তুলসীবাবু কিছুই বললেন না।
কিকিরাই আবার বললেন, “আপনার কি মনে হয় কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে লোকটা এসেছিল? কিছু বলল সে?”
“না। সে আমায় একটা কথাই বারবার বলেছে। সে মোহন।”
কিকিরা কথা ঘোরালেন। বললেন, “আচ্ছা তুলসীবাবু, একটা কথা। মোহনের বয়েস হয়েছিল। সে যদি বছর পাঁচেক আগে মারা গিয়ে থাকে, তার বয়েস তখন তিরিশ ছাড়িয়ে গিয়েছে। দত্ত-পরিবারে এতদিন পর্যন্ত কোনো ছেলে কি আইবুড়ো থাকে? মোহনের বিয়ে হয়নি কেন?”
তুলসীবাবু বললেন, “কথাবার্তা হচ্ছিল। বড়দার ঠিক পছন্দ মতন মেয়ে জুটছিল না।”
কিকিরা এবার একটু হাসলেন। ইশারা করলেন তারাপদকে। উঠতে বললেন। নিজেও উঠে পড়েছিলেন। বললেন, “দত্তদের ছাপাখানার আয় কেমন?”
তুলসীবাবু বলব কি বলব-না করে বললেন, “কাজ ভালই হয়। হালে বছর কয়েক খানিকটা মন্দা যাচ্ছে। আজকাল সব পালটে যাচ্ছে মশাই। ছাপাখানাও ভাল-ভাল হচ্ছে। তা যাই হোক, পুরনোর খানিকটা কদর তো থাকেই। আমার মনে হয়, বছরে লাখখানেক টাকার বেশি বই কম আয় ছিল না। ছাপাখানা থেকে।”
“আয় তবে মন্দ কী!..আচ্ছা, ছাপাখানার ওপর-ওপর ভ্যালুয়েশন কত হবে?”
তুলসীবাবু মাথা নাড়লেন। “আমি বলতে পারব না।”
“মোহনের অবর্তমানে সমস্ত সম্পত্তির মালিক তো লোচনবাবুরা?”
মাথা নোয়ালেন তুলসীবাবু। “হ্যাঁ।”
“মোহন না থাকলে ষোলোআনা লাভটা তবে লোচনবাবুর?”
তুলসীবাবু কিছু বললেন না।
কিকিরাও আর দাঁড়ালেন না ঘরে। তারাপদকে নিয়ে বেরিয়ে এলেন।
.
০৬.
কয়েকটা দিন কিকিরা যে কোথায়-কোথায় ঘুরে বেড়ালেন তিনিই জানেন। সকাল-বিকেল দু’বেলাতেই তাঁর টহল চলছিল।
সেদিন তারাপদ আর চন্দন এল বিকেলের দিকে, এসে দেখল, কিকিরা নিজের মনে পেশেন্স খেলছেন। আসলে অভ্যাসবশে খেলছেন, মনে-মনে কিন্তু ভাবছেন কিছু। এটা তাঁর অভ্যাস। ওদের দেখে তাস গুটিয়ে নিলেন কিকিরা।
চন্দন বলল, “কী ব্যাপার, আপনি ঘরে বসে আছেন? রাউন্ডে যাননি? মানে রোদে?”
ঠাট্টা করেই কথাটা বলেছিল চন্দন। তারাপদর মুখে সে শুনেছে, কিকিরা যেন জাল মোহন ধরার জন্য খেপে গিয়েছেন। হরদম ঘুরে বেড়াচ্ছেন বাইরে। তারাপদ দুদিন এসে, দেখা পায়নি তাঁর, অপেক্ষা করে করে ফিরে গিয়েছে।
কিকিরা বললেন, “না, আজ বেরোইনি; ঘাড়ে রদ্দা খেয়েছি। ব্যথা।”
চন্দন বলল, “মানে? লোচন দত্তর পালোয়ান আপনাকে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছে।”
“না না,” কিকিরা বললেন, “লোচন কেন হবে, এক বেটা ভূত। ট্রাম থেকে নেমেছি, কোত্থেকে একটা ভূত ছুটতে ছুটতে এসে ঘাড়ে পড়ল। তারপর হতভাগা লাফ মেরে চলন্ত ট্রামে উঠে পড়ে চলে গেল।”
“সে কী? আপনি তো ট্রামের চাকার তলায় চলে যেতেন স্যার?”
