লোচন রীতিমতন ঘাবড়ে গিয়েছিল। বলল, “থাক থাক…।”
“না স্যার, কিকিরা হল জেনুইন। ফাঁকিবাজি পাবেন না। আরও কিছু শো করব? দেখবেন? দিন না আপনার চাবির গোছাটা। হাওয়া করে দেব।”
লোচন তার চাবির গোছা মুঠোর মধ্যে পুরে ফেলল। “না না, চাবির গোছ থাক। আপনি…”
“আমি কিকিরা দ্য গ্রেট। ম্যাগনিফিসিয়ান্ট ম্যাজিশিয়ান। ডাক ডিটেকটিভ–মানে পাতি গোয়েন্দা।”
লোচন বেশ বিমূঢ়।
কিকিরা বললেন, “দিন দত্তমশাই, মেডেলগুলো ফেরত দিন। …তারাপদ, ওগুলো নিয়ে নাও।”
তারাপদ এগিয়ে গিয়ে মেডেলগুলো নিয়ে নিল।
“তা হলে চলি সার!”
লোচন থতমত খেয়ে গিয়েছিল। বলল, “আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। আপনারা কি সত্যিই জাল মোহনকে ধরে দেওয়ার জন্যে এসেছেন?”
“ভদ্রলোকের এক কথা। কাগজ দেখে এসেছি। কাজ করতে পারলে তিরিশ হাজার টাকা, নয়ত তিরিশ পয়সাও নয়।”
লোচন যেন কী ভাবল। “পারবেন?”
“চেষ্টা করব।”
“বসুন।”
কিকিরা বসলেন, ইশারায় বসতে বললেন তারাপদকে।
লোচন খানিকক্ষণ যেন কিছু ভাবল। তারপর বলল, “মোহন আমার ছোট ভাই। সহোদর ভাই নয়। জ্যাঠামশাই ওকে পোষ্য নিয়েছিলেন। মানে জ্যাঠার ছেলেমেয়ে ছিল না। আমরা জন্মের বছর দশ পরে পরে এক বন্ধুর ছেলেকে পোষ্য নেন। বন্ধু মারা যান। …তা মোহন আমার ভাই-ই। আমরা দুটি ভাই ছিলাম। মোহন আজ পাঁচ বছর হল মারা গিয়েছে। নাইনটিন এইট্টি ফাইভে। “
“অগস্ট মাসে?”
“হ্যাঁ।”
“কোথায়?”
“সে সব কথা পরে। এখন যা বলছি শুনুন। …আজ মাস দেড়-দুই হল একটা লোক আমার ছোট ভাই মোহন সেজে নানা জায়গায় ঝঞ্ঝাট করে বেড়াচ্ছে।”
“আপনি তাকে চোখে দেখেছেন? মানে, যে-লোকটি ঝঞ্ঝাট করে বেড়াচ্ছে, তাকে দেখেছেন?”
“না, আমি দেখিনি।”
“তা হলে?”
লোচন অন্যমনস্কভাবে আরও একটা সিগারেট ধরাল। বলল, “আমি খবর পাচ্ছি।”
“কোত্থেকে খবর পাচ্ছেন?”
“এর-ওর কাছ থেকে।”
“যেমন? নাম বলুন? ঠিকানা?”
ধোঁয়া গিলে লোচন বলল, “মাস দেড়েক আগে একদিন আমার এক আত্মীয়, সম্পর্কে মাসতুতো দাদা, রাত্তিরে ফোন করে প্রথম খবরটা দিল।”
লোচনের কথা শেষ হয়নি, আচমকা এক ছোকরা ঘরে ঢুকল। ঘন মেরুন। রঙের গেঞ্জি গায়ে–স্পোর্টস গেঞ্জি, পরনে সাদা প্যান্ট। চোখে বাহারি গগলস। হাতে একটা লম্বা মতন বাক্স। বাজনার। বলল, “জামাইবাবু, দিদি আপনাকে ডাকছে। ফোন এসেছে। তাড়াতাড়ি যান।” বলে ডোকরা। কিকিরাদের দেখল কৌতূহলের সঙ্গে, তারপর চলে গেল।
লোচন নিজেই বলল, “আমার ছোট শ্যালক, জ্যোতি। ভাল গিটার বাজায়। কোথাও চলল। বাজাতে বোধ হয়। ..আপনারা বসুন। আমি আসছি।”
লোচন চলে গেল।
.
