“হ্যাঁ। কারণ তুলসীবাবু নোচনের বিশ্বস্ত কর্মচারী। কর্মচারী বিশ্বস্ত হলেও, ভদ্রলোক এখন চোখে ভাল দেখেন না। এই সুযোগটা নিয়েছি। তা ছাড়া আপনাকে আগেই বলেছি, অমলেন্দু মেক-আপটা ভাল নিতে পারে; গলার স্বর পালটাবারও ক্ষমতা রয়েছে ওর। …শুনতে চান তো শুনিয়ে দিতে পারি।”
তারাপদ বলল, “শুনি একটু।”
মিহিরবাবু তাঁর সেক্রেটারিয়েট টেবিলের তালা-লাগানো ড্রয়ার খুলে একটা ছোট টেপ রেকর্ডার মেশিন আর টেপ বের করলেন। দেখেই বোঝা গেল, বিদেশি মেশিন।
“এখন যার গলা শুনবেন এটা আসলে অমলেন্দুর, কিন্তু নকল মোহনের।” বলে মিহিরবাবু মেশিন চালিয়ে দিলেন। ব্যাটারি তাজাই ছিল। টেপ বাজতে লাগল। তারাপদরা ঝুঁকে পড়ে শুনতে লাগল নকল মোহনের গলা।
কিছুক্ষণ পরে মিহিরবাবু বললেন, “এই গলার সঙ্গে আসল মোহনের গলার স্বর আপনারা চট করে ঠাওর করতে পারবেন না। শোনাচ্ছি সেই আসল গলা।”
মেশিন থেকে ক্যাসেটটা খুলে নিয়ে অন্য একটা ক্যাসেট ঢুকিয়ে দিলেন মিহিরবাবু। বললেন, “এই গলাটা আসল মোহনের। তবে এখানে যা শুনবেন–সেটা আমাদের নাটক থেকে। মাঝে-মাঝে শখ করে আমরা নাটকের কিছু কিছু অংশ টেপ করে রাখি। শুনুন এবার।”
মেশিন চালিয়ে দিলেন মিহিরবাবু।
দু জনের গলার স্বরের পার্থক্য ধরা সত্যিই মুশকিলের। হয়ত বারবার শুনলে.ধরা যেতে পারে। নয়ত ধরা যাবে না।
কিকি বললেন, “বুঝেছি। আর দরকার নেই।”
মেশিন বন্ধ করলেন মিহিরবাবু। বললেন, “অমলেন্দু প্র্যাকটিস করে গলাটা ধরেছে বেশ।”
কিকিরা হঠাৎ বললেন, “হাতের লেখা? সেটাও কী..”।
মিহিরবাবু একটু হাসলেন। বললেন, “মোহন আমাদের নাটকের সময় রিহার্সাল দেওয়ার কপি তৈরি করত। পার্ট মুখস্থ করার কপি লিখত। তার হাতের লেখা আমার কাছে অনেক আছে। অমলেন্দুকে দিয়ে দিনের পর দিন তা নকল করিয়েছি।”
“এখানে?”
“না, দিল্লিতে থাকতেই এ-সব করেছে অমলেন্দু। একাজ দু-একদিনে হয় না। সময় লাগে।“
কিকিরা চুপ করে থাকলেন। মিহিরবাবুর ধৈর্য ও অধ্যবসায়কে প্রশংসা করতে হয়। বুদ্ধিকেও।
শেষমেশ কিকিরা বললেন, “আপনি এত কষ্ট করলেন যে-জন্যে তার চৌদ্দ আনাই কাজে লেগেছে। লোচনকে চারপাশ থেকে আপনি চেপে ধরেছেন। সে ভয় পেয়েছে। ভীষণ অশান্তির মধ্যে রয়েছে।”
“আমি তাই চেয়েছিলাম। চারদিক থেকে প্রেশার দিয়ে ওর মনের ডিফেন্সট্রা আগে ভেঙে দিতে.”
“বাকি দু আনা কাজই আসল। তাই না, স্যার?…ওটা আমায় করতে দিন।”
“কী কাজ?”
“লোচনকে আমি আপনার কাছে নিয়ে আসতে চাই। …ওকে এখানে আনার পর বাকি কাজটাও আপনি করবেন।”
“সে আসবে?”
