কিকিরা মুখ-চোখের অদ্ভুত এক ভঙ্গি করে বললেন, “আমি কিকিরা দি গ্রেট, আমি খুলব যাত্রার দল। বলছ কী?”
তারাপদ হাসির তোড়েই বলল, “আপনি কিকিরা দি ওয়ান্ডার… : গ্রেট ম্যাজিশিয়ান। কখন কী মতি হয় আপনার কে জানে।”
কিকিরা এবার খানিকটা খুশি-খুশি মুখ করে বললেন, “ব্যাপারটা কী জানো তারাপদ। এই জিনিসটি আমি নটবর কর্মকারের কাছ থেকে কালই কিনেছি। চোর-বাজারের নটবর। বেটা নিজেও পয়লা নম্বর থিফ। আমায় বলল, অ্যালফ্রেড থিয়েটারের শশী শীল এই ক্ল্যারিওনেটটি বাজাতেন। গায়ে নাম লেখা আছে এস এস।”
“শশী শীল কে?”
“তোমাদের নিয়ে জ্বালা। কিস্যু জানো না। শশীবাবু ছিলেন পয়লা নম্বর ক্ল্যারিওনেট হ্যান্ড। মাস্টার লোক। পিয়ানোয় দু’কড়ি, বেহালায় ছোটু বড়াল আর ক্ল্যারিওনেটে শশী শীল–এরা ছিলেন থ্রি মাস্টারস। লোকে বলত, থ্রি মাসকেটিয়ারস। সেকালের থিয়েটারপাড়া কাঁপিয়ে রাখতেন ওঁরা। তিনজনেই মারা যান ভিখিরির মতন। ছেলেপুলেগুলো যে যা পেরেছে বাপ-ঠাকুরদার জিনিস বেচে দিয়েছে।”
তারাপদ বলল, “ও! ব্যাপারটা এতক্ষণে বুঝলাম। শশীর ছেলে কাশী বাপের জিনিস চোরা বাজারে ঝেড়ে দিয়েছিল কবে, সেই জিনিসটি আপনি কিনেছেন। এই তো?”
কিকিরা বললেন, “শশীর ছেলে, কাশী না ঋষি–আমি জানি না বাপু। জিনিসটা নটবরের কাছে এসেছিল, কিনে নিলাম। কত মূল্যবান জিনিস বলো?”
তারাপদ মাথা নাড়ল। কিকিরা যা কিনে এনে জড়ো করেন, সবই যে মহামূল্যবান–এটা স্বীকার করে নেওয়াই ভাল। পাথুরেঘাটার কোন যদু মল্লিক যে কলকেটিতে দম মেরে নিয়ে টপ্পা গাইতেন, সেই বাঁধানো কলকেটিও যে অতি মূল্যবান–কিকিরার কাছে তাও স্বীকার করে নিতে হবে। নয়ত বিপদ।
কিকিরা এবার উঠলেন, “জল খেয়ে আসি বোসো। চায়ের কথা বলে দিই বগলাকে। কী খাবে চায়ের সঙ্গে। বার্মিজ ওমলেট খাও। চট করে হয়ে যাবে।”
তারাপদ মুখ টিপে হাসল, বলল, “যা হোক হলেই হল। আপনার এখানে এত রকম খাবার খেয়েছি যে, চাঁদু বলে কুকিং-এর ব্যাপারেও আপনি অরিজিনাল…।“
“কোথায় সেই স্যান্ডেল উড?”