০৩.
লোচন দত্ত ঘর ছেড়ে চলে যাওয়ার পর তারাপদ সামান্য অপেক্ষা করল, তারপর দুহাত জোড় করে নিচু গলায় বলল, “স্যার, আপনি সত্যিই গ্রেট, আমাকেও হাঁ করে দিয়েছেন। এত কথা জানলেন কেমন করে?”
কিকিরা মুচকি-মুচকি হাসছিলেন। বললেন, “তোমরা অল্পেতেই হাঁ হও। হাঁ হওয়ার কিছু নেই। বগলাকে পাঠিয়েছিলাম বড়াল গলি আর লোচনের খবর নিতে। বগলা যা খবর দিল আগেই বলেছি। একটা কথা বোধ হয় বলতে ভুলে গিয়েছি। ও শুনেছিল, বাবুদের ছাপাখানা আছে ধর্মতলায়। তা আমার কাছে গোটা দুয়েক পুরনো টেলিফোন-পাঁজি আছে, যাকে তোমরা বলো ডাইরেক্টরি। দুটোই বছর কয়েকের পুরনো। খুব ইউসফুল জিনিস হে তারাবাবু, তুমি ওটা ঘাঁটাঘাঁটি করলে অনেক কিছু পেয়ে যাবে। সেই জন্যেই রেখেছি।”
“আপনি পেলেন?”
“পেলাম। দেখলাম লেখা আছে দত্ত অ্যান্ড সন্স। প্রিন্টার্স অ্যান্ড পাবলিশার্স। ধর্মতলা স্ট্রিট…। ছাপাখানার ফোন নম্বর। পরের লাইনে লেখা ডিরেক্টর এল, দত্ত। রেসিডেন্স ফোন নম্বর… এত এত। ব্যস–সহজ জিনিসটা বেরিয়ে গেল। লোচন দত্ত ছাপাখানার ডিরেক্টর। তার বাড়ির ফোন নম্বর সো অ্যান্ড সো।”
“সে না হয় বুঝলাম। কিন্তু আপনি দত্তদের ছাপাখানা সম্পর্কে যেসব গল্প ঝাড়ছিলেন..”
“সেরেফ গল্পই। লোচন দত্ত নিজেই বলল, তাদের ছাপাখানা সত্তর বছরের। মানে বেশ পুরনো। মামুলি ছাপাখানা সত্তর বছর টিকে থাকে না তারাপদ। তা ছাড়া চোখ বুজে ডাউন দ্য মেমারি লেন করলাম। ধর্মতলা স্ট্রিট আমার খুব চেনা রাস্তা। মনে হল, এরকম একটা নামের সাইনবোর্ড যেন দেখেছি। মৌলালির কাছাকাছি হবে।”
তারাপদ ঠাট্টা করে বলল, “সি আর দাশকেও দেখেছেন নাকি?”
কিকিরা হাসলে লাগলেন। “ছবি দেখেছি। দেশবন্ধু মারা যান–উনিশশো পঁচিশ-টচিশ হবে। তখন আমি কোথায়, লোচনই বা কোথায়? আর কোথায় বা তাদের প্রেস।”
তারাপদ যেন মজাটা উপভোগ করছিল। কিকিরা লোককে বোকা বানাতে ওস্তাদ। ম্যাজিশিয়ান বলে কথা!
“আপনি কি খেলা দেখাবার জন্যে ওইসব মেডেল পকেটে পুরে এনেছিলেন?”
“রাইট! ম্যাজিশিয়ানদের পকেট কখনও ফাঁকা থাকে না। হুডিনি সাহেব বলতেন, আমাদের ফাঁকা পকেটে ঘুরতে নেই, জাদুকরের জাত যায়। অন্তত একটা রুমাল বা তাসের প্যাকেটও রেখ।”
“পকেটে আর কী কী আছে?”
“তেমন কিছু না। রুমাল আর আই-পিন।”
“আপনি ভাগ্যবান। ম্যাজিকটা কাজে লেগে গেল।”
“লেগে যেত। সাধারণ মানুষের কাছে দুটো জিনিস লেগে যাওয়ার নাইনটি পার্সেন্ট চান্স। হাত দেখা আর ম্যাজিক।” বলে কিকিরা হাসতে লাগলেন। “আমার কাছে আরও একটা তুরুপের তাস ছিল। দরকার হল না।”
পায়ের শব্দ শোনা গেল।
