চন্দন বলল, “তা সে দিল্লি চলে গেল কেন?”
“চাকরি পেয়েছিল। একটা ম্যাগাজিনে। ইংরিজি ম্যাগাজিন।”
“এখনো দিল্লিতে?”
কিকিরা মাথা নাড়লেন সাবধানে। “না, দিল্লিতে নেই।”
“কোথায় সে?”
“দিল্লির ঠিকানা যে বন্ধু জানত, সে বলল–মাস কয়েক আগেও অমলেন্দু দিল্লিতে ছিল। চিঠি পেয়েছে তার। তারপর চিঠিপত্র আর পায়নি। খবর নিয়ে জেনেছে দিল্লিতে সে নেই।”
বগলা চা নিয়ে এল।
তারাপদদের চায়ের কাপ এগিয়ে দিল। বলল, পরে খাবার আনছে।
কিকিরা বললেন, “মোহনের খুবই বন্ধু ছিল অমলেন্দু। সকলেই বলল। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না, লোচন দত্ত এই ছোকরার কথা অনেক কিছু চেপে গেল কেন? অমলেন্দুর কথা সে ভালো করেই জানত। জানে। অথচ এমন ভাব করল লোচন, যেন সে ভাল করে চেনেই না অমলেন্দুকে।”
চন্দন বলল, “অমলেন্দু যে দিল্লি চলে গেল–এটা কি সত্যি-সত্যি চাকরি পেয়ে? না, সে সরে গেল?”
“মানে? কী বলতে চাইছ?”
“বলছি, লোচন কি তাকে সরাবার ব্যবস্থা করল? ..যদি করে থাকে, কেন করল?”
কিকিরা বললেন, “সেটাই তো কথা হে! মোহন মারা যাওয়ার পর একজন গেল চা বাগানে, আর-একজন দিল্লিতে। এই দুজনেই বড় সাক্ষী। লোচন না হয় নিজের শ্যালকটিকে সরাল, অমলেন্দুকে সরাল কেমন করে?”।
তারাপদ বলল, “স্যার, লোচন এ-সব করবে কেন? করতে পারে, যদি সে দোষী হয়!”
“তা তো ঠিকই।”
“আপনি তবে বলছেন লোচন দোষী?”
কিকিরা বললেন, “মুখে বললে তো হবে না, প্রমাণ চাই। আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি, লোচনের মেজো শ্যালক কাজকর্ম তেমন কিছু করত না। লোচন তাকে নিজেদের বাড়ির কাজকর্মে খাটাত। তা শ্যালককে না হয় সে সরিয়ে দিল চা বাগানে। দিতেই পারে। শ্যালক তো তার ভগিনীপতির স্বার্থ দেখবে। কিন্তু অমলেন্দু? এটা আমি বুঝতে পারছি না। সে নিজেই চলে গেল কাজ পেয়ে? না, লোচন তাকে টাকাপয়সা দিয়ে বশ করল?”
চন্দন বলল, “তা আপনার পুরো হিসাবটাই হল, আপনি লোচনকে কালপ্রিট ভাবছেন?”
“হ্যাঁ।”
“যদি সে দোষী না হয়?”
“বলতে পারছি না। লোচনকে আমি সন্দেহ করছি। সে অনেক মিথ্যে কথা বলেছে। বেড়াতে যাওয়ার প্ল্যানটা লোচনই করেছিল।”
“কে বলল?”
“লোচন নিজেই বলেছে। প্রথমে সে অন্য কথা বলছিল। কথায়-কথায় স্বীকার করে ফেলল, বেড়াতে যাওয়ার কথাটা তার মাথাতেই এসেছিল।”
“জায়গাটাও কি সে বেছে নিয়েছিল?”
