“হঁ। তোমার বাবা মোটর সাইকেলের ধাক্কায় ভীষণ জখম হন। মারাও যান। এইখানটায় যে গোলমাল লাগছে, জগন্নাথ। উনি জখম হন, না, ওঁকে জখম করা হয়? একটু তো ভাবতে হয় হে। দু-একটা দিন সময় দরকার। না কি হে চন্দন?”
চন্দন কোনো জবাব দিল না।
.
০৩.
জগন্নাথকে বলেননি কিকিরা, আড়ালে তারাপদকে বলে দিয়েছিলেন।
পরের দিন শনিবার। বিকেল-বিকেলই এল তারাপদ। চন্দনকে সঙ্গে নিয়েই এসেছে।
কিকিরা মোটামুটি তৈরি ছিলেন। বললেন, “আমি রেডি। শুধু তোমাদের জন্যে বসে ছিলাম। একটু টি টেকিং করে চলো বেরিয়ে পড়ি। বগলাকে বলি।”
কিকিরাকে যেতে হল না, তারাপদই হাঁক মেরে বলল, “বগলাদা তিন কাপ চা। শুধু চা। একটু তাড়াতাড়ি।”
চন্দন বলল, “আর্টটা নাগাদ ফিরতে হবে, কিকিরা। আমার একটা জরুরি কাজ আছে।”
কিকিরা বললেন, “আগেই ফিরে আসব।”
“আজ আপনি কী দেখতে যাচ্ছেন?”
“শুদ্ধানন্দজির ঘাঁটি। জায়গাটা একবার নিজের চোখে দেখে নেওয়া উচিত।” বলে উঠে গিয়ে একটা কাগজ তুলে আনলেন টেবিল থেকে। ভাঁজ করা কাগজ। কাগজটা খুলে নিতে নিতে বললেন, “কলকাতার ম্যাপ। বছর বিশ-পঁচিশ আগে ছাপা। রাস্তা থেকে একটা কিনে রেখেছিলুম। এত বড় শহর, কয়েকশো পাড়া, হাজার কয়েক গলি, বাই-গলি, মানে বাই লেন, কে তার হিসেব রাখে গো! আর নামের কত বাহার বাবা! গুমঘর লেন, কর্ক লেন, ঝাঁপতলা বাই লেন…, গুলু ওস্তাগর…নামের ফুলঝুরি। তা এই ম্যাপ থেকে দেখছি–চিতপুর দিয়ে এগোলেই বা ব্র্যান্ড রোড ধরেও আমরা যেতে পারি।”
তারাপদ আর চন্দন ম্যাপ দেখায় গা করল না। ইশারায় বোঝাতে চাইল, ম্যাপের দরকার নেই, জায়গাটা খুঁজে নেওয়া যাবে।
কিকিরা ম্যাপটা ভাঁজ করতে করতে বললেন, “জগন্নাথের খবর কী?”
“নতুন কিছু নয়, তারাপদ বলল।
“কিছু বলছিল?”
“না, ওই বলছিল–কিকিরা কী করেন? ম্যাজিক দেখান? …আমি বললাম,
এখন আর স্টেজে ম্যাজিক দেখান না, রিয়েল লাইফে ম্যাজিক দেখিয়ে বেড়ান।” বলে তারাপদ ঘসতে লাগল।
কিকিরাও হাসলেন।
চন্দন জগন্নাথের চিঠির ব্যাপারে কাল থেকেই খুঁতখুঁত করছিল।বলল, “আমার কিন্তু মনে হচ্ছে, ব্যাপারটা ঠাট্টা-তামাশা। কোনো বন্ধু বান্ধব বা জানাশোনা কেউ জগন্নাথের সঙ্গে মজা করেছে।”
তারাপদ বলল, “তা কেমন করে হবে!” বলে কিকিরার দিকে তাকাল, বলল আবার, “চাঁদু একটা জিনিস বুঝছে না। এটা যদি মজা হত, ঠাট্টা হত–জগুদা কাঁঠালতলার গলিতে গিয়ে ওরকম একটা বাড়ি দেখত না। না হয় বাড়িটাই শুধু দেখত, কলকাতায় পুরনো অলিগলিতে অমন বাড়ি নিশ্চয় অনেক আছে। কিন্তু জগুদা কি প্লাস্টিকের বস্তার মধ্যে একটা মানুষকে পুরে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে তা দেখতে পেত? না কি, ওই যে তিনটে নোক ঢুকছে–তাদের দেখত?…জগুদা মানুষটা ভিতু, গোবেচারা, বোকাসোকা, কিন্তু কিকিরা-স্যার, একটা কথা ঠিক, জগুদা কখনোই মিথ্যে কথা বলবে না এ ব্যাপারে। বলে কী লাভ!”
