তারাপদ বলল সব।
মিহিরবাবু শুনলেন। চুপ করে থাকলেন কিছুক্ষণ। কপাল কুঁচকে দুশ্চিন্তার ভান করলেন। পরে বললেন, “ব্যাপারটা নতুন মনে হচ্ছে! তা পাড়ার মধ্যে আমাকে কাবু করার সাহস কার হবে? লোচনেরও হবে না।”
“ধরুন, ও যদি আপনার ওপর নজর রাখার জন্যে…”
মিহিরবাবু এবার সকৌতুক মুখে বললেন, “না, আপনারা ভুল করছেন। রিকশাঅলা আমারই লোক। কদিন ধরে ওকে রাখছি। একটু নজর রাখে।”
কিকিরা থ হয়ে গেলেন। “আপনার লোক?”
“হুঁ”
“আমাকে স্যার কে যেন শাসিয়েছে উড়ো চিঠি দিয়ে। বলেছে, দাদু, তুমি নিজের চরকায় তেল দাও।”
তারাপদ বলল, “একটা উটকো লোক এসে কিকিরাদের ট্রামের ওপর ঠেলে ফেলে দিতে গিয়েছিল।”
মিহিরবাবু কিছু বললেন না। জর্দা মুখে দিলেন।
কিকিরা বললেন, “লোচনের সঙ্গে আমি গত পরশু দেখা করেছিলাম।”
পান-জর্দা মুখে মিহিরবাবু শঙ্কিত গলায় বললেন, “অমলেন্দুর কথা বলেছেন নাকি?”
“পাগল নাকি! তা আমি বলি?”
“তবে কী বললেন?”
“বললাম, জাল মোহনকে প্রায় ধরে ফেলেছি। আর দু-চারটে দিন।”
“বিশ্বাস করল?”
“বুঝতে পারলাম না। তবে জাল মোহনকে দেখতে ওর খুব আগ্রহ।”
“দেখিয়ে দিন।”
কিকিরা একটু হাসলেন। বললেন, “লোচনকে নিয়ে একটু খেলা খেলতে চাই। এখন আপনার দয়া।”
“দয়া?” সন্দেহের চোখে কিকিরাকে দেখলেন মিহিরবাবু, “আপনার মতলবটা কী মশাই? খোলসা করে বলুন তো?”
কিকিরা হাত বাড়িয়ে মিহিরবাবুর সিগারেটের প্যাকেটটা টেনে নিলেন। যেন কিছুই নয়, ধীরেসুস্থে একটা সিগারেট ধরালেন। বললেন, “স্যার, আমার মতলব ভেরি সিম্পল। আমি লোচনকে আপনার এখানে হাজির করাতে চাই।”
এরকম একটা মামুলি কথা শুনতে হবে, মিহিরবাবু ভাবেননি। খানিকটা অবাক হয়ে বললেন, “এর মধ্যে দয়া করার কী আছে, মশাই? লোচন থাকে কাছেই। ক’-পা দূরে; পাড়ার ছেলে, তাকে হাজির করাতে চান, করাবেন।”
“সেইসঙ্গে আপনাকে যে একটা কাজ করতে হবে।”
“কী কাজ?”
“মোহনকে এখানে হাজির করাতে হবে।”
“মোন?” মিহিরবাবু অবাক। “মোহনকে আমি কোথায় পাব?”
কিকিরা সিগারেটে টান মেরে ধোঁয়া গিললেন। কাশলেন অল্প। তারাপদ আর চন্দনকে এক পলক নজর করে নিলেন। আবার মিহিরবাবুর দিকে তাকালেন। বললেন, “আপনি ছাড়া একাজ কে করবে! আপনিই পারেন
“ধ্যুত মশাই, আমি কি ভগবান? না, আপনার মতন ম্যাজিশিয়ান যে, মরা মানুষ আবার জ্যান্ত করতে পারি?”
“আপনি স্যার আসল। মানে আপনি যন্ত্রী, আমরা যন্ত্র।“
“তার মানে?”
“তার মানে, এই রহস্যের চাবিকাঠিটি আপনার হাতে। আপনি যতক্ষণ না তালাটা খুলে দিচ্ছেন, কিস্যু করার নেই।”
মিহিরবাবু চুপ। তাকিয়ে থাকলেন কিকিরার দিকে। শেষে বললেন, “মোহনকে আমি কোথায় পাব! সে আর নেই।” বলার সঙ্গে সঙ্গে মিহিরবাবুর চোখ-মুখ কঠিন হয়ে উঠল। কেমন যেন হতাশ, ক্রুদ্ধ!