“না বোধ হয়। তবে, যেখানেই যাক, তার একটা মতলব থাকতে পারে। সে শুধু সুযোগ খুঁজছিল। কোনোরকমে একটা সুযোগ পেলে সেটা কাজে লাগাবার চেষ্টা করবে।”
“আপনি স্যার, লোচনকে বড় বেশি সন্দেহ করছেন।”
কিকিরা মাথা হেলালেন। বললেন, “করছি, কারণ–মোহন মারা গেলে একমাত্র লোচনেরই লাভ। পুরো বিষয়-সম্পত্তি, ছাপাখানার মালিকানা তার। স্বার্থ তার। সন্দেহ তাকে ছাড়া অন্য কাকে করব?”।
চন্দন বলল, “কিন্তু যদি এমন হয়–এটা সত্যিই দুর্ঘটনা, মোহন অসাবধানে ছিল, পা হড়কে পড়ে গিয়েছে! নিত্যদিন কত অ্যাকসিডেন্ট হচ্ছে, আমরা তার কিছু খোঁজ তো রাখি। সাধারণ ব্যাপার, তবু অ্যাকসিডেন্ট হয়ে গেল।” বলে চন্দন একটু থামল, চা খেল দু চুমুক, তারপর হঠাৎ বলল, “এই যে আপনি ট্রামের চাকার তলায় চলে যাচ্ছিলেন, বরাতজোরে বেঁচে গেলেন, যদি বরাত একটু মন্দ হত–কী অবস্থা দাঁড়াত, স্যার?”
কিকিরা একটু হাসলেন। পকেটে হাত ডুবিয়ে বললেন, “আমার বাড়িতে কে বা কেউ একটা ফ্লাইং লেটার ফেলে গিয়েছে।”
“ফ্লাইং লেটার…!” তারাপদ যেন আকাশ থেকে পড়ল।
“উড়ো চিঠি।” বলতে বলতে পকেট থেকে একটা খাম বের করে এগিয়ে দিলেন তারাপদর দিকে।
তারাপদ হাত বাড়িয়ে খামটা নিল। সাদা খাম। মুখ ছেঁড়া। খামের ওপর কোনো নাম লেখা নেই। খামের মধ্যে একটুকরো কাগজ। তারাপদ কাগজটা বের করল। পড়ল।
“জোরে-জোরে পড়ো।”
তারপদ পড়ল “দাদু, আর নয়। নিজের চরকায় তেল দিন। বাড়াবাড়ি করলে বিপদে পড়বেন। পড়া শেষ করে সে অবাক হয়ে বলল, “এ কী! এ-চিঠি কেমন করে এল? কে দিয়ে গেল?” বলতে বলতে চিঠিটা চন্দনের দিকে এগিয়ে দিল।
কিকিরা বললেন, “আমার ফ্ল্যাটের সদর দরজার ফাঁক দিয়ে গলিয়ে দিয়ে গিয়েছে।”
“কে, কবে?”
“কে, তা জানি না। চিঠিটা গতকাল পাওয়া গেছে।”
চন্দন রলল, “এ তো মনে হচ্ছে পাড়ার মস্তান টাইপের ছেলের কাজ। দাদু–আপনাকে দাদু বলেছে।”
কিকিরা মাথার সাদা চুল ঘাঁটতে-ঘাঁটতে বললেন, “আদর করে বলেছে হে! একমাথা সাদা চুল। তা বলুক। কথাটা হল, আমি কার চরকায় তেল দিচ্ছি–এ-কথা সে জানে কেমন করে? লোচন ছাড়া অন্য যারা জানে তাদের মধ্যে রয়েছেন, অনিলবাবু, সতীশবাবু, প্রফুল্ল-ডাক্তার, তুলসীবাবু। ভবানীকে দেখিনি। আর মিহিরবাবুর সঙ্গে আমার এখনো সাক্ষাৎ-পরিচয় হয়নি।”
তারাপদ বলল, “আপনার ঠিকানা এরা সবাই জানে?”
“লোচন জানে। আর কাউকে তো ঠিকানা বলিনি।”
“এ কি তবে লোচনের কাজ? সে কোনো ভাড়াটে লোক লাগিয়েছে!” তারাপদ ধাঁধায় পড়ে গেল। তাকাল চন্দনের দিকে। বলল, “ব্যাপারটা বড় অদ্ভুত তো! লোচন নিজেই খবরের কাগজে নোটিস ছাপছে, জাল মোহনকে ধরে দিলে তিরিশ হাজার টাকা পুরস্কার দেবে বলছে, আবার সেই লোকই। কিকিরাকে ওয়ার্নিং দিচ্ছে। ব্যাপারটা কী! আমি তো কিছুই বুঝছি না।”
চন্দনও বুঝতে পারছিল না। বলল, “যে-লোকটা ট্রাম লাইনের কাছে আপনাকে ধাক্কা মেরেছিল–সে কি এইসবের মধ্যে আছে, কিকিরা?