কিকিরা মাথা নাড়লেন। বললেন, “আমারও সেরকম মনে হয়। জগন্নাথ সাদাসিধে, সরল ছেলে। ওর কথাবার্তা থেকেই সেটা বোঝা যায়। মিথ্যে কথা জগন্নাথ বলেনি। তবে ও যে ঠিক কী দেখেছে, ভুল দেখেছে চোখে, না। সত্যি-সত্যি যা দেখেছে সেটাই বলছে, সে-ব্যাপারে আমার সন্দেহ আছে।”
চন্দন বলল, “কিকিরা, ভয়ের সময় মানুষ অনেক ভুতুড়ে জিনিস দেখে। এটা তার দোষ নয়, আমাদের সকলেরই চোখ মাথা বুদ্ধি ভয়ের সময় স্বাভাবিক। কাজ করতে পারে না। তারাপদকে মর্গের মধ্যে নিয়ে গিয়ে একদিন রেখে দিলেই দেখবেন ওর কী হাল হয়েছে!”
তারাপদ বলল, “চাঁদু, জগুদা ভিতু ঠিকই, কিন্তু সে মিথ্যে কথা বলার লোক নয়।”
চন্দন বলল, “মিথ্যে কথা বলছে জগন্নাথ–তা তো বলিনি। আমি বলছি, চোখে ভুল দেখেছে। একটা সার্বালক মানুষকে ওভাবে মুড়ির ব্যাগে করে ভরে মাথায় চাপিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় না। অসম্ভব।”
কিকিরা বললেন, “স্যান্ডেল উড, তুমি সাবালক মানুষ বলছ কেন?”
চন্দন তাকাল। কিছু বুঝতে পারল না। বলল, “কেন?”
“ধরো ওটা মানুষ নয়, মানুষ-পুতুল। মানে, মানুষের নকল বা ডামি?”
“ডামি?”
“আর ওটা যে ঠিক সাবালকই ছিল, জগন্নাথ এমন কথাও বলেনি।“
চন্দন তাকিয়ে থাকল। কথা বলল না। ডামি? কথাটা যেন সে ভাবছিল অন্যমনস্কভাবে।
কিকিরা বললেন, “কাপড়চোপড়ের দোকানে, বড়-বড় টেলারিং শপে যে ডামি দেখো তার ওজন কত হে? আজকাল তো আবার শুনি প্লাস্টিকের, পেপার পাল্পের ছাঁচ করে মুখ হাত পা তৈরি হচ্ছে। এতে ফিনিশ ভাল হয়। আর ওজন…? হালকা, একেবারেই হালকা…।”
চন্দন আগে কথাটা ভাবেনি, এখন তার মনে হল, সত্যি তো একটা ডামির আর ওজন কত হবে। নিতান্ত ফাঁপা ফাঁকা বস্তু, ওপরের খোলটাই সব। প্লাস্টিকের ব্যাগে করে ও-জিনিস অনায়াসেই বয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। তবে হ্যাঁ, ব্যাগের মধ্যে ধরে এমন ডামি হতে হবে। মুড়ি মাথায় করে যারা ঘুরে বেড়ায়, তাদের প্লাস্টিকের ব্যাগের মাপটা আন্দাজ করলে মনে হয়, সাবালক ছেলেমেয়েকে দাঁড় করানো অবস্থায় তার মধ্যে ঢোকানো মুশকিল। নাবালক বাচ্চাকাচ্চাকে অবশ্য ঢোকানো চলে।
চন্দন এবার একটু লজ্জা পেয়ে বলল, “ডামির কথা আমি ভাবিনি, কিকিরা, সরি। আপনার তো বেশ মাথায় এসেছে।”
তারাপদ হঠাৎ বলল, “স্যার, আমি সেদিন কোথায় যেন একটা ছবি। দেখছিলাম সিনেমার। একটা ডামিকে পাঁচতলার ছাদ থেকে ফেলে দিচ্ছে।”
