“আপনার শ্যালক আর মোহনের বন্ধু?”
“তারাও চিনেছিল।”
“মোহনকে আপনারা ওখানেই দাহ করেন?”
“হ্যাঁ। কাছেই। এক ডাক্তার পাওয়া গিয়েছিল মাইল তিনেক তফাতে। পুলিশ-থানাতেও খবর দেওয়া হয়।”
“কাগজপত্র আছে?”
“না। ডাক্তারের সার্টিফিকেট থানায় জমা নিয়ে নেয়। তার একটা কপি পরে আমি আনিয়েছি।”
“আপনার মেজো শ্যালক এখন কোথায়?”
“ডুয়ার্সে? চা বাগানে। সেখানে চাকরি করে।”
“মোহনের বন্ধু?”
“সে চলে গিয়েছিল দিল্লিতে। সেখানে চাকরি করত। তারপর কোথায় আছে আমি জানি না।”
“আপনি কি এদের কোনো খবর দিয়েছেন?”
“মেজো শ্যালককে চিঠি লিখেছি। মোহনের বন্ধুর ঠিকানা আমি জানি না। …কলকাতায় তাদের কেউ নেই।”
কিকিরা খানিকক্ষণ কোনো কথা বললেন না। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “মোহনের কোনো ফোটো হাতের কাছে আছে?”
“না, হাতের কাছে নেই। তবে ওই দেওয়ালে-ওই ছবিটা দেখতে পারেন। আমরা দুই ভাই-ই রয়েছি ফোটোতে।”
কিকিরা এগিয়ে দেওয়ালের কাছে গেলেন। ফোটোটা দেখলেন কিছুক্ষণ।
“আজ আমরা যাই। পরে আপনার কাছে আবার আসছি।” বলে কিকিরা ইশারায় তারাপদকে উঠতে বললেন।
.
০৪.
চন্দন ঘরে আসতেই কিকিরা বললেন, “কী ব্যাপার হে, নাটকের মাঝখানে তোমার আবিভাব। বলি এটা কি দাশরথি পার্টির যাত্রা।” বলে রঙ্গ করে চোখ এলে তাকিয়ে থাকলেন চন্দনের দিকে। কে যে দাশরথি তিনি বললেন না।
চন্দন মাথা মুছতে লাগল। ইলশেগুঁড়ির মতন বৃষ্টি হচ্ছে বাইরে। দু-দশ ফোঁটা জল গায়ে-মাথায় লেগেছে তার। মাথা মুছতে মুছতে চন্দন বলল, “ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়িয়ে বেড়াচ্ছেন আপনারা, আমার তো সে আহ্লাদ করার সময় নেই। ডিউটি ডিউটি ডিউটি। লাইফ হেল করে ছেড়ে দিল। ওপরঅলা গিয়েছেন দিল্লি, সেমিনার করতে, যত ঝঞ্জাট আমার। আসছে জন্মে যেন আর ডাক্তার না হই।”
“কী হতে চাও?” কিকিরা মজা করে বললেন, “কম্পাউন্ডার?”
“আজ্ঞে না, বরং ম্যাজিশিয়ান হব। ভড়কি মেরে বাজিমাত। কত হাততালি। কাগজে ছবি।”
“তাই হবে। এখন বোসো। চা-টা খাও।”
কিকিরার ঘরে তিনি আর তারাপদ। সন্ধে হয়েছে সবে। আজকের দিনটায় মোটামুটি আরাম লাগছিল। গরম নেই, ঘাম নেই, বাদলাও না থাকার মতন। শরকাল যেন পুরোপুরি দেখা দিচ্ছে।
“আপনার পা কেমন?”
“ও-কে।”
“আপনি বাইরে বেরোতে শুরু করেছেন শুনলাম?”
“এই মাঝে-মাঝে!”
