মিহিরবাবু বললেন, “লোচন ভেবেচিন্তে কাজ করে, বোকা নয়।”
“সেটা বোঝা যাচ্ছে। আসলে লোচন চাইছে এই জাল মোহনের রহস্যটা উদ্ধার করতে।
“মানে সে বুঝতে পেরেছে, এমন কেউ তার সঙ্গে শত্রুতা করছে, যে আসল ঘটনাটা জানে। এই লোকটাকে সে ধরতে চায়।”
“আসল ঘটনা জানতে পারে মাত্র দু’জন। লোচনের মেজো শ্যালক, আর মোহনের বন্ধু। তাদের কাউকেই তো পাওয়া যাচ্ছে না। এর মধ্যে লোচনের মেজো শ্যালক ভগ্নীপতির দলে বলে মনে হয়। আর মোহনের বন্ধুর তো কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না।”
“আপনি খোঁজ করেছেন?”
“অনেক। নামটা জানতে পেরেছি। তার দেশ গ্রামের কথাও জানতে পেরেছি। সে দিল্লিতে ছিল তাও ঠিক। তারপর আর কিছু পারিনি।”
মিহিরবাবুর সামনে জলের গ্লাস ছিল। গ্লাসের ঢাকা সরিয়ে জল খেলেন। বললেন পরে, “কী নাম তার?”
“অমলেন্দু..”
“তার কোনো ফোটো দেখেছেন?”
“না।”
“দেখতে চান?…ওই গ্রুপ ফোটোটার কাছেই যান, আবার বিষের ধোঁয়া। মাঝখানে একজনকে দেখবেন, শিকারির পোশাক পরা, হাতে বন্দুক। ভাল চেহারা। ওই হল অমল–অমলেন্দু। মোহনের বন্ধু।”
কিকিরা অবাক হয়ে বললেন, “মোহনের বন্ধুও নাটক করত?”
“করত কী মশাই! ভাল করত। গুড অ্যাক্টর। গলা ভাল, ভয়েস পালটাতে পারত অদ্ভুতভাবে। ওকে যে-কোনো মেক-আপে মানিয়ে যেত।:যান, গিয়ে দেখে আসুন ছবিটা।”
কিকিরা উঠলেন। তারাপদ তখনও ফিরে এসে বসেনি। ছবি দেখছে, ঘর দেখছিল।
দু’জনেই যখন দেওয়ালে টাঙানো বিষের ধোঁয়ার গ্রুপ ফোটো দেখছে, মিহিরবাবু আচমকা বললেন, “আপনারা ওই ফোটোর মানুষটাকে দেখে নিন। তারপর আসল মানুষটাকে যদি একদিন দেখতে পান, অবাক হবেন না।”
কিকিরা আর তারাপদ ঘাড় ঘোরাল। দেখল, মিহিরবাবু চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ালেন। মুখের সেই হাসি নেই, সহজ ভাবটাও দেখা যাচ্ছে না। কেমন যেন গম্ভীর, শক্ত মুখ।
.
০৮.
বাড়ি ফিরে চন্দনকে পাওয়া গেল। সে অপেক্ষা করছিল।
সামান্য রাত হয়েছে।
কিকিরা বললেন, “বোসো, একেবারে খেয়েদেয়ে বাড়ি ফিরো।”
পোশাক পালটে হাতমুখ ধুয়ে খেতে বসলেন কিকিরারা। চন্দন বলল, “কী সার? কতটা এগুলো?” চন্দনের বলার মধ্যে একটু ঠাট্টার ভাব ছিল।
কিকিরা প্রথমে জবাব দিলেন না। পরে বললেন, “অমলেন্দু!”
“কে অমলেন্দু? মোহনের বন্ধু?”
“হ্যাঁ। মোহনের বন্ধু।” বলে তারাপদর দিকে তাকালেন কিকিরা।
“তারাপদ, তুমি এতদিনে এমন একজনকে দেখলে–যিনি অনেক কিছুর খোঁজ রাখেন। মিহিরবাবুর কথা বলছি। পাকা লোক। উনি কিন্তু জানেন এই অমলেন্দু ছোকরা কোথায় আছে। ..তারাপদ, মিহিরবাবুর মতলবটা কী?”