“পরে বলছি, আপনি জল খেয়ে আসুন।”
কিকিরা আর দাঁড়ালেন না। ঘর ছেড়ে চলে গেলেন।
কিকিরা চলে যাবার পর তারাপদ অন্যমনস্কভাবে ঘরের চারদিক দেখতে লাগল। মানুষটির সঙ্গে এই ঘরটির অদ্ভুত মিল। বিচিত্র ছাঁটের, আর বেয়াড়া রংচং-অলা এক আলখাল্লা-পরা কিকিরাকে বাড়িতে যেমনটি দেখায় এই ঘরটিও সেইরকম অদ্ভুত দর্শন। এ-ঘরে কী নেই? কিকিরার সিংহাসন-মাক চেয়ার ছাড়াও যত্রতত্র বিচিত্র সব জিনিস ছড়ানো। পুরনো দেওয়ালঘড়ি, চিনে মাটির জার, বড় বড় পুতুল, কালো ভুতুড়ে আলখাল্লা, চোঙাঅলা সেকেলে গ্রামোফোন, ম্যাজিকঅলার আই বল, ফিতে জড়ানো ধনুক, পাদরিসাহেবের টুপি, ম্যাজিক ছাতা আর তলোয়ার, পায়রা-ওড়ানো বাক্স, টিনের চোঙ-কোনটা নয়! তার সঙ্গে এক-দু’মাস অন্তর জমানো ম্যাজিক-মশাল, গাঁজার কলকে, বাহারি মোমদান-এ-সব তো জমেই যাচ্ছে দিনের পর দিন। চন্দন ঠাট্টা করে। বলে, “কিকিরা আপনার এই মিউজিয়ামটির নাম দিন “ছানাবড়া ঘর, সত্যিই এই দৃশ্য দেখলে চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়।”
কিকিরা ফিরে এলেন। আজ তাঁর পরনে হাফ-আলখাল্লা, মানে জামার হাত দুটো কনুই পর্যন্ত লম্বা, কোমরের ঝুল হাটুতক, জামার-রং নীল। মাথায় টুপি। নেই। রুক্ষ বড় বড় চুল ঘাড় পর্যন্ত ছড়ানো। লম্বা নাক, বসা গাল, সরু থুতনি আর বোগা হাড়জিরজিরে কিকিরার চেহারার মধ্যে কিন্তু কী-যেন একটা আকর্ষণ আছে। উনি মজাদার মানুষ এটা বোঝা যায়, আবার নজর করলে ওঁর ভালমানুষি স্বভাবটাও ধরা পড়ে। তারাপদরা অবশ্য জানে, কিকিরার বুদ্ধির ধারেকাছেও তারা পৌঁছতে পারবে না।
কিকিরা নিজের জায়গায় বসতে বসতে বললেন, “স্যান্ডেল উডের খবর কী যেন বললে?”
“চাঁদু হসপিটালে ডিউটি দিচ্ছে।”
“ওর এমনি খবর ভাল?”
“হ্যাঁ। তবে বলছিল, এবার না- ট্রান্সফার করে দেয়। কোনো গাঁ-গ্রামে পাঠিয়ে দেবে।“
“আগে দিক। তোমার খবর কী?”
“এমনিতে ভাল। তবে আপনার কাছে একটা খবর নিয়ে এসেছি।”
“কী খবর?”
তারাপদ পকেট থেকে কিছু-একটা বার করতে করতে বলল, “দেখাচ্ছি। আপনাকে। তার আগে গৌরচন্দ্রিকাটা সেরে নিই।”
“বলো?”
“আমাদের অফিসে জগন্নাথ দত্ত বলে একজন আছে। আমার চেয়ে বয়েসে খানিকটা বড়। আমরা বলি জগুদা। জগুদারা থাকে বিডন পার্কের দিকে। মানে সেকেলে পুরনো কলকাতা পাড়ার এক গলিতে। পৈতৃক বাড়ি। সাত শরিক। জগুদা মানুষটি খুব ভাল। মাটির মানুষ। কিন্তু জগুদার কতক রোগ আছে অদ্ভুত। কাছে গিয়ে আচমকা গায়ে হাত দিলে বা জোরে ডাকলে ভূত দেখার মতন চমকে ওঠে, সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে যায়, কেমন তোতলাতে শুরু করে, কথা বলতে পারে না অনেকক্ষণ। আমরা ঠাট্টা করে জগুদার নাম দিয়েছি নার্ভাস সিস্টেম, মানে ওর নার্ভাস সিস্টেমে গোলমাল আছে।”
কথার মাঝখানে চা নিয়ে এল বগলা।
বগলার সঙ্গে আগেই বাড়িতে পা দিতে-না-দিতেই তারাপদর কথাবার্তা হয়ে গিয়েছে। তারাপদ বলেছিল, “বগলাদা আমার পেটে আগুন জ্বলছে। আমাকে তুমি লুচি আর বেগুনভাজা খাওয়াবে। কিকিরার ওইসব মুলতানি আলুর দম, খানদানি কচুরি, কিসমিসের পকৌড়া আমায় খাওয়াবে না। আমার পেটের নাড়িভুড়ি আমারই বুঝলে তো, কিকিরার নয়। প্লিজ বগলাদা, সেরেফ লুচি আর বেগুনভাজা। কিকিরাকে কিছু বোলো না। উনি যখন জানবেন, তখন জানবেন। জানলেও তো গলা কাটতে পারবেন না।”
