কিকিরা বললেন, জগন্নাথকে, “তোমার মা কতদিন হল নেই?”
“মা আজ প্রায় দেড় বছর হল নেই। গত বছরের গোড়ার দিকে মা মারা যান।”
“কী হয়েছিল?”
“বুকে ব্যথা। আমি তখন অফিসে। খবর পেয়ে বাড়ি গিয়ে দেখি, মা নেই। মাকে হাসপাতাল নিয়ে যাবারও সুযোগ হয়নি। আগেই মারা গিয়েছেন।”
“হার্ট অ্যাটাক?”
“হ্যাঁ। মায়ের হার্টের রোগ ছিল। তবে হঠাৎ এমন হবে কেউ ভাবেনি।”
চন্দন বলল, “হার্টের রোগের ব্যাপারটা বড় ট্রেচারাস। কখন কী হয়ে যায় কেউ বলতে পারে না। “
কিকিরা চা শেষ করে চুরুটের খাপটা টেনে নিলেন। মাঝে-মাঝে শখ করে চুরুট খান। বড় চুরুট পছন্দ করেন না। সরু-সরু আঙুলের মতন পাঁচ-দশটা চুরুট তাঁর সব সময়েই মজুত থাকে।
চুরুট ধরিয়ে কিকিরা জগন্নাথকে বললেন, “এবার একটু অন্য কথা বলা যাক। আমার প্রথম কথা হল, ওই প্রেসিদ্ধ শুদ্ধানন্দ কল্পবৃক্ষটির কথা তুমি বিশ্বাস করছ কেন?”
জগন্নাথ মুখ তুলে তাকিয়ে থাকল। জবাব দিতে পারছিল না। শেষে বলল, “পুরো বিশ্বাস করিনি।”
“বিশ্বাস না করলে চিঠিটা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছ কেন?”
জগন্নাথ মাথা চুলকোতে-চুলকোতে বলল, “ঠিক বিশ্ব নয়, তবে এরকম হয় শুনেছি।”
“কী শুনেছ?”
কী শুনেছে জগন্নাথ বলতে যেন লজ্জা পাচ্ছিল। কিংবা সঠিকভাবে জানে না বলে চট করে বলতে পারছিল না। ইতস্তত করে বলল, “আমার এক পিসেমশাই সাহেব কোম্পানিতে হেড ক্যাশিয়ার ছিলেন। একবার ক্যাশ থেকে হাজার চল্লিশ টাকা তছরুপ হয়। পিসেমশাইয়ের হাতে হাতকড়া পড়ার অবস্থা। পিসেমশাই, তো লজ্জায়, অপমানে, ভয়ে আত্মহত্যাই করতে যাচ্ছিলেন। পিসিমাই তাঁকে বাঁচিয়ে দেন। পিসিমা আগেই মারা গিয়েছিলেন। তাঁর আত্মা এসে পিসেমশাইকে বলে দেয়, টাকাটা কে নিয়েছে, নিয়ে কোথায় রেখেছে?”
তারাপদ আর চন্দন হেসে উঠল। কিকিরা হাসলেন না।
তারাপদদের হাসিতে জগন্নাথ ক্ষুণ্ণ হল। বলল, “বিশ্বাস না করলে আমি আর কী করব। তবে এরকম ঘটনা আমি আরও শুনেছি। আমাদের পাড়ার মথুরজেঠা একবার বিশেষ দরকারে বাড়ির সিন্দুক থেকে দরকারি দলিলপত্র বার করেছিলেন। পরে সেই দলিলপত্র হারিয়ে যায়। ওই দলিল শেষ পর্যন্ত পাওয়া গেল মথুরজেঠারই বইয়ের আলমারির নিচের তাকে, পুরনো পাঁজির আড়ালে। জেঠার বাবার আত্মা এসে বলে গিয়েছিল। নয়ত ওই পুরনো দলিল আর সময়মতন খুঁজে পাওয়া যেত না।”
চন্দন এবার পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বার করল। তারাপদকে সিগারেট দিল। বলল, “জগন্নাথবাবু, এসব হল গল্প। আপনি এগুলো বিশ্বাস করেন?”
