তারপদ এসব কিছু জানে না, চুপ করে থাকল।
কিকিরা বললেন, “মোহনের মতন ঘটনা এ-দেশে কখনো-সখনো ঘটে। আমরা তার খবর পাই না। মানে, আমি বলছি মারা গেছে বলে সবাই যাকে জানে, সেই মরা-লোক আবার ফিরে এসেছে।”
তারাপদ এবার খানিকটা কৌতূহল বোধ করল। বলল, “আপনি বলতে চাইছেন, মোহন মারা যায়নি?”
“না, না, এত তাড়াতাড়ি তা কেমন করে বলা যাবে?”
“তা হলে বলা যাক, মোহন মারা না যেতেও পারে!”
“হতে পারে।”
“এখন তবে কী করতে চান?”
“মোহন অনুসন্ধান। লোচন দত্তর সঙ্গে আমাদের দেখা করতে হবে। ওই যে লিখেছে, যোগাযোগ–সেই যোগাযোগটা করতে হবে আগে। দেখতে হবে লোচন কার কার কাছ থেকে জেনেছে যে, এক জাল মোহন তাদের সঙ্গে দেখা করেছে। দেখা করলেও কোন উদ্দেশ্য নিয়ে? লোচন নিজে মোহনকে কোথাও আচমকা দেখেছে কি না? বা মোহনই কোনোভাবে লোচনকে নিজেই জানিয়েছে কি না যে, সে হাজির হয়েছে। লোচন এর মধ্যে থানা-পুলিশ করেছে, কি করেনি!” চায়ের কাপ নামিয়ে রাখলেন কিকিরা। হাতের পাশেই এক গোল টেবিল। পুরনো টেলিফোন থেকে টুকটাক অনেক কিছুই পড়ে আছে টেবিলে।
তারাপদ পেট ভরে কচুরি খেয়েছিল। চা খেতে-খেতে ঢেকুর তুলল। বলল, “আপনি এখন লোচনের সঙ্গে দেখা করতে চান?”
“ইয়েস স্যার।”
“কেমন করে?”
“লেম ম্যান, লিম্পিং লিম্পিং করে…।”
তারপর হেসে ফেলল, “খোঁড়া মানুষ খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে?”
“উপায় কী?”
“চাঁদ শুনলে রাগ করবে স্যার।”
“চাঁদু ক্যান ওয়েট, তিরিশ হাজার যদি ওয়েট না করে? কে জানছে এরই মধ্যে কত লোক লোচনের কাছে গিয়ে হাজির হয়েছে! টাকার লোভ বড় লোভ।”
“লোচন কোনো প্রাইভেট ডিটেকটিভও তো লাগাতে পারে। কলকাতায় এখন ডিটেকটিভ এজেন্সির অফিস হয়েছে।”
“আমরাও তো এজেন্সি খুলেছি : কে-টি-সি–কিকিরা, তারাপদ, চন্দন। হেড অফিস আমার বাড়ি।”
তারাপদ হাসতে-হাসতে বলল, “স্যার, আমি কেটিসির নাম দিয়েছি কুটুস। দয়া করে একটা প্যাড ছাপিয়ে নিন এবার, আর শ’ খানেক ভিজিটিং কার্ড।” বলে তারাপদ চায়ের কাপ নামিয়ে রাখল। সিগারেটের প্যাকেট হাতড়াতে লাগল পকেটে।
কিকিরা বললেন, “হবে। শনৈঃ শনৈঃ। ধৈর্য ধরতি বালকঃ।…এবার কাজের কথা বলি।”
“বলুন”, তারাপদ সিগারেট ধরিয়ে নিল।
“আমি এর মধ্যে বাড়িতে বসে বসে দু একটা গোড়ার কাজ সেরে রেখেছি।”
“বাঃ। ফাস্ট কেলাস।”
“গলিটার খোঁজ নিতে বগলাকে পাঠিয়ে দিলাম। আমার কাছে কলকাতা কপোরেশনের স্ট্রিট ডাইরেক্টরি আছে।“
“গলিটা কোথায়?”
“বউবাজার থানার মধ্যে।”
“কেমন গলি?”
“পুরনো শহরের পুরনো গলি। লোচনদের বাড়িও পুরনো। তবে বেশ বড়। বনেদি বাড়ি ছিল বোধ হয়। এখন সামনের দিকে ভেঙেচুরে গিয়েছে।”
“লোচনকে দেখা গেল?”