তারাপদ মাথা নাড়ল। “বুঝতে পারছি না।”
চুপচাপ। কথা বলল না কেউ কিছুক্ষণ। শেষে চন্দন বলল, “অমলেন্দু তা হলে এখন কলকাতায়?”
কিকিরা বললেন, “তাতে কোনো সন্দেহ নেই। অমলেন্দু “শুধু কলকাতায় নেই, এই ঘটনাগুলো সেই ঘটাচ্ছে।”
“আপনি ফোনের কথা বলছেন?”
“হ্যাঁ, সে ফোন করছে। তুলসীবাবুর কাছে সে-ই গিয়েছিল। মিহিরবাবুর কথা থেকে বোঝা গেল, ও শুধু ভাল অভিনেতা নয়, ভাল মেক-আপ নিতে, গলার স্বর পালটাতেও পারে।”
তারাপদ হঠাৎ বলল, “আর-একটা জিনিস লক্ষ করেছেন? জাল মোহন ফোন করেছে চার জায়গায়, নিজে গিয়ে হাজির হয়েছে এক জায়গায়, আর চিঠি লিখেছে মাত্র এক জায়গায়–ওই মিহিরবাবুর কাছে। কেন? ফোনে গলা শোনা যায় চোখে দেখা যায় না। জাল মোহন এমনই একজনের কাছে সশরীরে দেখা দিয়েছিল, যে প্রায় অন্ধ। ছানিকাটানো চোখ। তাও দেখা দিয়েছিল সন্ধেবেলায়, টিমটিমে আলোর মধ্যে। আর চিঠি লিখেছে ওই মিহিরবাবুর কাছে। শুধুমাত্র তাঁকেই চিঠি লিখতে গেল কেন?”
চন্দন খেতে-খেতে বলল, “তোরা চিঠি দেখতে চাসনি?”
“না। দেখতে চেয়ে লাভই বা কী হত? আমরা তো হ্যান্ড রাইটিং এক্সপার্ট নই। তা ছাড়া মোহনের আগের হাতের খেলাও চিনি না। সেই লেখা পাব কোথায়? তার চেয়ে লোচনের কথাই স্বীকার করে নেওয়া ভাল। লোচন বলেছে, দেখতে তো একইরকম। মিহিরবাবু ওকে চিঠি দেখিয়েছেন।”
চন্দন যেন ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করল। মিহিরবাবুর কাছে এই জাল মোহনের হাতের লেখা দেখে লোচন স্বীকার করে নিয়েছে লেখাটা মোহনের বলেই মনে হচ্ছে। আশ্চর্য কাণ্ড! এখানে তারাপদরা আর কী করতে পারে নতুন করে?
কিকিরা বললেন, “চাঁদু, এখন আমার মনে সন্দেহ হচ্ছে মিহিরবাবু এর মধ্যে আছেন। তিনি কোনো প্যাঁচ খেলছেন।”
“কেমন?”
“কেমন!..তুমি পুতুলনাচ দেখেছ! একটা লোক পরদার আড়াল থেকে লুকিয়ে পুতুল খেলা দেখায়? দেখেছ নিশ্চয়। মিহিরবাবু বোধ হয় সেই লোক। তিনিই নাচাচ্ছেন জাল মোহনকে।”
“মিহিরবাবুর স্বার্থ?”
মাথা নাড়লেন কিকিরা। “বুঝতে পারছি না। লোচন আর মোহনের মধ্যে মিহিরবাবু কেন? তাঁর কিসের স্বার্থ? তিনি তো তৃতীয় ব্যক্তি।”
তারাপদ বলল, “মোহনকে উনি খুবই ভালবাসতেন।”
চন্দন বলল, “মিহিরবাবু মানুষটি কেমন? মানে আসল চেহারাটি কেমন?”
“খারাপ বলে তো মনে হল না,” কিকিরা বললেন খেতে-খেতে, “গুড ম্যান। নাটক-পাগল। কথাবার্তায় মাই ডিয়ার। মানুষটিকে ভালই লাগে। তা ছাড়া বড় ফ্যামিলির ছেলে। নিজেরাও বেশ সচ্ছল। পড়াশোনা করা মানুষ। ওঁর নিজের কোনো স্বার্থ থাকার কথা নয়।”
“তবে?”
“সেটাই বুঝতে পারছি না।”
তারাপদ হঠাৎ বলল, “মোহনের হয়ে উনি লড়ছেন না তো?”
