লোচন থতমত খেয়ে গেল। “আমি? আমি আমার ছেলেকে সরিয়ে রেখেছিলাম? কে বলল?”
“আপনার পালোয়ান দরোয়ান। একশো টাকা খসিয়ে খবরটা পেয়েছি। তারপর ভবানীপুরেও খোঁজ করেছি। …আপনি মশাই, ডালে-ডালে যান, গোয়িং ব্রাঞ্চেস, আর আমি যাই পাতায়-পাতায়, গোয়িং লিফ। আপনি দত্তমশাই আমার পেছনে গুণ্ডাও লাগিয়েছেন। উড়ো চিঠি পাঠিয়েছেন ভয় দেখিয়ে।”
লোচন থরথর করে কাঁপছিল। খেপে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠল। “ভাঁড়ামি করবেন না। আমার ছেলেকে আমি সরাইনি।”
“কেন মিথ্যে কথা বলছেন দত্তবাবু! ধোপে টিকবে না।”
“তাই নাকি!” লোচন যেন ব্যঙ্গ করে হাসল। আপনাদের মোহন ধোপে টিকবে?”
“টিকবে না?”
“না, না, না। নেভার। এ-জন্মে নয়। হাজার চেষ্টা করলেও নয়।”
“নয় কেন? এত সাক্ষীসাবুদ, তবু নয়?”
“বলছি নয়। মোহন নেই। সে ফিরে আসতে পারে না।”
কিকিরা বললেন, “মোহন ফিরে এসেছে। আপনি কি তাকে দেখতে চান?”
লোচন থতমত খেয়ে গেল। কী বলছে ওই ম্যাজিকঅলা! লোকটার গালে থাপ্পড় মারার জন্যে হাত উঠে যাচ্ছিল লোচনের। বিশ্রীভাবে চেঁচিয়ে উঠে সে বলল, “হ্যাঁ, চাই। দেখান তাকে।”
কিকিরা মিহিরবাবুর দিকে তাকাল।
মিহিরবাবু চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন ধীরে ধীরে। বললেন, “দেখাচ্ছি। সে এখানেই আছে। আনছি তাকে।” বলে উনি ডান দিকে এগোলেন। পরদা ফেলা ছিল। পরদা সরিয়ে পাশের ঘরে চলে গেলেন।
লোচন একেবারে খেপে গিয়েছিল। নিজের মনে চেঁচাতে লাগল, গালমন্দ শুরু করল কিকিরা আর মিহিরবাবুকে।
কিকিরা বললেন, “অনর্থক চেঁচাচ্ছেন কেন? দু দণ্ড অপেক্ষা করতে পারছেন না? মোহনকে আগে দেখুন!”
“শাট আপ! মোহনকে দেখুন? আপনারা আমায় মোহন দেখাবেন? যত্তসব ধাপ্পাবাজ চোর-জোচ্চোরের দল! আপনাদের আমি কোর্টে নিয়ে যাব।”
“যাবেন। তার আগে মোহনকে দেখুন।”
“আমায় মোহন দেখাবেন! বেশ, দেখান। তবে জেনে রাখবেন-সূর্য পশ্চিম দিকে ওঠে না। মোহনও আর ফিরে আসবে না। আমার চোখের সামনে সে মারা গেছে।”
“মারা গেছে! …আপনিই তাকে আর কত মারবেন দত্তবাবু! এতকাল তো মেরেই এসেছেন। এবার জ্যান্ত হতে দিন।”
লোচন যেন বোধবুদ্ধি হারিয়ে ফেলল হঠাৎ। উত্তেজনার মাথায় চেঁচিয়ে উঠল, “না, সে জ্যান্ত হবে না। আমি তাকে মেরেছি। আমি। আমি নিজে। মরা মানুষ বেঁচে ফিরে আসে না।”
কিকিরা যেন হাসলেন। “আপনি স্বীকার করলেন আপনি মোহনকে মেরেছেন।”
“করলাম। মুখে করলাম। তাতে আমার কী হবে! আপনারা আমার কী করবেন মশাই! পুলিশে নিয়ে যাবেন? বলব, বাজে কথা, আমি কিছু বলিনি। কোর্ট-কাছারি করবেন? বলব, বানানো কথা সব…।”
লোচনের কথা শেষ হল না, মিহিরবাবু ঘরে এলেন। সঙ্গে অমলেন্দু।
অমলেন্দুকে দেখে লোচন যেন বুঝতেই পারল না, কাকে দেখছে? চেনা, না, অচেনা কাউকে। স্তম্ভিত। মুখে আর কথা নেই।
মিহিরবাবু লোচনকে বললেন, “একে চেনো না? অমলেন্দু। মোহনের বন্ধু। তোমাদের সঙ্গে সেদিন ছিল।”
লোচনের মুখ কালো হয়ে উঠেছিল। গলা কাঠ। বলল, “ও এখানে কেন? কোত্থেকে এসেছে?”
