“মানে?”
“আমি বলছিলাম, মোহনের পক্ষ নিয়ে উনি লড়ছেন না তো?
চন্দন বলল, “উকিলরা বরাবরই তাদের মক্কেলের পক্ষ নিয়ে লড়ে। কিন্তু এখানে মক্কেল কই? সে তো মারা গিয়েছে। মরা মানুষের পক্ষ নিয়ে লড়া। তাতে লাভ। মোহনের হয়ে যদি কেউ মিহিরবাবুকে লড়াতে চায় অন্য কথা। তেমন কেউ নেই। মোহনের স্ত্রী নয়, নিজের কেউ নয়..”।
কিকিরা হঠাৎ বাধা দিয়ে বলে উঠলেন, “তারাপদ, তুমি একটা জিনিস লক্ষ করেছ। মিহিরবাবু বারবার বলছিলেন, যদি ধরে নেওয়া যায় লোচনই খুনি–তবে তা প্রমাণ করা যাবে কেমন করে?…ওঁর কথা থেকে মনে হচ্ছিল, লোচনকে উনি পুরোপুরি সন্দেহ করলেও এমন কোনো প্রমাণ দেখতে পাচ্ছেন না-যা দিয়ে বলা যায়, লোচন খুনি।” খাওয়া শেষ হয়ে গিয়েছিল কিকিরার। উঠে পড়লেন। বাইরে গেলেন হাত-মুখ ধুতে।
তারাপদ বলল, “চাঁদু, কেসটা কেমন জট পাকিয়ে যাচ্ছে। মিহিরবাবু জটটাকে আরও পাকিয়ে দিলেন।”
চন্দন বলল, “ওই অমলেন্দুকে ট্রেস করতে পারিস না? খোঁজ লাগা।”
“আমি পারব না। কোথায় খোঁজ করব?”
“চেষ্টা কর।”
তারাপদ কিছু বলল না। একাজ তার পক্ষে অসম্ভব। কোথায় খোঁজ করবে অমলেন্দুর?
কিকিরা হাত মুছতে মুছতে ফিরে এলেন। বললেন, “মিহিরবাবুই এখন এক নম্বর হল তারাপদ। ভদ্রলোকের ওপর নজর রাখা দরকার। উনিই যে কলকাঠি নাড়ছেন, তাতে আমার সন্দেহ নেই। তবে কী উদ্দেশ্য, তা বুঝতে পারছি না।” বলেই কিকিরা কী ভেবে বললেন, “ইভনিং ক্লাবটা কোথায় যেন? ওই পাড়াতেই না!”
তারাপদ বলল, “হ্যাঁ। ওয়েলিংটন স্কোয়ারের কাছেই। “
“ওদের বোধ হয় রোজই রিহার্সাল হয়। সোমবার বাদে। আজ সোমবার ছিল। মিহিরবাবুর ছুটি। কাল থেকে দু-তিনদিন ইভনিং ক্লাবের ওপর নজরদারি লাগাও তো!”
“তাতে লাভ কী হবে?”
“কিছুই নয়। যেখানে দেখিবে ছাই উড়াইয়া দেখো তাই বুঝলে কিনা! কে বলতে পারে, অমলেন্দুবাবুর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল…”
“আপনি কি পাগল? অমলেন্দু যাবে ইভনিং ক্লাবে?”
“যেতেও তো পারে। ধরো রাত্তিবেলায় দাড়ি, চশমা লাগিয়ে গা ঢাকা দিয়ে মিহিরবাবুর সঙ্গে দেখা করতে গেল?”
“সে তো বাড়িতেও যেতে পারে।”
“তা পারে। তবে আমার সামনে মনে হয়, বাড়ির চেয়ে ইভনিং ক্লাব সেফ।”
“কী বলছেন স্যার? অত লোকের মধ্যে…”
“না, অত লোক নয়। রিহার্সাল ভাঙার পর–সবাই যখন চলে যায়, মিহিরবাবু বাড়ি ফেরেন, তখন যদি দেখা হয়?”
চন্দন বলল, “আপনি বাঁকাপথে নাক দেখাচ্ছেন। অমলেন্দুর সঙ্গে মিহিরবাবু ওভাবে যোগাযোগ করেন বলে আমারও মনে হচ্ছে না। ঠিক আছে, কাল একবার আমি আর তারা ইভনিং ক্লাবের দিকে ঘোরাফেরা করে আসব। আপনি বরং মিহিরবাবুকে আরও একটু জােন।”
ঘাড় হেলালেন কিকিরা। “জপাব। তবে দু-একটা দিন পরে। ওঁর একটা জিনিস আমি নিয়ে এসেছি, ফেরত দিতে যাব।”
“কী জিনিস?”
