লোচন বসল।
কিকিরারা আগেই বসে পড়েছিলেন। বসে পড়ে অন্যমনস্কভাবে টেবিল থেকে সেই নতুন লাইটারটা তুলে নিয়ে জ্বালালেন। নিভিয়ে দিলেন আবার।
মিহিরবাবু বললেন, “এবার বলো, কী বলছিলে?”
লোচন বলল, “আমি সেই জোচ্চোর লোকটার কথা বলছি। “
“মোহনের কথা?”
“কে মোহন? জাল-জালিয়াত একটা লোককে আপনি মোহন বলছেন?”
“জাল-জালিয়াত…!” মিহিরবাবু বললেন। বলে মাথা নাড়ালেন, “তুমি বলছ জাল-জালিয়াত। সে বলছে, ও মোটেই জাল নয়।”
“ও বলছে! ও কে?…আপনি মোহনকে চেনেন না? তাকে ছেলেবেলা থেকে দেখেননি? মোহন না আপনার আদরের ছেলে ছিল?”
মাথা হেলিয়ে মিহিরবাবু বললেন, “মোহনকে আমি সব দিক দিয়েই ভাল করে চিনি বলেই বলছি, ও মোহন। “
লোচন একেবারে হতভম্ব। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল মিহিরবাবুর দিকে। কী বলবে যেন বুঝে উঠতে পারছিল না। ক্রমেই তার মাথায় যেন রক্ত চড়তে লাগল। চেঁচিয়ে বলল, “আপনি বলছেন মোহন। আশ্চর্য! আপনি একটা জালিয়াতকে মোহন বলছেন?”
“তুমি কি ভাবছ, আমার মাথা খারাপ হয়েছে?”
রাগে যেন ফেটে পড়ল লোচন। “আপনি, আপনি একটা জালিয়াতকে কেমন করে মোহন ভাবছেন আমি জানি না।”
“প্রমাণ না পেলে ভাবতাম না।”
“প্রমাণ? কী বলছেন? সত্যিই আপনার মাথার গোলমাল হয়েছে। আপনি কি সেই চিঠির হাতের লেখার কথা বলছেন? ওটা কোনো প্রমাণ?”।
মিহিরবাবু বললেন, “লেখা না,হয় নকল হল, কিন্তু মোহনের বন্ধুবান্ধব।” হলে তিনি বইয়ের আলমারির দিকে হাত তুলে কী যেন দেখালেন। বললেন, “ওই যে ওখানে যে-ছেলেটি বসে আছে সে মোহনের ছেলেবেলার বন্ধু।”
লোচন ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল। আলমারির পাশ ঘেঁষে আড়ালে চন্দন বসে ছিল। তাকে দেখল লোচন। অচেনা মানুষ।
মিহিরবাবু বললেন, “ওকে জিজ্ঞেস করো?”
জিজ্ঞেস করতে হল না। চন্দনকে শেখানো ছিল। সে নিজেই বলল, “মোহনদা আমার স্কুলের বন্ধু। আমরা সেন্ট পলস স্কুলে একসঙ্গে পড়তাম। তখন আমি পিসির কাছে গড়পারে থাকতাম। আমার চেয়ে এক বছরের সিনিয়র ছিল মোহনদা। সিনিয়ার হলেও বন্ধু ছিল। কলেজে আমরা ছাড়াছাড়ি হয়ে যাই। মোহনদা সেন্ট পলসেই ছিল, আমি স্কটিশে…। তারপর আমি ডাক্তারিতে..”
লোচন অদ্ভুত চোখে চন্দনকে দেখছিল।
চন্দন বলল, “আমি এখন ডাক্তার। মোহনদা..”
“কোথায় বাড়ি আপনার?” লোচন বলল হঠাৎ।
“বাড়ি বহরমপুর। এখানে থাকি কোয়ার্টারে, মেডিকেল মেস…”
“আপনি মোহনকে দেখেছেন?”
“দেখব মানে? কী বলছেন আপনি! আগে প্রায়ই দেখাশোনা হত, তারপর আর হয়নি। শুনেছিলাম মোহনদা মারা গেছে। সেটাই জানতাম। হঠাৎ মাসখানেক আগে দেখা। ট্রামে। আমি অবাক।”
লোচন চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ার মতন করে দাঁড়িয়ে পড়ল। “বাজে কথা। মিথ্যে কথা। মোহন নয়। মোহন হতেই পারে না।”
“মানে! মোহনদা নয়!…আলবাত মোহনদা। আমরা ট্রাম থেকে নেমে চায়ের দোকানে বসে চা খেলাম। কত পুরনো গল্প হল!”
