তারাপদ আর চন্দন দু-পাঁচ পা এগিয়ে গিয়ে রিকশাঅলাকে বলল, “এই, রোখ যাও। যানা হ্যায়…।”
রিকশাঅলা রিকশা থামাল না। “দুসরা গাড়ি দেখিয়ে।”
“কাহে?”
মাথা নাড়ল রিকশাঅলা। সে যাবে না।
তারাপদ বলল, “তুমি বাপ এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলেন চুপচাপ; এখন বলছ যাবে না। তোমার মরজি।”
“হামকো পেট দুখাতা হ্যায়। নেহি জায়গা।”
তারাপদ চন্দনকে বলল, “কারবার দেখছিস! এতক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল–আর আমরা যাব বলতেই বেটা পেটব্যথার অজুহাত খাড়া করল! ব্যাটা মহা বদমাশ তো।” বলে তারাপদ রিকশার কাছ থেকে সরে আসছিল।
চন্দন হাত ধরল তারাপদর। “দাঁড়া! ওর পেট ব্যথা আমি দেখাচ্ছি।” বলে সোজা দু পা এগিয়ে রিকশার হাতল ধরে ফেলল। এই, রিকশা উতারো। পেট দুখাতা হ্যায়? ঠিক হ্যায় থামা মে চল…। হাম থানাকা বাবু। আ যাও…”
রিকশাঅলা ভয় পেয়ে গেল। বোধ হয় ক’ মুহূর্ত মাত্র হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। তারপর অদ্ভুত কাণ্ড করল। রিকশার হাতল ফেলে দিয়ে দে দৌড়। ক্রিক রোয়ের গলি দিয়ে ছুট।
চন্দনরাও কম হতভম্ব হল না। এরকম হবে তারা ভাবতেই পারেনি। রিকশাঅলা পালাল।
তারাপদ বলল, “কী হল রে?”
চন্দন বলল, “আশ্চর্য! ব্যাটা পালাল কেন? ও কে রে?”
তারাপদর কেমন খটকা লাগল চন্দনের কথায়। “লোকটা অমলেন্দু নয় তো?”
“রাবিশ। অমলেন্দু রিকশাঅলা হবে কেন? এব্যাটা রিয়েল-রিয়েল রিকশাঅলা। কিন্তু ব্যাপারটা কী হল? মিহিরবাবুর ফেরার পথে কেউ নজর রাখছে নাকি?
.
১০.
নিজের বৈঠকখানাতেই ছিলেন মিহিরবাবু; সাদরে অভ্যর্থনা করলেন কিকিরাদের। কিকিরা আর তারাপদর সঙ্গে চন্দনও এসেছে আজ।
মিহিরবাবু বললেন, “আসুন ম্যাজিকবাবু! আসুন। বসুন।” বলে রহস্যময় চোখ করে চন্দনকে ইশারা করলেন। “এটি কি আপনার দু নম্বর অ্যাসিস্ট্যান্ট?”
কিকিরা যেন কতই লজ্জা পেয়েছেন এমন মুখ করে বললেন, “আজ্ঞে, ঠিক তা নয়, আমার এজেন্সির পার্টনার?”
“পার্টনার! কী এজেন্সি আপনার?”
“কুটুস!”
“কুটুস! তার মানে?”
“স্যার, হওয়া উচিত ছিল কিকিরা-তারাপদ-চন্দন, ছোট করে কে. টি. সি.। তারাপদ একটু পালটে নিয়ে নাম দিয়েছে “কুটুস’।”
মিহিরবাবু হো-হো করে হেসে উঠলেন। হাসি আর থামতে চায় না। শেষে বললেন, “রিয়েলি, আপনি ফানি লোক মশাই। বসুন বসুন। তোমরা বসো। সিট ডাউন। তা ম্যাজিকমশাই, থিয়েটারে আমরা আজকাল ডিরেক্টর, মিউজিক, আলোকসম্পাত রাখি। আপনার এ দুটি বোধ হয় তাই, সঙ্গীত আর আলো, তাই না?”
কিকিরা হাতজোড় করে বললেন, “থিয়েটারের খোঁজ আমি রাখি না স্যার। সেই বড়বাবু, মানে শিশিরবাবুর আমলে রাখতাম।”
মিহিরবাবু মজার মুখ করে দেখলেন কিকিরাকে, চোখের ভঙ্গি থেকে মনে হল, তিনি যেন ঠাট্টা করে বলছেন, তাই নাকি?