“ওঁর টেবিলের ওপর থেকে লাইটারটা নিয়ে চলে এসেছি। জাপানি লাইটার। ভেরি স্মল অ্যান্ড বিউটিফুল!” বলে কিকিরা হাসলেন।
চন্দন বলল, “নিয়ে এসেছেন মানে হাত সাফাই করেছেন?”
“ম্যাজিশিয়ানস হ্যাণ্ড!”
“আপনাকে চোর বলবে স্যার।”
“বলবে না। আমি আসল ফেরত দেব, তার সঙ্গে সুদ। মানে আরও একটা লাইটার, ভাল লাইটার হে, বেলজিয়ান, লাইটার জ্বললেই তার গায়ের রং খেলা করবে। নিভিয়ে দিলেই আবার যে কে সেই। কে, পি, সাহার দোকানে পাওয়া যায়। প্রায় দু’শো টাকা দাম। মিহিরবাবুকে প্রেজেন্ট করব। বলব স্যার, এ গিফট ফ্রম কিকিরা দ্য গ্রেট ম্যাজিশিয়ান।” বলে কিকিরা হাসতে লাগলেন। তাঁর হাসির গুঢ় অর্থটা বোঝা গেল না।
.
০৯.
ইভনিং ক্লাবের ওপর দিন দুই নজর রাখার চেষ্টা করল তারাপদরা। পার্কের গায়েই বাড়ি। পুরনো আমলের। ভাঙা ফটক, বিশ-ত্রিশ হাত মাঠ, দু-চারটে মামুলি ফুলগাছ, সিঁড়ি–তারই এপাশে-ওপাশে নানান কারবার। কোথাও ফ্রিজ মেরামতি হয়, কোথাও বাঁধাইখানা, একপাশে এক ছোট ছাপাখানা, মায় সাইনবোর্ড লেখার দোকানও। ছাপোষা ভাড়াটেও আছে। ওই বাড়ির ভেতরে কোথায় কী আছে বোঝা অসম্ভব। বাড়িও বড়। দোতলা। দোতলার একপাশে হলঘরের মতন ঘরে ইভনিং ক্লাবের আসর। অন্যপাশে এক সিনেমা কোম্পানির অফিস। পেছন দিকে হয়ত ভাড়াটে, গুদাম সবই আছে।
তারাপদ দোতলায় যায়নি, নিচে ছিল। চন্দন গিয়ে দেখে এল ওপরটা। এসে বলল, “এ বাড়িতে কাউকে খুঁজে বের করা কঠিন। হরদম লোক আসছে-যাচ্ছে।”
কথাটা মিথ্যে নয়। তবে সন্ধের পর লোকের আসা-যাওয়া কম। কাজ কারবারের জায়গাগুলো তখন বন্ধ হয়ে যায়। প্রেসটা খোলা থাকে রাত সাতটা-আটটা পর্যন্ত।
বাড়ির সামনে ঘোরাঘুরি না করে বাড়িটার মুখোমুখি পার্কে বসেই প্রথম দিন নজর রাখল তারাপদরা। কোনো লাভ হল না। বোঝাই যায় না, কারা ইভনিং ক্লাবে রিহার্সাল দিতে আসছে। তবে দোতলা থেকে ক্লাব ঘরের হল্লা মাঝে-মাঝে পার্ক পর্যন্ত ভেসে আসছিল।
প্রথম দিন মিহিরবাবু বেরোলেন পৌনে ন’টা নাগাদ। সঙ্গে আরও তিন-চারজন লোক। মিহিরবাবুর শাগরেদ। ক্লাবের লোক। খানিকটা গল্পগুজব সেরে মিহিরবাবু রিকশায় উঠলেন। দ্বিতীয় দিনে মিহিরবাবুর বেরোতে-বেরোতে নটা।
চন্দন বিরক্ত হয়ে উঠেছিল। বলল, “দুর, এ হয় নাকি? রোজ এ ভাবে পার্কে এসে বসে থাকা যায়?”।
তারাপদ গা এলিয়ে বসে সিগারেট খাচ্ছিল। ঠাট্টা করে বলল, “পার্কে লোকে হাওয়া খেতেই আসে। কত লোক বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত বসে আছে দেখছিস না! আমরা তো লেটে আসি।”