অবিশ্বাসের মুখ করে লোচন বলল, “কখনোই নয়। এ-সবই সাজানো।” বলে মিহিরবাবুর দিকে তাকাল। “আপনি ওকে মিথ্যে সাক্ষী সাজিয়েছেন।”
“আমি! কেন?”
“ওই জালিয়াত আপনাকে ব্রাইব করেছে। ছি ছি, মিহিরকাকা… ছি!”
মিহিরবাবু শান্তভাবেই বললেন, “নোচন, আমাদের পরিবারের কাউকে টাকা দিয়ে এ-পর্যন্ত কেউ কেনেনি। তুমি খুব খারাপ কথা বললে। অন্য সময় হলে তোমাকে আমি এখানে দাঁড়াতে দিতাম না। …যাকগে, সাক্ষীও শুধু একা নয়, আরও আছে।”
চন্দন সঙ্গে-সঙ্গে বললে, “আছে বইকী! মোহনদাকে নিয়ে আজ কদিন আমি অন্তত চার-পাঁচ জায়গায় গিয়েছি। আদিত্য, হরিহর, বিজন… সকলেই আমাদের বন্ধু। ওরা সবাই শুনেছিল মোহনদা মারা গিয়েছে। আজ জানতে পারছে, খবরটা ভুল। “
লোচন মিহিরবাবুর দিকে তাকাল। রাগে গা জ্বলছে, চোখ লাল। গলার স্বর রুক্ষ। বলল, “আমি বুঝতে পেরেছি, আপনি একটা জাল লোকের হয়ে মামলসা সাজাচ্ছেন।”
“হ্যাঁ, সাজাচ্ছি। তবে জাল লোকের নয়, আসল লোকের হয়ে। …হয়ত এ-নিয়ে আমি মাথা ঘামাতাম না। চিঠিটাও জাল বলে ভেবে নিতাম। কিন্তু মোহন জাল নয়। জাল হলে ও বারবার আমার কাছে আসত না। মাঝে-মাঝে এখন সে এখানে আসছে। ওর পুরনো জানাশোনা লোকেদেরও আনছে সঙ্গে করে। আমি এখন কনভিনড় যে, জাল নয়, এই মোহনই আসল।”
“অসম্ভব। হতেই পারে না।”
“তুমি যতই অসম্ভব বলল, আমি মনে করছি, মোহন মারা যায়নি। সে বেঁচে আছে। আর এখন সে কলকাতায়।”
লোচন পাগলের মতন চেঁচিয়ে উঠল। “কোথায় সে! ডেকে আনুন তাকে। আমার সামনে এসে দাঁড়াক। দেখি সে কেমন মোহন?”
কিকিরা এমন মুখ করে বসে থাকলেন যেন তিনি নীরব দর্শক। অবশ্য চোখে-চোখে যেন কিছু বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন মিহিরবাবুকে।
মিহিরবাবু বললেন, “লোচন, তুমি যদি মোহনকে দেখতে চাও দেখাতে পারি। কিন্তু আমি বলি দেখাটা আদালতে হওয়াই ভাল।”
লোচন কাঁপছিল। বলল, “মিহিরকাকা, আমাকে আপনারা ব্ল্যাকমেইল করতে চান? লোচন দত্ত অত সহজে ভয় পায় না।”
“তোমায় কেন ব্ল্যাকমেইল করব হে?”
“করেছেন। আপনি না করুন আপনার মক্কেল করেছে। জাল মোহন। আমার ছেলেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল। নেয়নি?”
এবার কিকিরা কথা বললেন। মাথা নেড়ে বললেন, “ওটা আপনারই চলি দত্তবাবু! একবেলার জন্যে ছেলেকে ভবানীপুর পাঠিয়েছিলেন, আপনার এক ভায়রার বাড়ি। নিজেই ছেলেকে সরিয়ে দিয়ে দেখাতে চাইছিলেন জাল মোহন আপনাকে ব্ল্যাক মেইল করতে চায়।”
