“মিশাইয়ের নাম?”
“কিরকিশোর রায়।” বলে কিকিরা তারাপদকে দেখালেন, পরিচয় করিয়ে দিলেন। তারপর সরল গলায় বললেন, “লোকে আমাকে কিকিরা বলেই জানে।”
“কী? কিকিরা?” লোচন অবাক।
“কিঙ্কর-এর কি, কিশোর-এর কি, আর রায়-এর রা।” কিকিরা মজা-মজা মুখ করে হাসলেন।“আজকাল সবাই ঘোটর ভক্ত। ফ্যান্টাসটিক-কে বলে “ফ্যান্টা’, ওয়ান্ডারফুল-কে “ওয়ান্ডা। নামের বেলাতেও তাই। ডিপি, বিবি, কেজি। বড় নাম বারবার বলতে কষ্ট হয়।”
“আচ্ছা-আচ্ছা! তা মশাইয়ের কী করা হয়? কিকিরা অমায়িক মুখ করে হাসলেন। “আমার পেশা বলে কিছু নেই। একসময় ম্যাজিক দেখাতাম। লোকে বলত, “কিকিরা দ্য ওয়ান্ডার’। এখন আর ওসব বিদ্যে জাহির করি না। একটা বই লিখছি প্রাচীন ভারতের ইন্দ্রজাল বিদ্যা। …সেকালে নানা শাস্ত্রে কাব্যে…”
কিকিরাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে লোচন বিরক্ত হয়ে বলল, “না না, প্রাচীন ইন্দ্রজাল- টিন্দ্রজাল আমি ছাপব না।” বলে বেশ কঠিনভাবে কিকিরার দিকে তাকাল। “আপনি বললেন, কাগজ দেখে এসেছেন। এখন বলছেন ইন্দ্রজাল…! আশ্চর্য ব্যাপার মশাই। আমি ইন্দ্রজাল দেখার জন্যে গাঁটের পয়সা খরচ করে কাগজে নোটিস ছাপিনি।”
কিকিরা হাসি-হাসি মুখেই বললেন, “আজ্ঞে না। আমি বই ছাপাবার জন্যে আপনার কাছে আসিনি! আমি জানি, আপনি ছাপাখানার ব্যবসা করেন।”
“হ্যাঁ। আমাদের সত্তর বছরের ব্যবসা। দত্ত অ্যান্ড সন্স।”
“বিখ্যাত ছাপাখানা। ফেমাস! ধর্মতলায় আপনাদের বিরাট প্রেস। আপনারা বিশাল বিশাল কাজ করতেন। সরকারি, বেসরকারি। একবার সি আর দাশের স্পিচ ছেপেছিলেন, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির অভিভাষণ…”
লোচন কেমন অবাক হয়ে গেল। হ্যাঁ করে কিকিরাকে দেখছিল। ও
তারাপদ মনে-মনে হাসছিল। কিকিরা অতি চতুর। আসার আগে লোচন দত্তর কাজ কারবারের খোঁজ করে নিয়েছেন তবে। অবশ্য যত না খোঁজ করছেন তার চেয়ে বেশি গুল-গাপ্পা ঝাড়ছেন লোচন দত্তর কাছে। সি আর দাশ, শ্যামাপ্রসাদ-বোধ হয় বাজে কথা।
লোচন বলল, “সি আর দাশের কথা আপনি জানলেন কেমন করে?”
“আপনি জানেন না?” কিকিরা যেন কতই অবাক।
“আমার বাবা জানতে পারতেন। আমি কেমন করে জানব। ..তবে হ্যাঁ আমাদের প্রেসের অফিসঘরে কয়েকটা সার্টিফিকেট টাঙানো আছে। বড় বড় কাজকারবার যখন করেছি, সার্টিফিকেট পেয়েছি। দু-একটা ফোটোও আছে। নেতাজি একবার আমাদের প্রেসে এসেছিলেন। ইয়ে–কী নাম যে, অ্যাক্টর-ওই যে, আহা কী যেন নামটা..”
“শিশিরকুমার!”
