“তা হলেও সব চাপা দেওয়া যায় না। আইন আইন, মানুষ মানুষ। অমলেন্দুর মুখে সব শুনে আমি বুঝতে পারি, লোচন কেমনভাবে সাজিয়ে-গুছিয়ে একাজ করেছে।”
“অমলেন্দু কী বলেছে?”
“বলেছে, ঝরনা দেখতে যাওয়ার প্ল্যানটা লোচনের। অবশ্য তাতে কিছু প্রমাণ হয় না। কিন্তু পাহাড়ের যে-জায়গায় মোহনকে সে নিয়ে গিয়েছিল, সেখানে মোহন যেতে চায়নি। মোহন বরাবরই ভিতু ধরনের। সাবধানী। লোচন তাকে ভুলিয়েভালিয়ে নিয়ে গিয়েছিল।”
“অমলেন্দুরা কাছে ছিল না?”
“না। যাওয়ার সময় পাহাড়ের মাথায় লোচনের মেজো শ্যালক চালাকি করে এক জায়গায় বসে পড়ল। বলল, পায়ের শিরায় টান ধরে গিয়েছে, একটু ম্যাসাজ করে নিয়ে উঠে দাঁড়াবে। সে অমলেন্দুকে ছুতো করে কিছুক্ষণ আটকে রাখল। ততক্ষণে লোচন আর মোহন অন্তত ত্রিশ-চল্লিশ গজ এগিয়ে গিয়েছে। তা ছাড়া পাহাড়ি জায়গা, ওরা খানিকটা আড়ালে পড়ে গিয়েছিল। লোচন যখন মোহনকে ঠেলে দেয় ঝরনার স্রোতে, তখন আশেপাশে কেউ ছিল না।”
চন্দন বলল, “একেবারে প্ল্যানড ব্যাপার।”
“একেবারে ছক কেটে খুন করা। …আমার মনে হয় না, মোহনের বডি যখন দেড়দিন পরে পাওয়া গেল–ওকে পোস্টমর্টেম করলেও প্রমাণ করা যেত এটা অ্যাকসিডেন্ট নয়, অন্য কিছু?” বলে চন্দনের দিকে তাকালেন মিহিরবাবু।
চন্দন বলল, “আমারও মনে হয় না, পোস্টমর্টেম রিপোর্ট থেকে বলা যেত কেউ মোহনকে জলে ঠেলে ফেলে দিয়েছে। ঝরনার স্রোত, জল, পাহাড়, পাথর, খানাখন্দ–শরীরের কোন “জখম কেমন করে হয়েছে তা বলা যেমন মুশকিল ছিল, তেমন বলা যেত না, ওটা অ্যাকসিডেন্ট নয়, কিলিং। আমারও তাই মনে হয়। তা ছাড়া ডেডবডিও পাওয়া গেছে প্রায় দেড়দিনের মাথায়। …তা পোস্টমর্টেম যখন হয়নি, হওয়া সম্ভব ছিল না ওখানে, তখন আর ও নিয়ে মাথা ঘামিয়ে কী লাভ!”
মিহিরবাবু বললেন, “আমি এসব কথা অমলেন্দুর মুখে শুনেছি।”
“ও কি আপনাকে আগেই এসব কথা বলেছিল?”
“ফিরে এসেই বলেছিল। মোহনকে সে খুবই ভালবাসত। তবে–গোড়ায় তার সন্দেহ ততটা হয়নি। আমার হয়েছিল। আমি যখন বারবার তাকে খুঁচিয়ে নানা কথা জিজ্ঞেস করতে লাগলাম, তখনই তার সন্দেহ হতে লাগল।”
কিকিরা বললেন, “ও দিল্লি চলে গেল কেন? ঘটনাটার পরই যেন পালাল।”
“একটা কাজ পেয়ে গেল। তা ছাড়া আমিও ওকে চলে যেতে বললুম। বলা কি যায়, কোনো কারণে যদি লোচনের সন্দেহ হয় ওর ওপর, তাতে বিপদ হতে পারে।”
তারাপদ কথা বলল এবার। বলল, “তখন থেকেই কি আপনি…”
তারাপদকে কথা শেষ করতে না দিয়েই মিহিরবাবু বললেন, “অমলেন্দু দিল্লি যাওয়ার আগে আমি তাকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়েছিলুম, একদিন না একদিন–এই খুনের শোধ আমরা নেব। লোচনকে ফাঁসিকাঠে ঝোলাব।”
কিকিরা বললেন, “আজ পাঁচ বছর ধরে আপনারা সে-চেষ্টা করেছেন?”
