চন্দন আর কিছু বলল না। কিকিরা বললেন, “বলছিলাম অনিলবাবুর কথা। বাড়িতে গিয়েই ধরলাম তাঁকে। বললাম, আমি লোচনবাবুর হয়ে কাজ করছি। ভদ্রলোক আমাকে পাত্তাই দিতে চান না। পরে ফোন করলেন লোচনকে। জেনুইন পার্টি আমি। শেষে কথা বললেন।”
“কী বললেন?” তারাপদ বলল।
“বললেন টেলিফোন কল বার-দুই হয়েছে। টেলিফোনে গলা শুনে তিনি আন্দাজ করতে পারেননি ওটা মোহনের গলা কি না! এত বছর পর কারও গলার স্বর মনে রাখা অসম্ভব। তার ওপর লাইনে শব্দ হচ্ছিল। পাবলিক বুথ থেকে ফোন করছিল বোধ হয় কেউ। “
“অনিলবাবুর মোট কথাটা কী?
“বললেন, মোহন কি না তা তিনি জানেন না, তবে লোকটা লোচনদের ঘরবাড়ি পরিবার ছাপাখানা সম্পর্কে যা-যা বলল, দু-দশটা কথা, তা ঠিকই। মানে অনিলবাবু যতটা জানেন।”
চন্দন তাচ্ছিল্যের গলায় বলল, “এটা কোনো কথা হল কিকিরা? ইনফরমেশান জোগাড় করা কঠিন নাকি?”
কিকিরা বললেন, “কোনো কোনো জিনিস খুঁজে বের করা কঠিন। মানে, আমি বলছি–কোনো লোক বা বাড়ির সম্পর্কে আমরা যখন খোঁজখবর করি, ওপর-ওপরই করি। হয়ত খানিকটা খুঁটিয়েও করলাম কিন্তু সেটা কতটা হতে পারে। তোমার মা-বাবা-ভাই-বোন ঘরবাড়ি সম্পর্কে তুমি যা জানো, যতটা জানো, দেখেছ ছেলেবেলা থেকে–আমি বা তারাপদ ততটা কি জানতে পারি? পারি না।”
চন্দন বলল, “জাল মোহন কি সব কথা বলতে পেরেছে?”
“সব কথা নয়। সে-অবস্থাও ছিল না। মোহন দত্ত-পরিবার সম্পর্কে, নিজের বাবা আর কাকা, মানে লোচনের বাবা সম্বন্ধে দু-চার কথা যা বলেছে, তা ঠিক।”
“একটু শুনি?”
“যেমন ধরো সে বলেছে, তার বছর দশ বয়েসে তাকে দত্তক নেন রামকৃষ্ণ দত্ত, মানে লোচনের জ্যাঠামশাই। লোচনের বয়েস তখন দশ-এগারো। মোহন নামটা রামকৃষ্ণরই দেওয়া। আগে তার নাম ছিল গোপাল। নিজের বাবার সম্পর্কে এইটুকু তার ভাসা-ভাসা মনে আছে যে, ভদ্রলোক বড় গরিব ছিলেন, সামান্য একটা কাজ করতেন। স্ত্রী মারা গিয়েছিলেন। …তা রামকৃষ্ণর বন্ধু ছিলেন ভদ্রলোক। গোপালের নিজের বাবার টিবি রোগ হয়। বাড়াবাড়ি। উনি মারাও যান। মারা যাওয়ার আগে রামকৃষ্ণকে বলেন, গোপালকে দত্তক নিয়ে নিতে। রামকৃষ্ণর ছেলেপুলে ছিল না। তিনি এবং তাঁর স্ত্রী গোপালকে দত্তক নিয়ে নেন। পোষ্যও বলতে পারো।”
তারপদ বলল, “অনিলবাবু এ-সব জানেন?”
“জানেন। শুনেছেন।”
“আর কী বলল মোহন?”
“লোচনের বাবার অসুখের কথা। দু-দুবার এমন অসুখ হয়েছিল যে, মারা যেতে বসেছিলেন। নোচনের মা দক্ষিণেশ্বরে পুজো দিতে গিয়ে গঙ্গার ঘাটে পা হড়কে হাত-পা ভেঙেছিলেন–সে কথাও বলেছে।”
চন্দন আর তারাপদ সিগারেট ধরাল। কিকিরাও একটা চেয়ে নিলেন।
“অনিলবাবুর কী ধারণা, এই লোকটা আসল মোহন?”