“না। বগলা শুধু গলিটার খোঁজ নিয়ে বাড়ি দেখে চলে এসেছে।”
“আর কী সংবাদ সংগ্রহ করেছেন, স্যার?”
“লোচনের ছেলে দুটি যমজ। তার মধ্যে একটিকে–কেউ বা কারা একবার চুরি করে নিয়ে গিয়েছিল। একবেলা আটকে রেখে আবার ফেরতও দিয়ে গিয়েছে। ঘটনাটা মাস-দুই আগেকার।”
তারাপদ অবাক হয়ে বলল, “সে কী! ছেলে চুরি?”
“লোচনের বাড়িতে এখন মস্ত এক পালোয়ানকে আনা হয়েছে। সে বাড়ি পাহারা দিচ্ছে। ওদের বাড়ির কুকুরটাও বাইরে ছাড়া থাকে। মানে, লোচন হালফিল খুব সাবধান হয়ে গিয়েছে।…তা কাল-পরশু নাগাদ চলো একবার, নিজের চোখে দেখে আসি।”
তারাপদ মাথা নাড়ল। সে রাজি।
.
০২.
তারাপদকে সঙ্গে করে কিকিরা রবিবার বেলা ন’টা নাগাদ যদু বড়াল লেনে হাজির।
শরৎকালের আকাশ। ঝকঝকে রোদ মাঝে-মাঝে সামান্য চাপা পড়ছে, ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল মাঝে-মাঝে। তুলোর আঁশের মতন বৃষ্টি এই এল, এই গেল। আবার রোদ।
গলিটা পুরনো তো বটেই–কিন্তু সরু নয়, মোটামুটি চওড়া। গাড়ি ঘোড়া আসা-যাওয়া করতে কোনো অসুবিধে হয় না। বাড়িগুলোও দোতলা-তেতলা। কোনো-কোনোটা জীর্ণ চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আবার কোনোটা বেশ পাকাঁপোক্ত। ওরই মধ্যে একটা বাড়ি নতুন করে সারিয়ে রংচঙ করা হচ্ছিল।
গলির মধ্যে রোদও ছিল, ছায়াও ছিল। রাস্তা সামান্য ভিজে ভিজে। দু-চারটে মামুলি দোকান। লন্ড্রি, চায়ের, মুদিখানার, তেলেভাজার দোকানও রয়েছে একটা।
কিকিরা ঠিকানা মতন বাড়িটার সামনে এসে রিকশা ছেড়ে দিলেন। বগলা যা বলেছিল, মোটামুটি ঠিক। উঁচু পাঁচিল-ঘেরা বাড়ি। অবশ্য পাঁচিলের দশ আনাই ভেঙে পড়েছে। ইট একেবারে শ্যাওলাধরা। বাড়ি ঢোকার মুখে এক ভাঙা ফটক। ফটকটা বন্ধ হয় না। ভোলাই থাকে ফটকের একপাশে থামের ওপর কোনোকালে আলোর ব্যবস্থা ছিল, এখন নিতান্তই একটা লোহার বাঁকানো পাইপ খাড়া হয়ে আছে।
ফটক দিয়ে ঢুকতেই খানিকটা মাঠ। একেবারে জংলা চেহারা। নিম আর কুলগাছ। একপাশে ফুলগাছের ঝোঁপ। শিউলিগাছ, করবী। মাঠে জলকাদা, ঘাস। ডান দিকে দারোয়ানের ঘর ছিল আগে। এখন ভাঙা ঝুপড়ি।
গজ চল্লিশ হয়ত হবে না, মাঠটুকু পেরিয়েই দোতলা বাড়ি। বাড়ি সেকেলে। চেহারাতেই সেটা বোঝা যায়। কাঠের খড়খড়ি, লোহার নকশাদারি রেলিং, বড়বড় থাম, কাঁচের শার্সি। বাড়ির নানান জায়গায় ভাঙা-চোরা। বাইরে থেকে বেশ বিবর্ণ দেখায়। মাঠের একপাশে একটা ভাঙা টালির শেড। জায়গাটা নোংরা হয়ে রয়েছে।
তারাপদকে নিয়ে খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে বিশ-ত্রিশ পা এগোতে-না-এগোতেই কার গলা শোনা গেল।
