কিকিরা বললেন, “কতক্ষণ ছিলে তুমি?”
“বড়জোর আধ ঘণ্টা।”
“আর কিছু দেখোনি?”।
“আজ্ঞে, আর-একটা জিনিস দেখেছি। একটা লোক বড় প্লাস্টিকের বস্তার মধ্যে কাকে যেন পুরে কাঁধে করে বাড়ির মধ্যে ঢুকে গেল।”
চন্দন আর তারাপদ চোখ চাওয়াচাওয়ি করল। কিকিরাও যেন অবাক হলেন।
তারাপদ কিকিরাকে বলল, “জগুদা আমাকে বলেছে, স্যার। আমার মনে হয়, জগুদা ভুল দেখেছে। আজকাল কত তাড়াতাড়ি অন্ধকার হয়ে যায়, আপনি দেখেছেন! জগুদা বলছে, বাড়িটার কাছাকাছি কোনো আলোও জ্বলছিল না। ব্যাপারটা চোখের ভুল।”
কথার মধ্যে বাধা দিয়ে জগন্নাথ বলল, “চোখের ভুল নয়। আমি দেখেছি। অন্ধকার হয়ে এলেও এখন শুক্লপক্ষ। চাঁদের আলো ছিল। গতকাল পূর্ণিমা গিয়েছে।”
কিকিরা বললেন, “প্লাস্টিকের ব্যাগে লোক ঢোকে কেমন করে?”
জগন্নাথ বলল, “বড় ব্যাগ। মুড়ি-অলারা যেমন প্লাস্টিকের ব্যাগ মাথায় নিয়ে মুড়ি বিক্রি করতে যায়, সেইরকম।“
“ব্যাগের মধ্যে মানুষ ছিল তুমি বুঝলে কেমন করে?”
“দেখলাম।”
“ভুল দেখোনি?”
“কী জানি, আমার চোখে তো মানুষই মনে হল।”
চন্দন এতক্ষণ চুপচাপ ছিল, এবারে বলল, “একজন মানুষের ওজন কত হতে পারে? রোগাসোগা হলেও মিনিমাম চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ কেজির মতন। সাবালকের কথা বলছি। বাচ্চা-কাচ্চা হলে অন্য কথা। একজন সাবালক, মানুষকে কাঁধে করে বয়ে নিয়ে যাওয়া সোজা কথা?”
জগন্নাথ বলল, “বাঃ, ঘাড়ে-পিঠে করে আমরা মানুষ বই না! আগের দিনে কলকাতার বাবুরা ঝাঁকামুটের মাথায় চেপে অফিস-কাছারি যেত।”
চন্দন হেসে ফেলে বলল, “সেই মুটে, সেই বাবু এখন আর নেই। জগন্নাথবাবু! অবশ্য হ্যাঁ, ঘাড়ে-পিঠে আমরা মানুষ বই বইকি এখনও। তবে তার প্রসেস আলাদা।”
কিকিরা বললেন, “তুমি কি ঠিকই দেখেছ, জগন্নাথ?”
“আমার তাই মনে হয়।”
কিকিরা কথা ঘুরিয়ে নিলেন। বললেন, “তুমি তারপরই চলে এসেছ।
“হ্যাঁ। আমার এমনিতেই ভয় করছিল। তার ওপর লোকজন ঢুকছে, প্লাস্টিকের ব্যাগে-ভরা মানুষ, এইসব দেখে আমি পালিয়ে এলাম”।
তারাপদ বলল, “কিকিরা-স্যার, জগুদা এমনিতেই ভিতু মানুষ, নার্ভাস, নিরীহ। জগুদা যে কেমন করে ওখানে গিয়েছিল, কোন সাহসে, তাই আমি বুঝতে পারছি না। না।”
জগন্নাথ কোনো জবাব দিল না।
এমন সময় চা নিয়ে এল বগলা। গোল বড় ট্রে করে চা এনেছে। চায়ের সঙ্গে ডালপুরি, আলুর দম; একটা করে ডবল শোনপাপড়ি।
কিকিরা বললেন, “নাও হে তোমরা, হাত লাগাও। এ ডালপুরি হাউস মেড নয়, গণেশের দোকানের। ভালই করে। খাও।”
নিজে কিকিরা কিছু নিলেন না, শুধু চায়ের কাপটি তুলে নিলেন।
চন্দন খাবারের দিকে হাত বাড়াল। বলল, “গরম আছে রে তারাপদ, নিয়ে নে। আপনিও নিন জগন্নাথবাবু।“
ওরা খাওয়া শুরু করল।
কিকিরা জগন্নাথকে লক্ষ করতে লাগলেন। আধময়লা রং জগন্নাথের। মাথায় মাঝারি। সামান্য গোলগাল চেহারা। মাথায় চুল কম। মুখটি দেখলেই বোঝা যায়, ছেলেটি নিরীহ ধরনের, গোল-গোল চোখ, মোটা নাক, ছোট কপাল। কত আর বয়েস হবে। বড়জোর ঊনত্রিশ-ত্রিশ।
কিকিরা জগন্নাথকে বললেন, “এবার একটা কথা বলো তো?”
