কিকিরা বললেন, “বলতে পারছি না। লোকটাকে আমি দেখেছি। বাঙালি। তবে উটকো ধরনের। চেহারা দেখে গুণ্ডা বদমাশ মনে হয় না। আহাম্মক মনে হয়।”
“ও বাঙালি, আপনি কেমন করে বুঝলেন?”
“ঘাড়ের ওপর এসে পড়েছিল। আমি সামলে নেওয়ার পর ও নিজেও সামলে নিল নিজেকে। তারপর “সরি’ বলে ছুটে গিয়ে ট্রামে উঠে পড়ল। “
“সরি কি বাংলা শব্দ, স্যার?”
“আজকাল সবাই সরি বলে। বাজারের মাছঅলারাও। ওর “ছরি’ বলা শুনে বাঙালি মনে হল।”
তারাপদ বলল, “ছেড়ে দিন বাঙালি-অবাঙালি! আদত কথাটা কী তাই বলুন? কী মনে হয় আপনার? এই উড়ো চিঠির মানে কী? লোচন কি আপনাকে নিয়ে খেলা করছে?”
কিকিরা কিছু বললেন না।
চন্দন বলল, “স্যার, আমার পরামর্শ হল–আপনি আর একলা-একলা খোঁড়া পা নিয়ে ঘোরাফেরা করবেন না। সঙ্গে আমাদের রাখবেন। তারাকে সঙ্গে না নিয়ে কোথাও যাবেন না। নেভার।”
কিকিরা বললেন, “কাল একবার মিহিরবাবুর কাছে যাব। তারাপদকে সঙ্গে নিয়েই।”
.
০৭.
মিহিরবাবু মানুষটিকে দেখলে খোলামেলাই মনে হয়। চেহারাটি ভালই, কিন্তু মাথায় সামান্য খাটো, একটু নধর গোছের। মাথার চুল পাকেনি। সামান্য টাক পড়তে শুরু হয়েছে। গোলগাল মুখ। চোখে চশমা। পান-জদা-সিগারেট–কোনোটাই বাদ যায় না। কথা বলেন অনর্গল। তবে তারই মধ্যে যা নজর করার করে নিতে পারেন। বাইরে বোঝা যায় না; ভেতরে তিনি কিন্তু বুদ্ধিমান এবং চতুর। গায়ে পাতলা একটা চাদর মতন থাকে। কাটা হাতটাকে ঢেকে রাখেন।
কিকিরা আর তারাপদকে তিনি খানিকটা বাজিয়ে নিলেন প্রথমে। কিকিরাও কম যান না। কথা বলার ভঙ্গিতে তিনি মিহিরবাবুকে হাসিয়ে ছাড়লেন। দু-একটা খুচরো ম্যাজিক দেখিয়ে দিলেন সামনে বসে। লাইটার উড়িয়ে দিলেন টেবিল থেকে, আবার যথাস্থানে রেখে দিলেন। মিহিরবাবুর লাইটারের শখ রয়েছে। দু-দুটো লাইটার সামনেই পড়ে ছিল। সিগারেটের প্যাকেটও।
মিহিরবাবু যে-ঘরে বসে ছিলেন, সেটি তাঁর নিজস্ব বৈঠকখানা। সাজানো-গোছানো। দেওয়ালে ‘ইভনিং ক্লাবে’র নাটকের ফোটো, একপাশে দুটো কাপ। শিশির ভাদুড়ীর বড় ছবি একটা। বইয়ের আলমারিতে ঠাসা বই আর বাঁধানো মাসিক পত্রিকা। আইনের বই একটাও নেই।
চা খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। মিহিরবাবু পান বিলি করলেন কিকিরাদের। নিজেও পান-জদা মুখে পুরে এবার কাজের কথা পাড়লেন। বললেন, “তা মশাই, আপনি তো ম্যাজিক-মাস্টার। হঠাৎ এই গোয়েন্দাগিরিতে নামলেন কেন?”
কিকিরা অমায়িক হাসি হেসে বললেন, “ইচ্ছে করে নামিনি, স্যার। এই যে আমার লেজুড়টিকে দেখছেন, এর পাল্লায় পড়ে হেভেন থেকে ফল করতে হয়েছে।”
“ফল?”