“নাইন্টি পার্সেন্ট চান্স ছিল। কিন্তু লেগ ব্রেক দিলাম…।”
“লেগ ব্রেক”, চন্দন অবাক-অবাক মুখ করে বলল, “ওটা তো ক্রিকেটের ব্যাপার। আপনি কি ক্রিকেটও খেলেছেন? বোলার ছিলেন?”
মাথা নাড়তে কষ্ট হল কিকিরার, তবু সামান্য মাথা নেড়ে বললেন, “নো সান্ডাল উড, নো। সাহেবদের ওই রাবিশ খেলা আমি কখনো খেলিনি। ওর চেয়ে আমাদের গুপো ডাংগুলি অনেক ভাল। …আমি আমার পায়ের কথা বলছিলাম। লেগটায় ব্রেক মেরে নিজেকে সামলে নিলাম। হাতে লাঠিও ছিল। “
চন্দন হাসতে-হাসতে বলল, “মাঝে-মাঝে আপনার লেগের ব্রেক ফেল করে যায়, এই যা দুঃখ! খানাখন্দে গিয়ে পড়েন।”
কিকিরা বললেন, “ভগবানের রাজ্যে সবই মাঝে-মাঝে ফেল করে হে। লেগও করে হার্টও করে।”
তারাপদ জোরে হেসে উঠল। চন্দনও হেসে ফেলল।
হাসি-তামাশা শেষ হলে তারাপদ বলল, “স্যার, আপনার কথামতন আমি লোচনবাবুর বন্ধু ভবানীর খোঁজ লাগিয়েছিলাম। ক্রিক রোয়ে আমাদের অফিসের বিশ্বাসদা থাকেন। সিনিয়ার লোক। উনি বললেন, ভবানী একটা জুয়াড়ি। চারদিকে দেনা করে বেড়ায়। ওর কথার কোনো দাম নেই। লোচনকেও চেনেন বিশ্বাসদা। দুই বন্ধুতে খুব ভাব। ভবানী বোধ হয় টাকা ধার নেয় লোচনের কাছ থেকে।”
কিকিরা বললেন, “লোচনের পার্টি বলছ! তা হতে পারে।”
“মোহন নামের ভেজাল লোকটা ভবানীকে কেন ধরল বলুন তো?”
“বোধ হয় বন্ধুকে দিয়ে বলালে লোচন আরও তটস্থ হবে–এই জন্যে। আর কী হতে পারে।”
চন্দন বলল, “আপনি কোথায়-কোথায় ঘুরছিলেন? পেলেন কিছু?”
কিকিরা যে এর মধ্যে লোচনের কাছে বার দুই গিয়েছেন–ওরা জানত। দত্তদের প্রেসেও কিকিরা উঁকিঝুঁকি মেরেছেন। মোহনের ফোটোও পেয়েছেন লোচনের কাছ থেকে। এই খবরগুলো তারাপদর জানা ছিল। তারাপদর মুখ। থেকে চন্দনও শুনেছে।
কিকিরা বললেন, “দুটো কাজ করেছি। একটাও অবশ্য পুরোপুরি সারা হয়নি, তবু হয়েছে খানিকটা।”
“যেমন?”
“উকিল এবং নাটক-পাগলা মিহিরবাবুর সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। কথাও হয়েছে অল্পস্বল্প। আগামীকাল আমায় যেতে বলেছেন বাড়িতে। …কাল ওঁর ক্লাবের ছুটি। কোনো কাজ নেই।”
“দ্বিতীয়টা কী?”
“মোহনের সেই বন্ধুর খবর জোগাড় করেছি।”
তারাপদ বলল, “খবর পেয়েছেন?”
“হ্যাঁ। ওর নাম অমলেন্দু। অমলেন্দু গুপ্ত। ডাকনাম–সিতু। লোচন পুরো নামটা বলতে পারেনি। বা চায়নি। বারবার বলেছে, মোহনের ওই বন্ধুটি নতুন। সে ভাল করে চেনে না। সেবারই প্রথম তাদের সঙ্গে গিয়েছিল।”
“আপনি খবর জোগাড় করলেন কেমন করে?”
“ঘুরে-ঘুরে। মোহনের অন্য বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করে। অমলেন্দুর বাড়ির ঠিকানা ছিল দমদম চিড়িয়ামোড়। সেখানে সে একাই একটা ঘর ভাড়া করে থাকত। তার মা ছিল বর্ধমানের মানকরে। অমলেন্দু পেশায় ছিল ফোটোগ্রাফার। চাকরিবাকরি করত না। একটা দোকানে মাঝে-মাঝে বসত, আর নিজের ভোলা ছবি বিক্রি করত কাগজে, ম্যাগাজিনে। একা মানুষ, চলে যেত।”
