.
০২.
দিন তিনেক আর দেখা নেই তারাপদর।
চারদিনের দিন সন্ধের মুখে তারাপদ হাজির, সঙ্গে চন্দন আর নতুন একটি ছেলে। পরিচয় করিয়ে দেবার আগেই কিকিরা বুঝে নিলেন, ছেলেটি জগন্নাথ।
ঘরে পা দিয়েই তারাপদ বলল, “কিকিরা-স্যার, আপনার স্যান্ডেল উডকে ধরে এনেছি। আর এই আমাদের জগুদা।”
কিকিরা হাসিমুখে বললেন, “এসো। বোসো হে জগন্নাথবাবু, বোসো।” বলে চন্দনের দিকে তাকালেন। “কিসের এমন ডিউটি তোমার স্যান্ডেল উড? আজ মাসখানেক বেপাত্তা হয়ে রয়েছ?”
চন্দন বলল, “বলবেন না, হাসপাতালে গণ্ডগোল, অর্ধেক লোক ছুটিতে। খেটে-খেটে মরছি। তার ওপর শুনছি, জানুয়ারিতে নাকি আমাকে বাইরে ট্রান্সফার করে দেবে। কোথায় দেবে কে জানে! অজ গাঁ-গ্রামে ঠেলে দেবে! আমার মন-মেজাজ বড় খারাপ, কিকিরা!”
কিকিরা বললেন, “জানুয়ারি! তার এখন মাস-দুই দেরি। এখন থেকে মেজাজ খারাপ করছ কেন! এখন সবেই নভেম্বরের গোড়া!”
চন্দন বলল, “আপনার আর কী? ভিলেজ ডাক্তারির ঝক্কি তো জানেন না। হাসপাতালের দরজায় বড়ি ফেলে দিয়ে পালায়। ডেঞ্জারাস?”
তারাপদ রগড় করে বলল, “তোর বডিও একদিন ফেলে দেবে, চাঁদু তুই বরং চাকরি ছেড়ে দে, দিয়ে নফর কুণ্ডু লেনে পি. পি. শুরু কর।
কিকিরা বললেন, “পি. পি-টা কী?”
“প্রাইভেট প্র্যাকটিস” বলে হাসতে লাগল তারাপদ। হাসতে হাসতে বলল, “খুব কম খরচে বসে যেতে পারবি। একটা টেবিল, দু-তিনটে চেয়ার, বেঞ্চি একটা। ব্যস! আর তোর লাগবে নাম-ছাপানো প্যাড। একটা স্টেথো। সেটা তোর আছে। কত কম খরচে ব্যবসা বল!”
কিকিরা, চন্দন, দুজনেই হেসে উঠলেন।
জগন্নাথ হাসল না। সে একে নতুন লোক, তায় কিকিরার চেহারা, পোশাক, এই অদ্ভুত ঘরটি দেখে কেমন যেন হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল। তারাপদ তাকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে কোথায় ধরে এনেছে? কিকিরাকে দেখলে তো সাকাসের জীব মনে হয়। আর এই ঘরটা যেন চিতপুরের থিয়েটারের সাজ-ভাড়া দেওয়া কোনো দোকান-টোকান।
জগন্নাথ রীতিমত হতাশ হয়ে পড়ছিল। তারাপদ অবশ্য আগেই বলে দিয়েছিল, “জগুদা, তোমাকে যেখানে নিয়ে যাচ্ছি সেখানে গিয়ে ভড়কে যাবে না, আমাদের কিকিরা রহস্যময় পুরুষ, মিস্টিরিয়াস ক্যারেকটার কিকিরা দি গ্রেট, কিকিরা দি ওয়ান্ডার। ওঁর বাইরের স্টাইল দেখে ভেতরের ব্যাপার বুঝবে না। বাইরে উনি সাকাসের ক্লাউন, ভেতরে হুডিনি। ম্যাজিশিয়ান হুডিনি নাম শুনেছ তো? কিকিরা হলেন হুডিনি প্লাস শার্লক হোমস।”
জগন্নাথের মনে হল, তারাপদ বাজে কথা বলেছে। কিকিরার ওপর ভরসা করা মানে পুরোপুরি ডুবে যাওয়া।
তারাপদ জগন্নাথের মুখ দেখে বুঝতে পারছিল জগুদা বেশ হতাশ। কিকিরার দিকে তাকাল সে। বলল, “কিকিরা-স্যার, জগুদার সঙ্গে আপনি কথা বলুন। জগুদা ভাবছে, এ-কোথায় তাকে নিয়ে এলুম! ঘাবড়ে গিয়েছে বেচারি।”
কিকিরা জগন্নাথের দিকে তাকালেন, বললেন, “আগে কথা, না, চা?”