“না না, শিশির ভাদুড়ী নন, মিত্তির, মিত্তির।”
“নরেশ মিত্তির।”
“তাঁরও ফোটো আছে। জ্যাঠামশাইয়ের বন্ধু ছিলেন।”
কিকিরা আড়চোখে তারাপদকে দেখলেন।
লোচন বলল, ছাপাখানার কথা থাক। ছাপাখানার জন্যে আমি কাউকে ডাকিনি।”
“জানি স্যার। আপনি মোহনবাবু সম্পর্কে খোঁজ-খবর চান।”
“হ্যাঁ।”
“আমি আদতে ম্যাজিশিয়ান হলেও মাঝেসাঝে এই ধরনের খোঁজখবর রাখার কাজও করি।”
“গোয়েন্দা?”
“না স্যার। আসল গোয়েন্দা নই।”
“তবে?”
“পাতি গোয়েন্দা।” কিকিরা হাসলেন মজার মুখ করে। “আপনি আমায় ওয়ার্থলেস মনে করবেন না। আমি কাপালিক ধরেছি, রাজবাড়ির কাজও করেছি। সত্যি বলতে কি, আপনি আমায় একটু লোভ দেখিয়ে টেনে এনেছেন।”
“লোভ?” লোচন সিগারেটের প্যাকেটটা খুলতে-খুলতে বলল।
“তিরিশ হাজার টাকার লোভ!”
“ও!”
“মোহন দত্তকে, মানে জাল মোহন দত্তকে আমি খুঁজে বের করতে চাই।”
লোচন সিগারেট ধরিয়ে নিয়ে যেন বিদ্রূপ করে হাসল। “আপনি জাল মোহনকে খুঁজে বের করবেন! বলেন কী মশাই! আপনি তো বললেন পাতি গোয়েন্দা। আমি ভাবছি একটা আসল গোয়েন্দা ভাড়া করব।”
কিকিরা হাসিমুখেই জবাব দিলেন, “তা করতে পারেন। শাঁটুলদাকেই করুন।”
“শাঁটুল! কে শাঁটুল?”
“শার্লকদাকে আমি শাঁটুলদা বলি!”
লোচন তাচ্ছিল্যের সঙ্গে হাত-মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, “না না, ওসব শটুল-মাটুল আমার চাই না।”
কিকিরা হঠাৎ হাত বাড়ালেন। “স্যার, একবার আপনার দেশলাইটা দেবেন?”
“দেশলাই!”
“মানে, আমি একটা বিড়ি ধরাব।”
“বিড়ি!”
“চুরুট!”
লোচন যেন বিরক্ত হয়েই দেশলাইটা ছুঁড়ে দিল।
কিকিরা ততক্ষণে কোটের পকেটে হাত ঢুকিয়েছেন। চুরুট বের করছেন। দেশলাইটা এসে তাঁর পায়ের কাছে পড়ল। তারাপদ কুড়িয়ে নিল দেশলাই।
কিকিরা কোটের পকেট থেকে হাত বের করলেন। দেশলাই দিল তারাপদ। চুরুট ধরিয়ে কিকিরা বললেন, “কাগজে যা ছেপেছেন তাতে তো বলেছিলেন–যে-কোনো লোকই আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। বিশেষ করে কাউকে তো আসতে বলেননি। তা হলে এই খোঁড়া পা নিয়ে আসতাম না। কাজটা ঠিক করেননি, দত্তবাবু! কথায় কাজে মিল থাকা দরকার! …তা ঠিক আছে। চলি। এই নিন আপনার দেশলাই!” বলে কিকিরা উঠে দাঁড়িয়ে উঠে দাঁড়িয়ে দু’পা এগিয়ে ছুঁড়ে দিলেন দেশলাই।
লোচন দেশলাইয়ের বাক্সটা লোফার জন্যে হাত বাড়াল। কোথায় দেশলাই! পায়ের কাছে ঠং করে কী যেন একটা পড়ল।
নিচু হয়ে একটু খোঁজাখুঁজি করে লোচন জিনিসটা তুলে নিল। তুলে নিয়েই। অবাক। চকচক করছে। সোনা নাকি? “কী এটা?”
“সোনার মেডেল…!”
“মে-ডে-ল?”
“আরও দেখবেন! এই দেখুন আমার ডান হাত। ফাঁকা। দেখছেন? ভাল করেই দেখুন স্যার! …নিন, আরও একটা মেডেল।” এবারের জিনিসটা লোচনের কোলে গিয়ে পড়ল। “আরও চাই? আচ্ছা–এই নিন আরও একটা। এটা স্বয়ং গভর্নর সাহেব দিয়েছিলেন। ছ’আনা সোনা আছে–গিনি গোল্ড!”