জগন্নাথ বলল, “বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না, তবু মনে হয়, হতেও তো পারে। কোনটা সত্যি কোনটা মিথ্যে কেমন করে বলব! এই তো সেদিন কাগজে পড়ছিলাম, একজন নামকরা বিজ্ঞানী যাচ্ছিলেন বিদেশে, এক সেমিনারে। সকালে তাঁর প্লেন। রাত্রে ঘুমের মধ্যে মাকে স্বপ্ন দেখলেন। মা বারণ করলেন ওই প্লেনে যেতে। ভদ্রলোকের মন খুঁতখুঁত করতে লাগল। তিনি শেষ পর্যন্ত সকালের প্লেনে গেলেন না। দুপুরে দিল্লির প্লেন ধরলেন। সকালের প্লেনটায় অদ্ভুতভাবে অ্যাকসিডেন্ট হল। মারা গেল কত প্যাসেঞ্জার। এ-সব কেন হয় কে জানে! হয়।”
তারাপদ সিগারেট ধরিয়ে বলল, “কাকতালীয় ব্যাপার…!”
কিকিরা কিছুক্ষণ কথা বলেননি। এবার বললেন, জগন্নাথকে, “হয় কি হয় না সেটা পরের কথা। তার আগে তুমি আমায় বলল তো, বোনের বিয়ে নিয়ে তুমি খুব চিন্তায় আছ, তাই না?”
জগন্নাথ মাথা হেলিয়ে বলল, “হ্যাঁ। মা বেঁচে থাকতে কত খোঁজখবর করতেন। মা তো মারা গেলেন। আমার আর কেউ নেই, এই বোনটি ছাড়া। ওর জন্য আমি সারাদিন ভাবি। ওর বিয়ে হয়ে গেলে আমার দায়িত্ব চুকবে।”
কিকিরা বললেন, “বিয়ের কি সব ঠিকঠাক হয়েছে!”
“আজ্ঞে না। কথাবার্তা এক-একবার হয়। আর এগোয় না। আমরা গরিব মানুষ। বাবা মারা যাবার পর মা আমাদের বড় কষ্ট করে মানুষ করেছিলেন। মা আর নেই। আমি যে কেমন করে ঝুমুর বিয়ে দেব কে জানে?”
কিছুক্ষণ আর কথা বলল না কেউ।
শেষে কিকিরা বললেন, “জগন্নাথ, একটা কথা বলো তো? তোমার একথা কেন মনে হচ্ছে যে, তোমার মা তোমার বোনের বিয়ে-থার জন্য কিংবা তোমাদের আপদ-বিপদের জন্য কম হোক, বেশি হোক–কিছু সোনাদানা, টাকা কোথাও লুকিয়ে রেখে গিয়েছেন।”
জগন্নাথ বোকার মতন তাকিয়ে থাকল। কী বলবে বুঝতে পারছিল না। পরে বলল, “আমার মনে হত না। ওই চিঠিটা পেয়ে আমি প্রথমে বিশ্বাসও করিনি। ভেবেছিলাম, কোনো বাজে লোক আমার সঙ্গে তামাশা করেছে। ওটা উড়ো চিঠি। পরে পাঁচরকম ভাবতে-ভাবতে আমার মনে হল, মা মাঝে-মাঝে বলতেন, ঝুমুর বিয়ের জন্যে ভাবতে হবে না, একটা ব্যবস্থা মা করে রেখেছেন। কী ব্যবস্থা, মা অবশ্য বলতেন না। কথাটা মনে হবার পর আমার কেমন…।” কথাটা আর শেষ করল না জগন্নাথ।
কিকিরা ঘাড় নাড়তে-নাড়তে বললেন, “বুঝেছি। তোমার মনে হচ্ছে হয়ত মা কোথাও কিছু রেখে গেছেন লুকিয়ে।”
“আজ্ঞে হ্যাঁ।”
কিকিরা তাঁর মাথার লম্বা-লম্বা চুল ঘাঁটতে-ঘাঁটতে আচমকা বললেন, “জগন্নাথ, তোমার বাবা না জুয়েলার ছিলেন? দামি পাথর-টাথর পরখ করতে পারতেন?”।
“হ্যাঁ। বাবার খুব নামডাক ছিল। বাবা পাথর যাচাইয়ে এক্সপার্ট ছিলেন। দামটামও ঠিক করতে পারতেন। হীরের ব্যাপারে বাবার চেয়ে বড় আর কেউ ছিল না।”