“হ্যাঁ, পাঁচ বছর ধরে। ধীরে ধীরে। …লোচনকে ভুলে যেতে দিয়েছি তখনকার ঘটনা। ভুলে যেতে দিয়েছি তার ওপর কোনো সন্দেহ রয়েছে। কারও। সে ভাবতেই পারেনি তার কোনও চরম শত্রু আছে, যে তাকে খুনের মামলায় আসামি করতে পারে। সে এই ক’ বছর নাকে তেল দিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছে, সম্পত্তি ভোগ করেছে। নিজের খেয়ালে যা পেরেছে বেচেছে, দেনা বাড়িয়েছে, এমনকী অন্য জায়গায় চলে যাওয়ার তোড়জোড় করছে নতুন বাড়ি করে। আর আমি তলায়-তলায় নিজের কাজ করে গিয়েছি।”
চা শেষ হল কিকিরাদের। একটা পান নিলেন তিনি।
মিহিরবাবু অন্যমনস্কভাবে সিগারেট নিলেন। লাইটার জ্বালিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলেন কিকিরা।
সিগারেট ধরিয়ে নিয়ে মিহিরবাবু বললেন, “আমি তাড়াহুড়ো করে কিছু করিনি। ধৈর্য ধরে ধীরে-ধীরে করতে হয়েছে যা করার। একদিকে লোচন যেমন নিশ্চিন্ত হয়ে দিন কাটিয়েছে, ভেবেছে সে নিরাপদ, তার কোনো ভয়। নেই, অন্যদিকে তার গলায় ফাঁস বাঁধার সবরকম চেষ্টা আমি গুছিয়ে নিয়েছি।”
কিকিরা বললেন, “ আপনি জাল মোহনকে আসল মোন করতে চেয়েছেন বুদ্ধি করে।”
“হ্যাঁ। জালকে আসল করা যায় না। কিন্তু ধোঁকা দেওয়া যায়।”
তারাপদ বলল, “অনিলবাবু, সতীশবাবু, তুলসীবাবু-মানে এদের সকলকে আপনিই বেছে নিয়েছিলেন?”
মিহিরবাবু মাথা নাড়লেন। “ভেবে-ভেবে এদেরই বেছে নিয়েছিলাম। এরা কেউ লোচনের আত্মীয়, কেউ বন্ধু, কেউ পুরনো কর্মচারী। লোচন যখন এদের কাছ থেকে একে একে মোহনের কথা শুনবে, ধাঁধায় পড়ে যাবে। পাপের মন যার, সে কি আর নিশ্চিন্ত হয়ে থাকতে পারে। লোচনের এখন মনের অবস্থা বুঝতেই পারছ। তার ঘুম বন্ধ হয়ে গেছে।”
কিকিরা বললেন, “আপনাকে অনেক খবর জোগাড় করতে হয়েছে।”
“অনেক। লোচনরা আমাদের প্রতিবেশী। তাদের বাইরের খবর কম-বেশি আমি জানি। তা ছাড়া রামদার কাছে শুনেছি নানা কথা। …তবু বাড়ির ভেতরের খবর? সে সব তো আমার অত জানা নেই। এক-এক করে কুড়িয়ে বাড়িয়ে এখান-ওখান থেকে সেগুলো জোগাড় করতে হয়েছে কাঠখড় পুড়িয়ে। ওই খবরগুলো যদি না জানা থাকে, নকল মোহনকে আসল মোহন বলে ধোঁকা দিয়ে চালানোর চেষ্টা করা যেত না।”
“ছাপাখানার খবরও নিয়েছেন দেখছি?”
“নিয়েছি। না নিলে কেমন করে লোচন আর তুলসীবাবু ধোঁকা খাবে।”
“তুলসীবাবুর কাছে আপনি অমলেন্দুকে মোহন সাজিয়ে পাঠিয়েছিলেন।”