মাথা নাড়তে নাড়তে কিকিরা বললেন, “না। তাঁর ধারণা লোকটা জাল।”
“আসল বলে তিনি মানতে চাইছেন না কেন?”
“যে জন্যে তোমারাও মানতে চাইছ না। মরা মানুষ কেমন করে ফিরে আসবে? মোহন যে মারা গেছে তার প্রমাণ রয়েছে হাতেনাতে। লোচন ছাড়াও বাকি দুজন তাকে মারতে দেখেছে, লোচনের মেজো শ্যালক আর মোহনের বন্ধু।”
তারাপদ বলল, “অনিলবাবু শেষ পর্যন্ত কী বলতে চাইলেন?”
“তিনি অবাক হয়েছেন ঠিকই, তবে এই ফোন করা মোহনকে ভদ্রলোক জালিয়াত জোচ্চোর ছাড়া আর কিছু ভাবতে রাজি না।”
চন্দন কোনো কথা বলল না। তারাপদও চুপচাপ।
কিকিরা নিজের থেকেই বললেন, “অনিলবাবু সেরে গেলাম সতীশবাবুর কাছে। উনি থাকেন বাগবাজারে। পৈতৃক বাড়িতে থাকেন না। বাগবাজারে একটা বাড়ির দোতলা ভাড়া নিয়ে থাকেন।”
“পৈতৃক বাড়ি কী দোষ করল?”
“সেটা কি আমি জিজ্ঞেস করতে পারি? নিজেদের ফ্যামিলির ব্যাপার। ..সতীশবাবু মানুষটি কিন্তু সজ্জন। ভাল। বছর পঞ্চান্ন বয়েস হয়েছে। একটা ওষুধ কোম্পানিতে কেমিস্ট। পরিবার বলতে স্ত্রী আর ছেলে। ছেলে কলেজে পড়ায়। বিয়ে-থা এখনো হয়নি।”
“সতীশবাবু কী বললেন?”
“বললেন অনেক কথাই। মোহনের গলার স্বর তিনি ধরতে পারেননি ঠিকই তবে দু-পাঁচটা কথা প্রমাণ হিসাবে যা বললেন, তা ঠিকই। সতীশবাবু বেশ আশ্চর্যই হলেন। উনি বললেন, দেখুন, ও-বাড়ির সব খোঁজখবর আমি রাখি না, কুটুমবাড়ির নাড়ির খবর, হাঁড়ির খবর রেখে আমার কী লাভ! তবে হ্যাঁ, আমাদের জামাইয়ের বাবা যেদিন মারা গেলেন সেদিন কলকাতা যে জলে ডুবে ছিল, তা আমার মনে আছে। ওদের ছাপাখানায় আগুন লেগে অনেক ক্ষতি হয়েছিল সেটাও আমি জানি। …এইরকম কয়েকটা কথা মোহন যা বলেছে–সতীশবাবু স্বীকার করে নিলেন সত্যি বলেই।”
“সতীশবাবুর ধারণা, এ-মোহন তবে আসল?”
“না, সে কথা তিনি কেমন করে বলবেন।”
“তবে?”
“তবে এটা তিনি স্পষ্টই বললেন, মোহন ছেলেটিকে তাঁর খুবই ভাল লাগত। হাসিখুশি ছেলে, আচার-ব্যবহার সুন্দর। চট করে নজর কেড়ে নিত। মোহন কিন্তু স্বভাবে খুব ভিতু ছিল। সাবধানী ছিল। বেপরোয়া ধরনের ছেলে সে একেবারেই ছিল না। চলন্ত ট্রামে বাসে সে লাফিয়ে উঠত কি না সন্দেহ। ময়দানে বড় খেলা থাকলে গণ্ডগোলের ভয়ে সে মাঠে যেত না। রেডিয়ো শুনত, টিভি দেখত। এই ছেলে যে কেমন করে ঝরনা-নামা দেখতে পাহাড়ের মাথায় উঠবে, উঠে অমন বিপজ্জনক জায়গায় যাবে–সতীশবাবুর তা মাথায় ঢোকেনি। বললেন, একেই বলে নিয়তির টান মশাই, নিয়তি তাকে টান ছিল…।”
