“এ বাবু?”
কিকিরা দাঁড়িয়ে পড়লেন। তাকালেন।
বাড়ির চওড়া থামের আড়াল থেকে একটা লোক এগিয়ে আসছিল। কুস্তিগিরের মতন চেহারা। পরনে মালকোঁচা-মারা ধুতি, খাটো বহরের। গায়ে হাক্কাটা গেঞ্জি। গেঞ্জিটা রং করা। মাথা প্রায় ন্যাড়া।
কাছে এলে বোঝা গেল, নোকটা পালোয়ানই বটে। বুকের ছাতি, পায়ের গোছ, হাতের পেশী দেখার মতনই। সেইসঙ্গে তার পইতেটাও। গলা থেকে পেট পর্যন্ত লম্বা। লোকটার কপালে চন্দন, কানের লতিতে চন্দন।
কাছে এসে লোকটা বলল, “কাঁহা যাইয়ে গা?”
কিকিরা বললেন, “বাবুসে ভেট করনা হ্যায়।”
“কোন বাবু?”
“বড়া বাবু! লোচনবাবু!” বুদ্ধি করেই বললেন কিকিরা।
“কেয়া নাম আপনোগা?”
কিকিরা বললেন, “কিকিরা!”
“কেয়া?”
“কি-কিরা!”
“কিক্কিরিয়া!” বলে লোকটা কেমন সন্দেহের চোখে দেখল কিকিরাদের। তারপর বলল, “ঠাহের যাইয়ে।”
কিকিরাদের দাঁড়াতে বলে লোকটা বাড়ির দিকে চলে গেল।
কিকিরা রঙ্গ করে বললেন, “কোন বাবু?” বলেই কৌতূহল হল। “এবাড়িতে আর ক’জন বাবু থাকে হে?”
এতক্ষণ পরে কুকুরের ডাক শোনা গেল। মনে হল, কুকুর এখন কাছাকাছি কোথাও নেই। হয়ত বাড়ির পেছন দিকে, বা দোতলায়।
কিকিরার সাজপোশাক যথারীতি খানিকটা বিচিত্র। আলখাল্লা ধরনের জামা, সরু প্যান্ট। মানুষটি যেমন রোগা তেমনই লম্বা। এই পোশাকে তাঁকে আরও লম্বা দেখায়। মাথায় একরাশ চুল, বড়বড়, প্রায় কাঁধ ছুঁয়েছে। কিকিরার হাতে বেতের লাঠি ছিল। পায়ে ক্রেপ ব্যান্ডেজ। পায়ে চটি।
তারাপদ বলল, “কিকিরা, এই বাড়ি দেখে তো মনে হচ্ছে–ভেরি ওল্ড। কুইন ভিক্টোরিয়া আমলের নাকি?”
কিকিরা বললেন, “হতে পারে। অন্তত জর্জ দ্য ফিফথের আমলের তো হবেই।” বলে চারপাশ দেখিয়ে বললেন, “বাড়িটার সামনে কত জায়গা দেখেছ! পুরনো দিনের বাড়ি না হলে কলকাতা শহরে এত জায়গা ফেলে কেউ বাড়ি করে। এখন এই জমিরই কী দাম! লোচন দত্তরা ধনী লোক ছিল হে। ধনী আর বনেদি। আমার মনে হচ্ছে, একসময় এবাড়িতে নিজেদের ঘোড়া আর গাড়িও থাকত! ওই শেডটা বোধ হয় ঘোড়ার আস্তাবল ছিল এক সময়। “
“কী করে বুঝলেন?”
“এরকম আমি দেখেছি। তা ছাড়া একটা ভাঙা চাকা পড়ে আছে একপাশে।”
আরও দু-চারটে কথা শেষ না হতে-না-হতেই পালোয়ান ফিরে এল।
“আইয়ে।”
কিকিরা পা বাড়ালেন। সামনে পালোয়ানজি।
হাঁটতে হাঁটতে কিকিরা হঠাৎ বললেন, “এ পালহানজি! দেশ গাঁও কাঁহা। তুমহারা?”
“ছাপরা জিলা!… লাটোয়া গাঁও।”
“আচ্ছা! কলকাত্তামে নয়া মালুম!”
