তারাপদর কথা মতনই বগলা লুচি-বেগুনভাজা নিয়ে এসেছে। অবশ্য কিকিরা খানিকটা আগেই সেটা ধরতে পেরেছেন। বগলাকে বার্মিজ ওমলেট বানাবার পরামর্শ দিতে গিয়ে দেখেন, সে লুচির ময়দা মেখে নিয়েছে।
বগলার সঙ্গে, তারাপদর চোখাচোখি হল। মুখ টিপে হাসল বগলা। তারাপদ একবার কিকিরার দিকে চোরের মতন তাকিয়ে অপরাধীর ভঙ্গিতে হাসল একটু।
খাওয়া শুরু করার আগেই তারাপদ একটা ইনল্যান্ড লেটার কার্ড এগিয়ে দিল কিকিরাকে।
কিকিরা বললেন, “কী আছে এতে?”
“পড়ে দেখুন।”
“পড়ছি। আগে মুখে শুনি।”
তারাপদ লুচি মুখে দিল। চিবোতে চিবোতে বলল, “ক্লীং রিং হিং…”
ইনল্যান্ড চিঠিটা দেখতে দেখতে কিকিরা বললেন, “মানে?” বলে চোখ তুলে তারাপদর দিকে তাকালেন, “হিং টিং ছট?”
তারাপদ বলল, “আপনি চিঠিটা মন দিয়ে পড়ুন–আমি ততক্ষণে একটু ইট করে নিই, ভেরি হাংগরি, স্যার।”
কিকিরা চিঠি পড়তে লাগলেন।
তারাপদর সত্যিই খিদে পেয়েছিল খুব। খেতে-খেতে কিকিরার চোখ-মুখ দেখছিল। কিকিরা চিঠি পড়তে পড়তে এতই অবাক হচ্ছিলেন যে, তাঁর চোখের পলক পড়ছিল না, মুখ হাঁ হয়ে যাচ্ছিল।
বার-দুই চিঠিটা পড়ে কিকিরা তারাপদর দিকে তাকালেন। “কী ব্যাপার হে! এই শুদ্ধানন্দ প্রেসিদ্ধ কল্পবৃক্ষঃ-টি কে?” কল্পবৃক্ষঃ-এর বিসর্গটি বেশ জোরের সঙ্গে মজার গলায় উচ্চারণ করলেন। তারপর ঠাট্টা করে বললেন, “এ যে তোমার স্যাংসক্রিট ট্রি।”
খানিকটা খাওয়ার পর তারাপদর আর তাড়া ছিল না। জলও খেয়েছে আধগ্লাস মতন। কিকিরার কথায় হেসে ফেলল। তারপর ধীরেসুস্থে খেতে লাগল। বলল, “কে আমি কেমন করে জানব স্যার। উনি নিজেই বলেছেন প্রেতসিদ্ধ এবং কল্পবৃক্ষঃ।”
কিকিরা বললেন, “তা তো দেখছি। উনি আবার বিশুদ্ধ প্রেসিদ্ধ। মানে দাগমারা খাঁটি প্রেত-সিদ্ধপুরুষ। ভেজাল নয়। এরকম মহাত্মা ব্যক্তি তো আগে আমি দেখিনি, তারাপদ।…ক্লীং রিং হিং…বাঃ, এ যেন ভূতের হাতে বেল রিংগিং…ছন্দ আছে হে, বাজছে ভাল…ক্লীং রিং হিং…।”
তারাপদ বলল, “চিঠিটা স্যার আমি জগুদার কাছ থেকে কেড়েকুড়ে নিয়ে এলাম। বললাম, আমাকে দাও, আমি একজনকে জানি, যিনি ভূত-প্রেতের ব্যাপারে মাস্টার। এ টু জেড পর্যন্ত জানেন ভূতপ্রেতদের। ওঁর কাছে ভূতপ্রেতদের ডিরেক্টরি আছে–খুঁজে বার করে নেবেন নামধাম…” বলে তারাপদ হাসতে লাগল, “ঠিক বলিনি স্যার?”
