চন্দন হঠাৎ বলল, “ওর কি ভারটিগো রোগ ছিল? তা থাকলে মাথা ঘুরে যেতে পারে।”
কিকিরা বললেন, “সে-খবর নিইনি।”
তারাপদ বলল, “সতীশবাবুর কথা থেকে কি আপনার মনে হল, ওঁর মনে কোনো সন্দেহ আছে?”
“সন্দেহের কথা কেমন করে বলবেন! তবে আমার মনে হল, ব্যাপারটা এমনই যে, সতীশবাবু মনে-মনে মেনে নিতে পারেননি।”
“লোচন সম্পর্কে বললেন কিছু?”
“না। নিজের ভগিনীপতি সম্পর্কে চুপচাপ দেখলাম। বেশি কিছু বললেন। হয়ত এড়িয়ে গেলেন।”
চন্দন বলল, “আপনার কী মনে হচ্ছে?”
“ভাবছি। এখনো অনেকের সঙ্গে দেখা করা বাকি। দেখি কোথাকার জল। কোথায় গড়ায়। মুশকিল কী জানো চাঁদু, যে দু’জন বড় সাক্ষী ছিল, তাদের একজন এখন চা বাগানে, অন্যজন বেপাত্তা। ঘটনা যে সময় ঘটেছে তখন ওরা ওখানে ছিল। ওরাই বলতে পারে।”
বাধা দিয়ে তারাপদ বলল, “স্যার, অন্য দু’জন কাছে ছিল কিন্তু পাশে বা গায়ের কাছে ছিল না। আমার যতদূর মনে হচ্ছে লোচন সেই রকমই। বলেছিল।”
চন্দন বলল, “সতীশবাবুর কী ধারণা, এই লোকটা মোহন হলেও হতে পারে?”
“না। তা নয়; তবে তিনি ধোঁকা খেয়েছেন। …মরা মানুষ ফিরে আসে না–এটা সবাই বোঝে। কথা হল, মোহন সত্যিই মারা গিয়েছে কি না?”
“সতীশবাবুরও সন্দেহ রয়েছে?”
“বাইরে প্রকাশ করলেন না, ভেতরে মনে হল, কোনো একটা সন্দেহ আছে।”
চন্দন আর তারাপদ পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল।
কিকিরা তাঁর মচকানো পায়ের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়ালেন। দেখলেন নিজে। দেখালেন চন্দনকে, “হাঁটতে পারি। ব্যথা কম। বেশি হাঁটাচলা করলে ব্যথা বাড়ে।”
“আপনি তা হলে বেশি হাঁটাচলা করছেন?”
হাসলেন কিকিরা, ছেলেমানুষ যেমন করে মিথ্যে গল্প সাজায়, অবিকল সেইভাবে বললেন, “না, কোথায়? রিকশায়-রিকশায় ঘুরি। আজকাল আবার অটো বেরিয়েছে।” বলে অন্য কথায় চলে গেলেন। “কাল আমি তুলসীবাবুর কাছে যাব। পটুয়াটোলা লেন। উনি ম্যানেজার ছিলেন দত্ত কোম্পানির ছাপাখানার। তুলসীবাবুই একমাত্র লোক যিনি জাল মোহনকে সামনাসামনি দেখেছেন। দেখি তিনি কী বলেন?”
“আরও তো আছে।”
“হ্যাঁ, ভবানী আর সেই উকিল মিহিরবাবু, থিয়েটার পাগলা।”
“সবই কি একদিনে সারবেন?”
“তা বোধ হয় হবে না। দেখি! একটা কথা আমায় বড় ভাবাচ্ছে হে! তোমরা নিশ্চয় লক্ষ করেছ, যে দু’জন লোক লোচনদের সঙ্গে ছিল তখন-মানে ঘটনার সময়, তাদের কেউ আর কলকাতায় নেই। একজন চলে গিয়েছে চা বাগানে, অন্যজন কোথায় কেউ জানে না। তার চেয়েও যা আশ্চর্যের ব্যাপার, লোচনের মেজো শ্যালক আগে কলকাতাতেই থাকত। ঘটনার পর সে চা বাগানে চলে গিয়েছে চাকরি নিয়ে। সতীশবাবুই আমাকে বললেন। মোহনের বন্ধু সম্পর্কে অবশ্য তিনি কিছু জানেন না। আমি ভাবছি, এই দুটো লোককে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, না, তারা নিজেরাই সরে গেছে। লাখ টাকার প্রশ্ন হে! জবাবটা কে দেবে?”
.
০৫.