“মনে হয় আসবে। জাল মোহনকে ধরার জন্যে সে উন্মাদ। লোচন বুঝতে পেরেছে, এই জাল মোহনকে ধরতে না-পারা পর্যন্ত তার শাস্তি হবে না। যদি নকল মোহন এইভাবেই থেকে যায়, সে তাকে জ্বালাবে। দিনের পর দিন।”
মিহিরবাবু কী যেন ভাবলেন। বললেন, “লোচনকে আপনি আনবেন কেমন করে?”
কিকিরা রহস্যময় হাসি হাসলেন। “আনব। সে-দায়িত্ব আমার।”
“আপনি বলবেন, জাল মোহন আমার কাছে আসা-যাওয়া করে, এই তো?”
“ধরেছেন ঠিক। বলব, জাল মোহন আপনার কাছে হালে বার কয়েক এসেছে। সে চাইছে আপনার পরামর্শ নিয়ে মামলা-মোকদ্দমা কিছু একটা লাগিয়ে দিতে। তাকে ভয় দেখাব। বলব, মামলা যদি একবার লেগে যায়–এ সেই দীনরাম মামলার মতন হয়ে যাবে। কত বছর চলবে কেউ জানে না।“ বলে কিকিরা হাত বাড়িয়ে ডিবে থেকে একটা পান নিলেন। বললেন, “লোচনের কাগজে নোটিস ছাপার উদ্দেশ্য কী ছিল? কী চেয়েছিল সে? চেয়েছিল জাল মোহনের খোঁজ। কে সে, কোথায় আছে, কী তার মতলব, দেখে নিতে। তা স্যার, এখন যদি লোচন সেই জাল মোহনকে সরাসরি হাতে পায়, ছাড়বে কেন?”
মিহিরবাবু মাথা হেলালেন। “বেশ, আনুন। কিন্তু..”
“কিন্তুর কিছু নেই। আপনি তৈরি থাকুন। একেবারে পাকাপাকিভাবে।” বলে কিকি নতুন লাইটারটা দেখিয়ে ইঙ্গিতে কিছু বুঝিয়ে দিলেন।
মিহিরবাবু ভাবলেন কিছুক্ষণ। “কবে আনবেন লোচনকে?”
“আপনি বলুন?”
“আসছে বুধবার আনুন। আমি ক্লাবে যাব না।”
“সন্ধেবেলাতেই আসব।”
“আসুন। ..আমি তৈরি থাকব।”
.
১১.
আসার কথা ছিল সন্ধে সাতটা নাগাদ, ঘড়িতে সোয়া সাতটা বেজে যাওয়ার পরও লোচন আসছে না দেখে মিহিরবাবু চঞ্চল হয়ে উঠছিলেন। ব্যবস্থা তিনি সবই করে রেখেছেন, এখন শুধু নোচনের অপেক্ষা।
সাড়ে সাতটা নাগাদ কিকিরা এলেন। সঙ্গে লোচন। তারাপদও ছিল।
ঘরে ঢুকেই লোচন উত্তেজিত গলায় বলল, “এ-সমস্ত কী হচ্ছে মিহিরকাকা? শেষ পর্যন্ত আপনি…!”
মিহিরবাবু স্বাভাবিক গলায় বললেন, “বোসো। আমি আবার কী করলাম হে?”
লোচন উত্তেজিত। ক্রুদ্ধ। বলল, “এঁরা বলছেন, আপনি একটা চোর-জোচ্চোরকে বাড়িতে আসা-যাওয়া করতে দিচ্ছেন?”
মিহিরবাবু হাসিমুখে বললেন, “আমি উকিল মানুষ, আমার কাছে সাধুও যা, চোরও তাই। মক্কেলের জাত-বিচার থাকে না।”
“আপনি ওকালতি ছেড়ে দিয়েছেন?”
“তা দিয়েছি। তবে মাঝে-মাঝে পুরনো মক্কেলদের অ্যাডভাইস দিতে হয় বইকি! কমলা ছাড়লেও কমলি কি আর ছাড়ে! বাসো বোসো। দাঁড়িয়ে আছ কেন?”
লোচন বসল না। রাগের গলায় বলল, “এঁরা বলছেন, আপনার এখানে সেই জোচ্চোরটা লুকিয়ে লুকিয়ে আসে?”
মিহিরবাবু শান্তভাবেই বললেন, “আগে বোসো। তুমি তো এসেই রাগারাগি শুরু করলে! বোসো আগে, তারপর তোমার কথা শুনি।”
