিল একবার। বলত, শালকরের দোকান। কিছু শাল ঝেড়ে দিয়ে দোকান বন্ধ করে দেয়। তারপর কিছুদিন ও-পাড়ার কোনো সিনেমা হাউসের টিকিট ব্ল্যাকে নেমেছিল। পুলিশ ওকে ধোলাই দেবার পর সেটাও ছেড়ে দেয়। এখন কী করে জানি না।”
কিকিরা বললেন, “বাঃ! দুটিই রত্ন। কাকা-ভাইপো। বডিবিল্ডার-কুমার আর ব্রেকলেস বাচ্চু! ভেরি গুড।”
চন্দনের খেয়াল হল। বলল, “এখানে নেমে পড়া ভাল।“
তারাপদ সঙ্গে-সঙ্গে ট্যাক্সি থামাতে বলল।
.
খানিকটা আগেই নেমে পড়েছিল তারাপদরা। হাঁটতে লাগল। রাস্তার লোকজনকে জিজ্ঞেস করছিল মাঝেসাঝে। উত্তর কলকাতার এই জায়গাটার যেমন কেমন মরা-অবস্থা। আদ্যিকালের এলাকা বলেই বোধ হয় তার আর কোনো শোভা নেই। রাস্তা, দোকান, বাড়িঘর সবই খাপছাড়া, ভাঙাচোরা। পুরনো দিনের গন্ধও বুঝি পাওয়া যায়।
অনেকটা এগিয়ে এসে তারাপদ বলল, “কিকিরা-স্যার, আমরা কি গঙ্গার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি?”
কিকিরা মাথা নাড়লেন।
চন্দন বলল, “চিতপুরের এইসব এলাকা এককালে কলকাতার বনেদি পাড়া ছিল, তাই নয় কিকিরা?”
কিকিরা বললেন, “ছিল বই কি!” বলে তারাপদর দিকে মুখ ফেরালেন। বললেন, “তারাপদ, তুমি জগন্নাথের বাবা সম্পর্কে কিছু জানো?”
তারাপদ অবাক হয়ে বলল, “জগুদার বাবা! না, জগুদার বাবা সম্পর্কে কেমন করে জানব! জগুদার বাবা! না, জগুদার মুখে আপনি যা শুনেছেন আমিও তাই শুনেছি। বরং সেদিন আপনার কাছে জগুদা বাবার কথা খানিকটা বলল, আমি অতটাও আগে শুনিনি।”
চন্দন বলল, “যাচ্ছি আমরা প্রেতসিদ্ধকে খুঁজতে, আপনি জগন্নাথের বাবার কথা তুলছেন কেন?”
