কিকিরা চা খেতে-খেতে বললেন, “তোমার অফিসের বন্ধুর নাম যেন কী বললে?”
“জগন্নাথ দত্ত। আমরা জগুদা বলি।”
“মা নেই?”
“না, মা মারা গিয়েছেন বছরখানেকের ওপর। বাবা অনেক আগেই।”
“বোন আছে?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ। একটি মাত্র বোন। জগুদার নিজের কোনো ভাই নেই। বোনই সব।”
“বোনের বিয়ে?”
“কথাবার্তা হয় মাঝে-মাঝে, এগোতে পারে না। বিয়ে দেবার ক্ষমতা জগুদার নেই। যা মাইনে পায় দুই ভাই-বোনের চলে যায় কোনোরকমে। আমারই মতন অবস্থা, কিকিরা। আমি তবু ঝাড়া হাত-পা। একা মানুষ।”
কিকিরা হাত বাড়িয়ে চিঠিটা রেখে দিলেন, দিয়ে চুরুটের খাপ টেনে নিলেন।“কী তুমি বলছিলে তখন? সাত শরিকের বাড়ি…?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ। কলকাতার সেকেলে বনেদি পরিবার একটা বাড়ি আছে তিন-চার পুরুষের। সে বাড়ির চেহারা দেখলে মনে হবে, মাথার ওপর বাড়ি পড়ো-পড়ো।”
কথাটা আর তারাপদকে শেষ করতে দিলেন না। কিকিরা বললেন, “বুঝেছি। ইট বার করা, ভাঙা, অশ্বত্থ গাছের ডালপালা গজিয়েছে ভাঙা, ফাটা দেওয়ালে। গঙ্গাজলের, ফাটাফুটো ট্যাংক, গিরগিটি, টিকটিকির আড়ত…এই তো।”
“ইয়েস স্যার।”
“কজন শরিক?”
“মুখে বলি সাত শরিক। তা জগুদা বলে চার শরিক।”
“শরিকরা তোমার জগুদারই আত্মীয় তো?”
“হ্যাঁ, খুড়তুতোর খুড়তুতো, জেঠতুতোর জেঠতুতে। ভেরি কমপ্লিকেটেড স্যার।“
“জগন্নাথের সঙ্গে সম্পর্ক নিশ্চয় ভাল নয়।”
“কেমন করে হবে। যে যার নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। অভাবী সকলেই। তাদেরও ঘাড়ে বড় বড় সংসার। ওর মধ্যে দু-একজন ধড়িবাজও আছে।”
“বুঝেছি।”
কিছুক্ষণ চুপচাপ। কিাি একটা চুরুট ধরালেন। আঙুলের মতন সরু, লম্বায় ছোট।
তারাপদ বলল, “ব্যাপারটা পুরো চিটিংবাজি। নয় কি?”
“তা আর বলতে। তবে দেখতে হবে প্রেতসিদ্ধ কল্পবৃক্ষ শুদ্ধানন্দটি কে? কী তার মতলব? কে তাকে বলেছে জগন্নাথের মা মারা যাবার আগে বেশ কিছু গয়নাগাটি ধনরত্ন লুকিয়ে রেখে গিয়েছেন?”
“আমিও তাই বলি। এমন কে আছে যে এই কাজ করবে? কেনই-বা করবে? কিসের স্বার্থ তার? নাকি জগুদার সঙ্গে কেউ তামাশা করছে?”
কিকিরা চোখ বুজে কিছুক্ষণ চুরুট ফুকলেন। তারপর বললেন, “তোমার জগুদা কী বলছে? তামাশা?”
তারাপদ মাথা নাড়ল। বলল, “জগুদা ভীষণ ভাল, নিরীহ। ভিতু। যে যা বলে জগুদা বিশ্বাসও করে নেয়। আমি কথা বলেছি জগুদার সঙ্গে। দেখলাম মায়ের কথাটা সে বিশ্বাস করে নিয়েছে।”
কিকিরা বললেন, “কোন কথাটা? মায়ের সঙ্গে শুদ্ধানন্দর দেখা হওয়া, না গয়নাগাটি লুকিয়ে রাখা?”