“চা আসছে। বগলাদাকে বলে এসেছি।”
কিকিরা বললেন, “ভাল করেছ। তা জগন্নাথবাবু, আপনি কি প্রেসিদ্ধ কল্পবৃক্ষর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এসেছেন?” মজার ঢঙেই বললেন কিকিরা।
জগন্নাথ থতমত খেয়ে গেল। কিকিরার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকল, কথা বলতে পারল না।
তারাপদ অবাক হয়ে বলল, “কিকিরা, হাউ স্ট্রেঞ্জ! আপনি কেমন করে জানলেন?”
কিকিরা হেসে বললেন, “ভৌতিক উপায়ে। আমি স্পিরিট ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম। দু’দিন চেষ্টা করে লাইন পেলাম। কলকাতার টেলিফোনের মতন ওদের লাইনেও গোলমাল, জট পাকিয়ে আছে। আমাদের যেমন বর্ষা ওদের তেমন শীত–বেশি কুয়াশা হলেই লাইন নষ্ট বারবার রং নাম্বার।” বলে কিকিরা হাসতে লাগলেন।
তারাপদরা হেসে ফেলল।
শেষে তারাপদ বলল, “আপনি ঠিকই ধরেছেন। জগুদা শুদ্ধানন্দ প্রেতসিদ্ধর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল।”
“কবে?”
তারাপদ জগন্নাথের দিকে তাকাল। মানে সে জগুদাকেই জবাবটা দিতে বলল।
জগন্নাথ খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে নিচু গলায় বলল, “গত পরশু।”
“দেখা হল প্রেতসিদ্ধর সঙ্গে?”
“আমি বাড়িটার মধ্যে ঢুকিনি। ঢুকতে ভয় হল। বাইরে থেকে দেখে এলাম।”
“বাইরে থেকে! কী দেখলে?”
“গলির নাম কাঁঠালতলা নয়। লোকে বলে, কাঁঠালতলা। গলির মুখে বিরাট এক কাঁঠালগাছ। কত কালের গাছ কে জানে! সরু গলি, বাই লেনের মতন। ইট বাঁধানো গলির একদিকে কোনো বড় গুদোম-টুদোম হবে, কিসের জানি না, পাঁচিল তোলা রয়েছে। মাথায় পুরনো টিনের ছাউনি। লঙ্কার ঝাঁঝ নাকে আসছিল। বোধ হয় মশলাপাতি থাকে ওখানে। মশলা-গুদোম। বাঁ দিকে গুদোম, ডান দিকে ভাঙাচোরা কয়েকটা বাড়ি। অনেক পুরনো। ওখানে কারা থাকে জানি না, জনকতক মুটে-মজুর, ঠেলাওয়ালা দেখলাম। গলির শেষে একটা পোড়ো বাগানবাড়ির মতন বাড়ি। সামনের দিকে ঝোঁপঝাড়, আগাছা। ভেতরে এক বাড়ি। কম সে কম শ’ সোওয়া-শো বছরের হবে।”
কিকিরা বললেন, “তুমি বাড়ির কাছে গিয়েছিলে?”
মাথা নেড়ে জগন্নাথ বলল, “খুব কাছে যাইনি। যেতে ভয় করছিল।”
“ভয় ছিল! কিছু দেখলে ওখানে?”
“আজ্ঞে দেখেছি।”
“কী দেখলে?”
“দু-তিনজনকে দেখলাম, বাড়িটার মধ্যে ঢুকছে।”
“একসঙ্গে?”
“প্রথমে ঢুকল দু’জন। খানিকটা পরে একজন।”
“সাজপোশাক কেমন, বয়েস কত হবে আন্দাজে, বাঙালি না অন্য কিছু?”
জগন্নাথ বলল, “তিনজনেই বাঙালি বলে মনে হল না। অবাঙালিও রয়েছে। বয়েস কম নয়। আমার চেয়ে বড়। একজনের তো মাথার চুলই সাদা-সাদা লাগল। সন্ধে হয়ে গিয়েছিল, জ্যোৎস্নাও ফুটেছিল। তবু আমি ভাল করে দেখতে পাইনি। আমার ভয়ও করছিল। আমি যেখানে লুকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম, সেখানটায় বোধ হয় আগে দরোয়ানের ঘর ছিল। এখন সব ভাঙাচোরা, চারদিকে কুলঝোঁপ!”
