তারাপদ উঠে গেল ফোটো দেখতে। কিকিরার কাছে সে মোহনের ফোটো দেখেছে। সামান্য কৌতূহল হচ্ছিল অভিনেতা মোহনকে দেখতে।
কিকিরা কথা বলছিলেন মিহিরবাবুর সঙ্গে। বললেন, “ঘটনাটা সম্পর্কে আপনার কী মনে হয়?”
মিহিরবাবু চুপ করে থাকলেন প্রথমে একটা সিগারেট ধরিয়ে নিলেন। সামনের দিকে ঝুঁকে পড়লেন খানিকটা। পরে বললেন, “দেখুন কিকিরামশাই, দত্ত-ফ্যামিলি আমাদের প্রতিবেশী। তিন-চারপুরুষ ধরে একই পাড়ায় আছি। খানিকটা তো ওদের কথা জানি। একসময় দত্তরা বেশ ধনী ছিল। পরে অবস্থা খানিকটা পড়ে যায়। রামকৃষ্ণদা আর শ্যামকৃষ্ণদা ছাপাখানার ব্যবসাটাকে বাড়িয়ে আবার দাঁড়াবার চেষ্টা করেছিল। একেবারে যে আনসাকসেসফুল, হয়েছিল তাও নয়। পরে যে কী হয়েছিল আমি বলতে পারব না, তবে রামদা শ্যামদা মারা যাওয়ার পর থেকেই ব্যবসা পড়ে যাচ্ছিল। শুনেছি, লোচন বিস্তর দেনা করেছে। ছাপাখানার মেশিনপত্রও সে বেচে দিয়েছে দু-একটা। …ওদের ভেতরকার ব্যাপারে আমি মাথা গলাতে যাইনি। আমার এক পুরনো মক্কেলের কাছে জানতে পারলাম, লোচন বেনামে জমি কিনেছে বেহালায়, সেখানে নাকি একটা সিনেমা হাউসও করতে গিয়ে ফেঁসে গেছে।”
“লোচনবাবুর কি অনেক দেনা?”
“বলতে পারব না। খানিকটা দেনা তো আছেই।”
“সম্পত্তির ভাগীদার কি দুই ভাই?”
“হ্যাঁ। সমান-সমান।”
“মোহন তো পোষ্যপুত্র?”
“তা হোক। রামকৃষ্ণদা তাঁর স্বােপার্জিত সমস্ত কিছু মোহনকে দিয়ে গিয়েছেন।”
“আপনি জানেন?”
“জানি। …আরও জানি, লোচন তাদের পৈতৃক বাড়ির সামনের জমিটুকু বেচে দেওয়ার জন্যে হালাল লাগিয়েছে।”
“কবে থেকে?”
“হালে।”
কিকিরা বললেন, “মোহনের মৃত্যু সম্পর্কে আপনার কী মনে হয়?”
মিহিরবাবু মাথা নাড়লেন। যেন বলতে চাইলেন, তিনি আর কী বলবেন?
“মোহন মারা গিয়েছে?” কিকিরা বললেন।
“তাই শুনেছি।”
“আপনি কি নিশ্চিত?”
“অফিসিয়ালি মৃত বলতে পারেন।”
“তবে এই লোকটা কে? এই যে ফোন করছে, চিঠি লিখছে, তুলসীবাবুর সঙ্গে দেখা করছে, এ কে?”
মিহিরবাবু কিছু বললেন না।
তারাপদ ডাকল, “একবার এদিকে আসবেন, স্যার?”
কিকিরা উঠে গেলেন।
তারাপদ বলল, “বিষের ধোঁয়া’ নাটকের গ্রুপ ফোটো। মোহনকে চিনতে পারেন? আমি তো পারলাম না।”
কিকিরা দেখলেন। নাটক শেষ হওয়ার পর পাত্রপাত্রীরা যে-যেমন সাজ পরেছিল, মেক-আপ নিয়েছিল–সেই পোশাক আর বেশবাস নিয়েই ফোটোটা তোলা। কিকিরা খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখলেন। চিনতে পারছিলেন না। শেষ পর্যন্ত এক দাড়িওয়ালা বুড়োটে গোছের লোক দেখে তাঁর সন্দেহ হল। কাঁধে কাপড়ের মস্ত ঝোলা নিয়ে যারা পাড়ায় পাড়ায় পুরনো খবরের কাগজ কিনে বেড়ায়–অবিকল সেই বেশ। মাথায় গামছা বাঁধা। অর্ধেকটা কপাল ঢাকা পড়েছে গামছায়।
কিকিরা বললেন, “এই কাগজঅলা।” বলে মিহিরবাবুর দিকে তাকালেন ঘুরে গিয়ে। “এই কাগজঅলা মোহন? বেশ মেক-আপ নিয়েছে তো?