“চালাকি করবেন না কিকিরা। আমি সব জানি। রবিবারে আপনি সফর করতে বেরিয়েছিলেন। গতকালও টহল মেরে এসেছেন।”
কিকিরা অমায়িক হাসি হেসে বললেন, “যাচ্চলে, আমার তো খেয়ালই থাকে না। বুড়ো হয়ে ভীমরতি হয়েছে আমার। …তা স্যান্ডেলউড, ইয়ে মানে–তিরিশ হাজার টাকার ব্যাপারটা তোমায় বলেনি তারাপদ?” কিকিরা বললেন বটে বোকা সেজে, কিন্তু তিনি জানেন, তারাপদর কাছ থেকে সব খবরই পেয়েছে চন্দন।
তারাপদ চন্দনের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসল।
চন্দন বলল, “যা ইচ্ছে আপনি করুন, স্যার। কিন্তু আপনার পায়ের দায়িত্ব আমি নিচ্ছি না। পরে যখন ব্যথায় কাতরাবেন, আমি নেই।”
কিকিরা হেসে-হেসে জবাব দিলেন, “পাগল নাকি! আমি তোমার অ্যাডভাইস ছাড়া কিছু করি নাকি? তবে কী জানো, তিরিশ হাজারের লোভটা সামলাতে পারিনি বলে দু’দিন বাড়ির বাইরে বেরিয়েছি। খুব সাবধানে। ওয়াকিং করিনি বললেই হয়, সঙ্গে ছড়ি রেখেছি। প্রথমদিন তারাপদ ছিল। …তুমি সব শুনেছ তো?”
“লোচন দত্ত শুনেছি। “
“কাল একবার উত্তরে গিয়েছিলাম। বাগবাজার আর দিনেন্দ্র স্ট্রিট।”
চন্দন বসল। বসে হাত বাড়িয়ে তারাপদর সামনে রাখা প্লেট থেকে একটা শিঙাড়া তুলে নিল।
কিকিরা নিজেই বললেন, “দিনেন্দ্র স্ট্রিটে থাকেন লোচনের মাসতুতো দাদা। অনিলচন্দ্র দেব, অনিলদা। মাসতুতো হলেও ঠিক নিজের মাসির নয়। মায়ের খুড়তুতো দিদির ছেলে। বয়েস হয়েছে। পঞ্চাশ-টঞ্চাশ হবে। অনিলচন্দ্র সেরে একবার সতীশবাবুর কাছে গেলাম। সতীশবাবু নোচনের বড় শ্যালক। থাকেন বাগবাজারে। আলাদাভাবেই থাকেন, মানে লোচনের নিজের শ্যালক হলেও, নিজেদের পৈতৃক বাড়িতে থাকেন না। ভাড়া বাড়িতে থাকেন।”
চন্দন বলল, “দেখুন কিকিরা, আমি তারার মুখের গোড়ার কথা সব শুনেছি। সব ব্যাপারে আপনি নাক গলাতে যান কেন?”
মজা করে কিকিরা বললেন, “নাক এখনো গলাইনি; শুধু গন্ধটা শুকছি। …তা ছাড়া তিরিশ হাজার ফেলনা নয় আজকের দিনে। আমি গরিব মানুষ। যদি থার্টি থাউজেন্ড পেয়ে যাই…।
“কচু পাবেন। ওসব ধাপ্পাবাজি আমি অনেক দেখেছি।”
“তুমি আগে থেকেই সব মাটি করে দিচ্ছ! কথাগুলো যদি না শোনো, ব্যাপারটার মধ্যে কী আছে বুঝবে কেমন করে?”
চন্দন আর কথা বলল না।
কিকিরা সামান্য সময় চুপ করে থেকে বললেন, “ব্যাপারটা যা ভাবছ তা নয়। এর মধ্যে সামথিং হ্যাজ…!”
বগলা চা নিয়ে এসেছিল চন্দনের জন্য। তারাপদদের চা তখনও শেষ হয়নি।
চা নিতে নিতে কিকিরার দিকে তাকাল চন্দন। বলল, “সামথিং তো সব ব্যাপারেই থাকে। তা বলে আপনি খোঁড়া পায়ে নেচে বেড়াবেন!”
কিকিরা কথাটা শুনলেন, পাত্তা দিলেন না।
চন্দন নিজের ঝোঁকেই বলল, “আমার মাঝে-মাঝে মনে হয়, আপনার উচিত ছিল ক্রিমিন্যাল প্র্যাকটিসে নেমে পড়া। বিস্তর পয়সা কামাতেন। আজকাল ও-লাইনে অনেক কদর।”
কিকিরা বললেন, “নেক্সট লাইফ, মানে পরের জন্মে চেষ্টা করব। এখন আমার কথাটা শোনো।”