কিকিরা বললেন, “জাল মোহনের কথা বলছি। আমি জানি আসল মোহন আর নেই।”
মিহিরবাবু কথা বললেন না। তাঁর মুখ আরও থমথমে হয়ে উঠল। দুটি চোখ যেন কঠিন হল। অন্যমনস্ক হয়ে পড়লেন।
কিকিরা অপেক্ষা করতে লাগলেন।
শেষে মিহিরবাবু বললেন, “আপনি কি সব বুঝতে পেরেছেন?”
মাথা হেলিয়ে কিকিরা বললেন, “খানিকটা। আমি বুঝতে পেরেছি এই জাল মোহনকে আপনি এনেছেন? ঠিক কি না?”
মিহিরাবাবু তাকিয়ে থাকলেন অন্যদিকে। তবে মাথা নাড়লেন। হ্যাঁ, তিনিই এনেছেন।
কিকিরা বললেন, “লোচনকে আপনি সব দিক থেকে কোণঠাসা করে ফেলতে চান, তাই না?”
“হ্যাঁ।”
“কেন?”
মিহিরবাবু এবার যেন আচমকা জ্বলে উঠলেন। বললেন, “সে খুনি। মাডারার। শয়তান।”
“আপনি কি শুধু খুনি লোকটাকে ধরার জন্যে এত চেষ্টা করছেন?”
মিহিরবাবুর আর যেন ধৈর্য থাকল না। বললেন, “শুধু খুনি বলে…? না, তার চেয়েও বেশি। আপনি কেমন করে জানবেন মোহনের সঙ্গে আমার সম্পর্ক কী ছিল! আপনি জানেন না। আমি ওকে নিজের ছোট ভাইয়ের। চেয়েও বেশি ভালবাসতাম। বলতে পারেন, ছেলের মতনই। ও এত ভাল, সরল, শান্ত ছিল। সবাই ওকে ভালবাসত। তা ছাড়া রামদা, মানে মোহনের বাবা আমায় বিশ্বাস করতেন, স্নেহ করতেন। তিনি আমায় বারবার বলেছেন, “মিহির, সংসার বড় খারাপ জায়গা, আমার ছেলেটাকে তুমি দেখো।” আমি তখন অত কিছু ভাবিনি, বলেছিলাম, আপনি ভাবছেন কেন, নিশ্চয় দেখব।’
মিহিরবাবু থেমে গেলেন। কে যেন আসছিল।
বাড়ির লোক ঘরে এল। চা রেখে গেল টেবিলের ওপর। চায়ের সঙ্গে কিছু প্যাসট্রি।
মিহিরবাবু বললেন, “নিন, চা খান…যা বলছিলাম ৷ সংসার বড় অদ্ভুত জায়গা। এখানে কী না হয়। আমি তো কিছুকাল ওকালতি করেছি। ক্রিমিনালও না ঘেঁটেছি এমন নয়। লোচন একটা পাক্কা ক্রিমিনাল। মোহনকে সে মেরেছে। হি হ্যাজ কিলড হিম।”
“আমারও তাই সন্দেহ।”
“সন্দেহ নয়, সত্যি। …আপনি বলবেন, প্রমাণ কী? প্রমাণ নেই। লোচন অত্যন্ত চালাক, ওর মগজ ক্রিমিনালের। ভাইকে খুন করার পর ও এমনভাবে জিনিসগুলো ওর তরফে সাজিয়ে নিয়েছে যে, আইনমাফিক ওকে ধরবার উপায় রাখেনি। আইন প্রমাণ চায়–অনুমান সন্দেহ এ-সব স্বীকার করে না। লোচন এক দেহাতি ডাক্তারের ডেথ সার্টিফিকেট জোগাড় করেছে। থানা আর ডাক্তারকে টাকাও খাইয়েছে নিশ্চয়। আইডেনটিফিকেশন করিয়ে নিয়েছে ওর মেজো শ্যালক আর অমলেন্দুকে দিয়ে। সব পথ ও মেরে রেখেছে।”
“তা হলে?”