তাকিয়ে থাকল জগন্নাথ।
“তুমি যে ওই প্রেতসিদ্ধ কল্পবৃক্ষটির কাছে গিয়েছিলে, কেন গিয়েছিলে?”
জগন্নাথ চুপ। যেন তার মুখে কোনো জবাব জুটছে না। ইতস্তত করতে লাগল। চোখ নিচু করল।
কিকিরা নিজেই বললেন, “তুমি ওই প্রেতসিদ্ধর চিঠির কথা বিশ্বাস করো?”
জগন্নাথ চোখ তুলে তারাপদর দিকে তাকাল, চন্দনকেও দেখল। কী বলবে বুঝতে পারছিল না। বোধ হয় তার সঙ্কোচও হচ্ছিল। শেষে ভাঙা-ভাঙা ভাবে সামান্য আড়ষ্ট হয়ে বলল, “দেখতে গিয়েছিলাম।”
“কেন?”
“মনে হল…”
“তোমার মনে হল, ওই লোকটার কথা যদি সত্যি হয়। তাই না?”
জগন্নাথ আবার চোখ নিচু করল। অল্প সময় চুপ করে থেকে বলল, “আজ্ঞে হ্যাঁ। ..আপনি আমাদের বাড়ির কথা কিছু জানেন না। আমার বাবা একজন জুয়েলার ছিলেন। অবস্থা পড়ে যাবার পর তিনি নিজে আর তেমন ব্যবসাপত্র করতে পারতেন না। কলকাতার কয়েকটা বড়-বড় জুয়েলারের দোকানে আসা-যাওয়া করতেন। তাদের পাথর-টাথর পরখ করে দিতেন। নিজে কোনো অডার পেলে দোকান থেকে কিনিয়ে দিতেন। তাঁর একটা কমিশন থাকত।” কথা বলতে বলতে হঠাৎ চুপ করে গেল জগন্নাথ। যেন বাবার কথা ভাবছিল। খানিকটা উদাস বিষণ্ণ হয়ে থাকল অল্পক্ষণ। পরে আবার বলল, “আমার বাবা অদ্ভুতভাবে মারা যান। একদিন বর্ষার সময় রাত করে বাড়ি ফিরছিলেন। বাড়ির কাছাকাছি যখন, তখন একটা মোটর সাইকেল এসে তাঁকে ধাক্কা মারে। বাবা হুমড়ি খেয়ে পড়ে যান রাস্তায়। তাঁর কোমরের কাছে লেগেছিল। বাবাকে রাস্তায় পড়ে যেতে দেখে দুজন পাড়ার রিকশঅলা হইচই করে ওঠে। মোটর সাইকেলঅলা পালিয়ে যায়। বাবাকে ওরা বাড়ি পৌঁছে দেয়। কিন্তু বাবার কোথায় যে লেগেছিল কে জানে, দিন-তিনেকের মাথায় হাসপাতালে মারা যান। বাবা কম বয়েসেই মারা গেলেন।”
কিকিরা জগন্নাথের বিষণ্ণ মুখের দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকলেন, তারপর নরম গলায় বললেন, “কী আর করবে! তোমার ভাগ্য! ওই তারাপদরও তো একই অবস্থা। ওকেও মা বাবা হারাতে হয়েছে কম বয়েসেই।”
তারাপদ বলল, “আমি জগুদাকে বলেছি সব। ও-নিয়ে আর দুঃখ করে লাভ নেই। আমাদের মতন আরও কত ছেলেমেয়ে আছে!”