মিহিরবাবু হাসছিলেন। মাথা নাড়লেন। বললেন, “না।আপনি ভুল করলেন। ম্যাজিক চলল না মশাই। ওই ফোটোর মধ্যে একজনকে দেখুন-ক্লাউন সেজে দাঁড়িয়ে আছে। ও-ই মোহন। …ওকে দিয়ে সার্কাসের ক্লাউনের ছোট্ট পার্ট করিয়েছিলাম।”
কিকিরা আবার ছবি দেখলেন, বাঃ বললেন। “চেনা যায় না। ঠকে গেলাম।” বলে নিজের জায়গায় ফিরে এলেন। বসলেন। বললেন, “এই জাল মোহনের আবিভাব কেন স্যার বলতে পারেন?”
মিহিরবাবু হেসে বললেন, “গোয়েন্দা আপনি। আমি কী বলব?”
কিকিরা একদৃষ্টে মিহিরবাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন, বোধ হয় লক্ষ করছিলেন কিছু। শেষে বললেন, “আমারও ধারণা মোহন মারা গিয়েছে। কিন্তু সে বোধ হয় পা পিছলে পড়ে যায়নি, তাকে পাহাড়ের বিশ্রী জায়গা থেকে ঝরনার মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছে। জলের স্রোতের সঙ্গে মোহন নিচে গড়িয়ে গিয়েছে।”
মিহিরবাবু কোনো কথা বললেন না। শুনলেন। তাঁর চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হল।
কিকিরা নিজেই বললেন, “এ কাজ লোচন ছাড়া অন্য কেউ করতে পারে না।
“কেন?”
“মোহন যখন পড়ে যায় তখন তার পাশে লোচন ছাড়া কেউ ছিল না। অন্য দু’জন–লোচনের মেজো শ্যালক আর মোহনের বন্ধু খানিকটা পেছনে ছিল। ঝোঁপঝাড় পাথরের আড়ালও থাকতে পারে। তারা কিছু দেখতে পায়নি।”
কিকিরার কথা শেষ হওয়ার আগেই মিহিরবাবু বললেন, “আপনার অনুমান ঠিক হতে পারে। তবে আইন অনুমানকে প্রমাণ হিসাবে গ্রাহ্য করে না। প্রমাণ কী যে, লোচন তার ছোট ভাইকে ঝরনার মধ্যে ঠেলে ফেলে দিয়েছে।”
কিকিরা স্বীকার করে নিলেন, প্রমাণ কিন্তু নেই।
মিহিরবাবু বললেন, “প্রমাণ ছাড়া কাউকে খুনি হিসাবে ধরা যায় না। প্রমাণটাই আসল। লোচন যে খুনি একথা আপনি প্রমাণ করবেন কেমন করে?” বলে একটু থেমে আবার বললেন, “নিজের সব কাজ লোচন পরিপাটি করে গুছিয়ে নিয়েছে। দেহাতি ডাক্তারের সার্টিফিকেট, আইডেনটিফিকেশন, থানা–সবই সে গুছিয়ে সেরে রেখেছে। এখন আপনি কেমন করে লোচনকে খুনি বলে সাবাস্ত করবেন?”
কিকিরা মাথার চুল ঘাঁটতে-ঘাঁটতে বললেন, “পারছি কোথায়? পারছি না স্যার। এই জিনিসটাও আমার খুব অবাক লাগছে। চার-পাঁচ বছর পরে হঠাৎ জাল মোহনের আবিভাবই কেন ঘটল। কে ঘটাল? লোচন এত ভয়ই বা পেয়ে গেল কেন যে, ত্রিশ হাজার টাকা ঘর থেকে বের করে দিতে রাজি হল?”