কিকিরা বললেন, “দাঁড়াও, আরও একবার পড়ি চিঠিটা। তুমিও শোনো।”
কিকিরা চিঠি পড়তে শুরু করলেন
“ক্লীং রিং হিং
কাঁঠালতলা গলি
টেগোর ক্যাসেল স্ট্রিট (উঃ)
কলিকাতা
২৯ অগ্রহায়ণ ১৩৯৫
মহাশয়,
আমাদের পরমারাধ্য গুরু প্রেতসিদ্ধ কল্পবৃক্ষঃ শুদ্ধানন্দজির আশীর্বাদ জানিবেন। তাঁহার নির্দেশ অনুযায়ী এই পত্র লিখিতেছি।
গত ২০ অগ্রহায়ণ রাত্রিকালে গুরু শ্ৰদ্ধানন্দজি যখন সূক্ষ্ম শরীরে আত্মালোকে বিচরণ করিতেছিলেন তখন আপনার পরমারাধ্যা পরলোকবাসী মাতৃদেবী সুরমা দেবীর সহিত তাঁহার সাক্ষাৎ ও কথোপকথন হয়। আপনার দুর্দশা বিষয়ে মাতৃদেবী সবিশেষ অবগত আছেন। তাঁহার ব্যাকুলতারও অবধি নাই। আপনি যে আর্থিক ও মানসিক কষ্ট ভোগ করিতেছেন তাহাতে তিনি অতীব কাতর। আপনার ভগ্নির বিবাহ অবশ্যই হইবে, অর্থ ও অলঙ্কারের জন্য আটকাইবে না। আপনার মাতৃদেবী তাঁহার ও উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত অলঙ্কারগুলি গোপনে এমন স্থানে গচ্ছিত রাখিয়াছেন, যাহা আপনারা কেহই জানেন না। আকস্মিক মৃত্যু হেতু তিনিও আপনাকে কিছু জানাইয়া যাইতে পারেন নাই। এক্ষণে জানাইতে চান। প্রত্যক্ষভাবে আপনাকে জানানো সম্ভব নয়, যেহেতু তিনি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম রূপে আত্মালোকে বিচরণ করিতেছেন, আর আপনি মর্ত্যলোকে। যাহাই হউক, প্রেতসিদ্ধ শুদ্ধানন্দজি মারফত নিজ পুত্রকন্যার সুখ শান্তির জন্য তিনি গোপন বিষয়টি জানাইতে ইচ্ছুক। তিনি যে কী পরিমাণ ধনরত্ন রাখিয়াছেন আপনি জানেন না। এ-বিষয়ে আপনি যত শীঘ্র সব শুদ্ধানন্দজির সহিত সাক্ষাৎ ও যোগাযোগ করুন।
আমাদের পরমারাধ্য গুরু শুদ্ধানন্দজি একাদশ তন্ত্রমন্ত্র সাধনায় সিদ্ধ। মাত্র চতুর্দশ বৎসর বয়েসে গৃহত্যাগ করিয়া ইষ্ট গুরু অন্বেষণ করিয়াছেন। পাহাড়-পর্বত, নদী-সমুদ্র, জনপদ-শ্মশান–এই দেশের কোথায় না ভ্রমণ করিয়াছেন, কত মহাসাধন্দ্রে সংস্পর্শেই না আসিয়াছেন। দুঃখীর দুঃখ মোচন, দুর্গতজনের দুর্গতি দূর করাই তাঁহার একমাত্র ব্রত।
আপনি অবিলম্বে শুদ্ধানন্দজির সহিত সাক্ষাৎ করুন। উদ্বেগ দুশ্চিন্তা দূর হইবে। আসিবার পূর্বে পত্র দিবেন।
গুরুজির আশীবাদ লইবেন। ইতি
নিবেদক, কৃষ্ণমূর্তি।
পুনশ্চ পত্রটি সঙ্গে আনিবেন। পত্ৰ-বিষয়ে গোপনতা অবলম্বন না করিলে আপনর শত্ৰুজন হইতে ক্ষতির আশঙ্কা।“
চিঠি পড়া শেষ হল। কিকিরা যেন হাঁফ ছাড়লেন।
তারাপদ চা খেতে শুরু করেছিল। লুচি খাওয়ার পর্ব শেষ।
কিকিরাও চায়ের কাপ টেনে নিলেন। বললেন, “হাতের লেখাটি বেশ। ছাপার হরফ যেন।”
“হ্যাঁ, মুক্তাক্ষর। কিন্তু কিকিরা চিঠি থেকে কী আন্দাজ হচ্ছে আপনার?”
“কী আন্দাজ করতে বলছ?”
“বাঃ, আপনি হলেন কিকিরা দি গ্রেট! ভুজঙ্গ কাপালিকের ভুতুড়ে খেলা আপনি ধরতে পেরেছিলেন, আর এ তো কোন শুদ্ধানন্দ। আপনার কাছে ছেলেমানুষ স্যার।”