কিকিরা দু-চার কথা আরও জেনে নিলেন। পালোয়ানের নাম, হরিপ্রসাদ। আগে সেজানবাজারে থাকত। লখিয়াবাবুর বাড়িতে দারোয়ান ছিল।
সিঁড়ি কয়েক ধাপ। তারপর ঢাকা বারান্দা। বারান্দার গায়ে-গায়ে তিন-চারটে ঘর।
পালোয়ান হরিপ্রসাদ কিকিরাদের নিয়ে গিয়ে একটা ঘরে বসাল।
কিকিরারা কাঠের চেয়ারে বসলেন।
ঘরটা বড়। জানলা-দরজাও বেশ বড় বড়। কড়ি কাঠ থেকে লোহার রড ঝুলছে। রডের সঙ্গে পাখা লাগানো। গুটি দুই বাতি ঝুলছিল উঁচু থেকে। ঘরে আসবাবপত্র বলতে এক জোড়া কাঠের আলমারি। রাজ্যের জঞ্জাল জমিয়ে রাখলে যেমন হয়–আলমারির মধ্যেটা সেইরকম দেখাচ্ছিল। পাল্লার কাঁচ অর্ধেক ভাঙা। গোটা কয়েক কাঠের চেয়ার, আর তক্তপোশের ওপর পাতা ময়লা ফরাস ছাড়া অন্য কিছু বড় একটা দেখা যায় না। একটা ক্যারাম বোর্ড একপাশে রাখা। টিনের একটা কৌটোও রয়েছে বোর্ডের পাশে। দেওয়ালে এক মস্ত বড় ছবি। বোধ হয় দত্ত বাড়ির কোনো প্রাচীন কতার। দেওয়ালে এক কাগজ সাঁটা রয়েছে। সাদা কাগজের ওপর রং দিয়ে লেখা ক্যারাম প্রতিযোগিতা। গোটা দুয়েক ঘেঁড়া-ফাটা ক্যালেন্ডার। ঘরের চেহারা থেকে বেশ বোঝা যায়–এটা ঝড়তি-পড়তি ঘর। মামুলি লোকজনদেরই বসানো হয়।
লোচন দত্ত ঘরে এল। প্রথম নজরেই আন্দাজ হয় বয়েস বেশি নয় লোচনের।
কিকিরা উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার জানালেন।
লোচন দত্তর পরনে দামি চেককাটা লুঙ্গি। গায়ে ফতুয়া। এক হাতে সিগারেটের প্যাকেট, দেশলাই, অন্য হাতে চাবির গোছা। মনে হল, চাবির গোছা ছাড়া তিনি কোথাও নড়েন না।
লোচনের চেহারা দেখে কিকিরার ধারণা হল ওর বয়েস বছর পঁয়তাল্লিশ। স্বাস্থ্য মজবুত। গায়ের রং তামাটে। মুখটা চৌকোনো ধাঁচের, শক্ত। দুটো চোখ যেন ঠেলে বেরিয়ে আসছে। বড় বড় চোখ। খানিকটা রুক্ষ। চতুর বলেও মনে হচ্ছিল। মাথার চুল কোঁকড়ানো, মাঝখানে সিঁথি। গোঁফ রয়েছে। গলায় সোনার সরু হার।
ঘরে ঢুকে লোচন দত্ত একবার পাখার দিকে তাকাল। “আহা, পাখাটা খুলে দিয়ে যায়নি। যত্ত সব গাধা আহাম্মক।” বলতে বলতে নিজেই পাখার সুইচে হাত দিল।
পাখা চলতে শুরু করল।
লোচন এবার একটা চেয়ারে বসতে বসতে বলল, “আপনারা?”
কিকিরা বললেন, “আপনার কাছে এসেছি।”
“কী ব্যাপারে?”
“খবরের কাগজে আপনি একটা নোটিস দিয়েছিলেন।”
“হ্যাঁ-হ্যাঁ। অনেক টাকা খরচ হয়ে গেল।”
“অন্য কেউ এসেছিল আপনার সঙ্গে দেখা করতে?”
“দুজন। দু’দিনে দু’জন। দুজনের কাউকেই আমার পছন্দ হয়নি। একজন বোধ হয়–একসময় হোটেলে কাজ করত। সিকিউরিটির কাজ।”
“আমরা আপনার সঙ্গে ওই নোটিসের ব্যাপারে কথা বলতে এসেছি।”
লোচন চাবির গোছাটা কোলের ওপর রাখল। দেখল কিকিরাকে। মনে হল না, খুশি হয়েছে।