কিকিরা ততক্ষণে হাত বাড়িয়ে টেবিল থেকে সেই বেলজিয়ান টেবিল লাইটার তুলে নিয়েছেন। তুলে নিয়ে মিহিরবাবুকে বললেন, “এই নিন স্যার। এটা রেখে দিন যত্ন করে। টেপ হয়ে গেছে সব কথাবার্তা। দত্তমশাই স্বীকার করছেন–নিজের ভাইকে তিনি মেরেছেন।” বলে কিকিরা লাইটার-টেপ রেকর্ডারটা চালিয়ে দিলেন।
লোচন চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ল। সে বুঝতে পারছিল না কী করবে। পালাবে, না, কিকিরার হাত থেকে জিনিসটা কেড়ে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেবে।
মিহিরবাবু বললেন, “লোচন, ওই টেপে তোমার স্বীকারোক্তি ধরা থাকল। আর দু নম্বর প্রমাণ, সাক্ষী থাকল এই অমলেন্দু। তুমি মোহনকে ধাক্কা দিয়ে ঝরনার স্রোতে ফেলে দিয়েছিলে। এবার তুমি কেমন করে বাঁচো তা আমরা দেখব। তুমি বাঁচতে পারবে না। ভাইকে তুমি মেরেছ। তুমি ভেবেছিলে তুমিই একমাত্র চালাক লোক, তোমায় কেউ ধরতে পারবে না। তুমি ধরা পড়েছ। পাঁচ বছরের চেষ্টা আজ আমার সফল হয়েছে।”
লোচন পালাবার চেষ্টা করল। পারল না। অমলেন্দু যেন লাফ মেরে গিয়ে তাকে ধরে ফেলল।
১.৫ শুদ্ধানন্দ প্রেতসিদ্ধ ও কিকিরা
০১.
তারাপদ এসে দেখল, কিকিরা বসে বসে ফ্লুট বাজাচ্ছেন। দেখে অবাক হয়ে গেল। যাত্রাদলের বাজনদারদের মতন চোখ বুজে মাথা দুলিয়ে-দুলিয়ে ফ্লুট বাজানোর শখ যে কেন চাপল কিকিরার কে জানে। হাসিও পাচ্ছিল তারাপদর। কিকিরার ওই ছাতিতে কী ফ্লুট বাজে। প্যাঁ-পোঁ অদ্ভুত খাপছাড়া সং ছাড়া আর কিছুই আওয়াজ বেরোচ্ছিল না ফ্লুট থেকে। অথচ কিকিরার ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিল, তিনি যেন মেডেল-পাওয়া ফ্লুটমাস্টার।
তারাপদ হেসে ফেলে ডাকল, “স্যার?”
সাড়া দিলেন না কিকিরা, তারাপদকে দেখলেন মাত্র।
তারাপদ খুব বিনীতভাবে বার-তিনেক ‘স্যার স্যার’ করল।
কিকিরা মুখের সামনে থেকে বাদ্যযন্ত্রটি সরালেন শেষ পর্যন্ত। বললেন, “এসো।” বলে দম নিতে লাগলেন।
তারাপদ বলল,”স্যার, এটা কী বাজাচ্ছিলেন?”
“ক্ল্যারিনেট। তোমরা বলো, ক্ল্যারিওনেট।”
“ফ্লুট নয়?”।
“গোলাপও চেনো না, গাঁদাও চেনো না। যা তোমার মুখে আসে বলে যাচ্ছ।” বলে বাদ্যটি কোলের ওপর রাখলেন। “ফু-লু-ট। ঘা, ও ভদ্রলোকে বাজায়।”
তারাপদ হাত জোড় করে হাসতে হাসতে বলল, “সত্যিই স্যার, কোনোটাই চিনি না। তা আপনি হঠাৎ প্যাঁ-পোঁ শুরু করলেন কেন? যাত্রাদল খুলবেন নাকি।”