কিকিরা এবার পকেট থেকে দুটো লাইটার বের করে মিহিরবাবুর সামনে টেবিলে রাখলেন। বললেন, “স্যার, আমায় আপনি মাফ করবেন। ম্যাজিশিয়ানদের হাত বড় চঞ্চল। লোভ সামলাতে পারে না। নো থিফিং সার, জাস্ট মজাফ্যায়িং…।”
“থিফিং? মানে?”
“মানে, ইয়ে, বলছি চুরি করিনি স্যার, মজাফ্যায়িং-মানে ইয়ে মজা করেছিলাম।”
মিহিরবাবু আবার হেসে উঠলেন জোরে। বিষম খান আর কি! কাশি সামলে বললেন কোনোরকমে, “মশাই, আপনি আমায় নাকের জলে চোখের জলে করে ফেলবেন! ইংরেজরা এদেশে থাকলে আপনাকে শূলে চড়াত।”
“থাকল কোথায়! তাড়িয়ে ছাড়লাম…।”
“বেশ করলেন। তা একটু চা হোক।” বলে টেবিলের সঙ্গে লাগানো ঘন্টি-বোম বাজালেন। মানে, খবর গেল ভেতরে। “দুটো লাইটার কেন? নিয়েছিলেন একটা, দিচ্ছেন দুটো।”
“একটা স্যার আমার প্রণামী! উপহার। বেলজিয়ান লাইটার। যখন জ্বলে তখন লাইটারটার বডিও কালারফুল হয়ে যায়। বেশ দেখতে দেখুন না!”
মিহিরবাবু নতুন লাইটারটা জ্বেলে দেখলেন। দেখতে ভাল–তবে সামান্য বড়। ছোট সিগারেটের প্যাকেটের সাইজ। খুশি হলেন। “দাম কত?”।
“দামের জন্যে কী স্যার!…এটা হল টেবল লাইটার, মানে টেবিলে রাখার। সাইজটা একটু বড় দেখছেন না!”
“না না, তবু…”
“প্লিজ! এটা আমার গুরুদক্ষিণা।”
“গুরুদক্ষিণা?” মিহিরবাবু অবাক।
চন্দন আর তারাপদ মুখ টিপে হাসছিল।
বাড়ির ভেতর থেকে কাজের লোক এল। দাঁড়াল এসে। মিহিরবাবু চায়ের কথা বললেন। তারপর বললেন, “জলুকে বলে দিস, কেউ এলে যেন বলে দেয়, আজ দেখা হবে না, আমি ব্যস্ত রয়েছি। কাল সকালে আসতে।”
লোকটি চলে গেল।
মিহিরবাবু ডিবে থেকে পান তুলে নিতে-নিতে বললেন, “কিকিরাবাবু আপনি মজাদার লোক, ভেরি ইন্টারেস্টিং ম্যান, আবার গোয়েন্দা। ম্যাজিশিয়ান-গোয়েন্দা। তা এ-সবই না হয় মানলুম। কিন্তু মশাই, আপনার গুরুদক্ষিণার ব্যাপারটা তো বুঝলাম না?”
কিকিরা অমায়িক মুখ করে হাসলেন। “বোঝার কী আছে?”
“নেই?”
“না স্যার। যেটুকু আছে পরে বুঝিয়ে দেব।”
“আপনি মশাই আমার পেছনে দুই চেলাকে লাগিয়েছেন?” বলে তারাপদদের দেখালেন।
সঙ্গে-সঙ্গে জিভ বের করে নিজের কান মললেন কিকিরা। “ছিঃ ছিঃ, আপনি বলছেন কী! আপনার পেছনে লোক লাগাব! না না, আপনি ভুল বুঝছেন। আমাদের একটু দেখার ইচ্ছে হয়েছিল–অমলেন্দু আপনার সঙ্গে ওই ক্লাবের আশেপাশে দেখা করে কি না! কৌতূহল মাত্র।…তা এক রিকশাঅলা..” বলতে বলতে কিকিরা তারাপদদের দিকে তাকালেন। বললেন, “রিকশাঅলার কথাটা বলো তো?”