পরের দিন কিকিরা এলেন তুলসীবাবুর বাড়ি। সঙ্গে তারাপদ। বিকেল শেষ করেই এসেছেন।
পটুয়াটোলা গলির যে বাড়িতে তুলসীবাবু থাকেন–তার চেহারা দেখলে মনে হয়, বাড়িটা এই বুঝি ভেঙে পড়বে। ওই বাড়িতেই তিন-চার ঘর ভাড়াটে। তুলসীবাবু থাকেন দোতলার একপাশে।
তুলসীবাবু যে-ঘরে থাকেন সেই ঘরেই কিকিরাদের বসতে হল। একটা খাট, টেবিল, চেয়ার আর বেতের মোড়া। কাঠের এক আলমারি একপাশে। ঘর ছোট, জানলা মাঝারি। দরজা-জানলার পাল্লায় রং বলে কিছু নেই আর। দেওয়ালে চুনের চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায় না।
তুলসীবাবু কলঘরে গিয়েছিলেন, ফিরে এলেন।
মানুষটির যত না বয়েস হয়েছে তার চেয়েও বুড়োটে দেখায়। রোগা চেহারা, মাথার চুল সাদা, চোখে গোল-গোল চশমা। পরনে ধুতি আর গায়ে ফতুয়া।
পাখা চলছিল, আলোও জ্বালা ছিল।
কিকিরারা উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার জানালেন।
তুলসীবাবু ভাল দেখতে পান না। ছানিকাটানো চোখটা প্রায় অন্ধ। ঠাওর করে দেখতে-দেখতে বললেন, “কে আপনারা?”
কিকিরা নিজেদের পরিচয় দিলেন। বললেন, লোচনবাবুর মুখ থেকে ওঁর কথা শুনে তাঁরা আসছেন।
তুলসীবাবু সরল মানুষ, ঘোর-পাঁচ বড় বোঝেন না। বললেন, “বড়দা পাঠিয়েছে?”
কিকিরা বললেন, “না, তিনি পাঠাননি। তাঁর মুখে আপনার কথা শুনে আসছি।”
“ও! তা আমি কী করতে পারি?”
“আপনি খবরের কাগজ দেখেন?”
“দেখি। পড়তে কষ্ট হয়। আতস কাঁচ চোখে লাগিয়ে পড়ি খানিকটা।”
কিকিরা কাগজের নাম বললেন। পকেটে ছিল একটা পুরনো কাগজ। বললেন, “লোচনবাবু কাগজে একটা নোটিস ছেপেছেন। জানেন আপনি? না, পড়ব! কাগজ সঙ্গে করে এনেছি।”
তুলসীবাবু মাথা নাড়লেন। “আমি দেখেছি। প্রাণকেষ্টও আমাকে বলেছে। “
“প্রাণকেষ্ট কে?”
“ছাপাখানায় কাজ করে। পিয়ন। সে কাছাকাছি থাকে। প্রায়ই আসে আমার কাছে। সে বলছিল।”
“তা হলে তো আপনি সবই জানেন।”
“ওটা জানি।”
“লোচনবাবু বলছিলেন, মোহন নাম নিয়ে একজন আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল।
মাথা নাড়লেন তুলসীবাবু, “এসেছিল। আমি তো একটা চিঠি লিখে প্রাণকেষ্টর হাত দিয়ে বড়দাকে পাঠিয়ে দিয়েছি।”
“যে এসেছিল সে কি মোহন?”
তুলসীবাবু খাটের ওপর বসেছেন ততক্ষণে। ভদ্রলোকে অভ্যেস হল হাঁটু মুড়ে আসন করে বসা। সেইভাবেই বসেছেন। হাতে গামছা। ছোট। বোধ হয় ভিজে। পায়ের চেটো মোছাও তাঁর অভ্যাস। পা মুছতে মুছতে বললেন, “চোখে ভাল দেখি না। ঘরের বাতিটাও জোরালো নয়। যে-ছেলেটি এসেছিল তাকে দেখে ছোড়দা বলেই মনে হচ্ছিল। বুঝতে অসুবিধেই হয়। গালে দাড়ি রেখেছে। চোখে চশমা। ক’ বছর পরে আচমকা দেখা। ছোঁড়া নেই জানি, হঠাৎ তাকে দেখবই বা কেমন করে? ভূত বলে চমকে উঠতে হয়। যথার্থ কথা বলতে কী–আমি এমনই হকচকিয়ে গিগেছিলাম যে, ভাল করে কিছু বুঝিনি।”