“আজ্ঞে, ফ্রম ম্যাজিক টু গোয়েন্দা। জাদুবিদ্যা থেকে পাতি গোয়েন্দাগিরিতে পড়ে যেতে হল।”
মিহিরবাবু হেসে উঠলেন। “আচ্ছা। ফল ফ্রম ম্যাজিক। ..তা আমাদের ক্লাবের যে শো হচ্ছে–পুজোর পর। কালীপুজোতে। তাতে একটু খেলা দেখান না। ক্লাসিকাল ম্যাজিক। ধরুন ঘন্টাখানেক। বেশ জমে যাবে।”
কিকিরা বিনয়ের সঙ্গে বললেন, “আমি আর খেলা দেখাই না। বাঁ হাতটা কমজোরি হয়ে গেছে। সুইফটনেস নেই। অন্য কাউকে ব্যবস্থা করে দেব, আপনি ভাববেন না।“
নিজেদের ক্লাবের খানিকটা গুণগান গেয়ে মিহিরবাবু বললেন, “আসবেন একদিন ক্লাবে। সোমবার বাদে। কাছেই আমাদের ইভনিং ক্লাব, ওয়েলিংটন স্কোয়ারের গায়েই।”
মিহিরবাবু এবার আসল কথা পাড়লেন। বললেন, “কাজের কথা শুরু করা যাক কিঙ্করবাবু। বলুন, আমি কী করতে পারি?”
কিকিরা হেসে বললেন, “স্যার, আমায় বাবুটাবু বলবেন না। স্রেফ কিকিরা।”
“অতি উত্তম। তাই হবে।”
“আপনার কাছে আমি কেন এসেছি, আগেই আপনাকে জানিয়েছি। লোচনবাবুর নোটিস, তিরিশ হাজার টাকা পুরস্কার–সবই বলেছি…।”
“হ্যাঁ, কাগজে আমি দেখেছি।”
“নোটিসের বয়ানটা কি আপনি করে দিয়েছিলেন?”
“না। মনে হয় অন্য কাউকে দিয়ে করিয়েছে, নিজেও করতে পারে।”
“লোচনবাবু আপনার কাছে এর মধ্যে ক’বার এসেছেন?”
মিহিরবাবু পান চিবোতে-চিবোতে বললেন, “নিজে একবারও নয়ন আমিই ওকে ডেকে পাঠিয়েছিলাম, তখনই এসেছিল; তারপর আর নয়।
“মোহনের কথা বলতে ডেকে পাঠিয়েছিলে?”
“হ্যাঁ। চিঠি দেখালাম।”
তারাপদ চুপ করে বসে কথা শুনছিল। হঠাৎ বলল, “মোহনবাবু কেমন লোক?”
মিহিরবাবু পিঠ সামান্য সোজা করে বসলেন। বললেন, “খাসা ছেলে। চমৎকার। অতি চমৎকার। ভদ্র, বিনয়ী, হাসিখুশি। আমার ইভনিং ক্লাবের একজন ইম্পট্যান্ট মেম্বার। আমার এক চেলা। আমাদের রিলেশানটা ছিল বড় ভাই ছোট ভাইয়ের মতন; যদিও সম্পর্কে খুড়ো-ভাইপো। ও আমাদের অনেক কাজ করত। থিয়েটারের আগে স্টেজ ভাড়া, সেট সেটিংয়ের ব্যবস্থা, সুভেনির ছাপা–অনেক কাজ রে ভাই। জুতো সেলাই থেকে চণ্ডী পাঠ।”
“নিজে কি অভিনয় করত?”
“না। একবার মাত্র করেছে,” বলে দেওয়ালের দিকে আঙুল দেখালেন। বললেন, “আমরা জুবিলি ইয়ারে একটা ড্রামা করেছিলাম। ডিটেকশান স্টোরি। গোয়েন্দা গল্পের নাটক। ইংরিজি নাটক থেকে গল্পটা নিয়েছিলাম। আমিই লিখেছিলাম নাটকটা। নাম ছিল “বিষের ধোঁয়া’। শরদিন্দু বাঁড়জ্যের একটা নভেল আছে ওই নামে। সেটা নয়। নামেই যা মিল। নাথিং এলস।…ইয়ে, কী বলছিলাম–সেই নাটকে মোহনকে দিয়ে জোর করে একটা পার্ট করিয়ে দিলাম। সামান্য পার্ট। যাও না ভাই, দেওয়ালে টাঙানো ছবিটা দেখো। গ্রুপ ফোটো।”