“দুটোই। বলে তারাপদ চায়ের কাপ সরিয়ে রাখল। ঢেকুর তুলল বড় করে। বলল, “জগুদা খুবই মাতৃভক্ত। বাবা মারা গিয়েছেন বছর আট-নয় আগে। তখন জগুদার বয়েস কম। মাথার ওপর মা ছাড়া আর কেউ ছিলেন না। বোনও ছোট। কত কষ্ট সহ্য করে মা তাদের মানুষ করেছেন। জগুদা বলে, মা না থাকলে ওরা ভেসে যেত। শক্ত হাতে মা হাল ধরেছিলেন বলে ওরা বেঁচে গিয়েছে।”
কিকিরা অন্যমনস্কভাবে বললেন, “বেশ তা না হয় হল। কিন্তু মা যে যথেষ্ট সোনাদানা লুকিয়ে রেখে গিয়েছেন এ কথা কেমন করে বিশ্বাস করছে তোমার জগুদা?”
তারাপদ বলল, “আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম। জগুদা বলল, ব্যাপারটা অসম্ভব নয়। মা ছিলেন হিসেবি, বুদ্ধিমতী, বিচক্ষণ। ভবিষ্যতের কথা সব সময় ভাবতেন। বিশেষ করে বোনের কথা। তা ছাড়া সেকালের বনেদি বাড়ির বউ, জগুদার দাদামশাই-দিদিমাও একসময়ের পয়সাঅলা লোক। নিজের মায়ের কাছ থেকে জগুদার মা নিশ্চয় অনেক কিছু পেয়েছিলেন। জগুদারা ছেলেবেলায় মায়ের গয়নাগাটি দেখেছে।”
“না হয় দেখল। কিন্তু তারাপদ, জগুদার মা সব সোনাদানা লুকিয়ে রাখবেন কেন?”
তারাপদ বলল, “বাড়ির অন্যদের ভয়ে। জগুদার যেসব জ্ঞাতিরা ও বাড়িতে থাকে তাদের দু-একজন পয়লা নম্বরের শয়তান। চোর, গুণ্ডা, বদমাশ। ওদের ভয়েই মা সোনাদানা লুকোতে পারেন।”
কিকিরাও চা শেষ করে চায়ের কাপ সরিয়ে রাখলেন। নিজের মনেই কিছু ভাবছিলেন। ঘর বেশ অন্ধকার হয়ে এসেছে। শীত এখনও পড়েনি। তবে এই সন্ধের মুখে গা শিরশির ভাব হয়। উঠলেন কিকিরা। বাতি জ্বালিয়ে দিলেন ঘরের।
“তা হলে?” কিকিরা বললেন হঠাৎ।
তারাপদ বলল, “আপনি বলুন?”
“তুমি বলছ, এই প্রেতসিদ্ধ শুদ্ধানন্দ মহারাজকে একবার দেখা দরকার। তাই না?”
“রাইট স্যার।”
“তোমার জগুদা কি মহারাজের কাছে গিয়েছে?”
“না। তার যাবার ইচ্ছে। ভয়ে যেতে পারছে না।”
“চিঠিটা কতদিন হল পেয়েছে ও?”
“দিন পাঁচেক।”
“কাকে কাকে দেখিয়েছে?”
“আমাকে আর ঘোষালদাকে।“
“ঘোষালদা লোকটি কে?”
“আমাদের সিনিয়ার। জগুদার খুব বন্ধু।”
“চিঠি দেখে কী বলল, ঘোষাল?”
“বলল, বাজে ব্যাপার, ফালতু। জগুদার সঙ্গে কেউ মজা করেছে। ভিতু মানুষ জগুদা, ভয় দেখিয়ে তামাশা করেছে।”
কিকিরা নিজের জায়গায় এসে বসলেন। মাথার চুল ঘাঁটলেন। বললেন, “তা তোমার জগুদাকে নিয়ে এলে না কেন?”
“আনতাম। ভাবলাম আপনাকে না বলে আনা কি ভাল হবে। তা ছাড়া জগুদাকৈ বুঝিয়ে-সুঝিয়ে আনতে হবে। বললেই যে জগুদা আসবে মনে হয় না। ধরে আনতে হবে।”
কিকিরা বললেন, “তবে তাই নিয়ে এসো। কথা বলে দেখি। ভাল কথা, চন্দনকে কিছু বলেছ?”
“না। সময় পেলাম না। কাল-পরশু বলব।”
“ঠিক আছে।…আপাতত তুমি তোমার জগুদাকে ম্যানেজ করো। করে এখানে নিয়ে এসো। দেখি, কথা বলে দেখি। তারপর কিছু একটা করা যাবে।”
