তারাপদ পড়া শেষ করেও যেন ভাল বুঝল না। মনে-মনে আবার পড়ে নিচ্ছিল।
শেষে তারাপদ বলল, “বাবা! বিরাট নোটিস। লিগ্যাল নোটিস স্যার।” কিকিরা বললেন, “লিগ্যাল নোটিস নয় বলেই মনে হচ্ছে। বয়ানটা উকিলের মতন। ব্যক্তিগত বিজ্ঞপ্তি ওটা।”
“সব দিনেই কি একই বয়ান? মানে তিন দিনের কাগজে?”
“হ্যাঁ।”
“শুধু বাংলা কাগজেই?”
“ইংরিজি আমি দেখিনি। মনে হয়, অন্য বাংলা কাগজ আর ইংরিজি কাগজেও আছে। কোন কাগজ কার চোখে পড়বে-বলা তো যায় না।”
তারাপদ বলল, “তবে এই আপনার ত্রিশ হাজার?”
“ইয়েস স্যার।”
“আপনি স্বপ্ন দেখছেন কিকিরা। টাকা অত সস্তা নয়।”
কিকিরা বললেন, “নো সার, আমি ড্রিমিং করছি না। ড্রিলিং করছি। মানে রহস্যটা বোঝার জন্য জমি খুঁজছি। তুমি ঠিক বলেছ, অত সস্তা নয়। নয় বলেই তো ব্যাপারটা কঠিন। তুমি কি ভাবছ, লোচন দত্ত টাকার হরিলুঠ দেওয়ার জন্যে কেঁদে মরছে?”
“আমি কিছুই ভাবছি না। শুধু দেখছি, লোচন দত্ত এক আহাম্মক আর আপনিও পাগল!”
এমন সময় বগলা এল। চা আর হিঙের কচুরি, কুমড়ো-আলুর ছক্কা এসেছে।
অফিস থেকে ফিরছে তারাপদ। খিদে পেয়েছিল জোর। কচুরির ডিশটা তাড়াতাড়ি টেনে নিল। চলে গেল বগলা।
কিকিরা বললেন, “ব্যাপারটা তোমার মাথায় ঢোকেনি।
“একেবারেই নয়।”
“একটা মরা লোক চার-পাঁচ বছর পরে ফিরে আসে কেমন করে?”
“আসে না। মরা লোকের ভূত আসতে পারে।”
“তা ছাড়া–এই লেখাটা পড়ে বোঝা যাচ্ছে, কোনো জাল মোহন দত্ত নানান বান্ধা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ধান্ধা বৈষয়িক হতে পারে, অন্য কিছুও হতে পারে।”
তারাপদ মাথা নাড়ল। মোহন দত্ত সম্পর্কে তার খুব যে একটা আগ্রহ রয়েছে-মনে হল না।
চা খেতে-খেতে কিকিরা বললেন, “একটা জিনিস নজর করেছ?”
“কী?”
“লোচন দত্ত এমনভাবে লিখেছে যেন সে এই মোহন দত্তকে–মানে প্রতারক জালিয়াত মোহনকে চোখে দেখেনি এখন পর্যন্ত, শুধু তার কথা শুনেছে।”
তারাপদ কচুরি খেতে-খেতে জড়ানো জিভে বলল, “হতেই পারে। এর মধ্যে অস্বাভাবিক কী আছে কিকিরা! আমার নাম করেই অন্য একটা লোক যদি মানুষ ঠকিয়ে বেড়ায়–বেড়াতেই পারে–তাকে আমি চোখে না দেখতেও পারি। অন্য কেউ এসে আমায় বলতে পারে কথাটা…।”
কিকিরা বললেন, “তোমার কথা হচ্ছে না, হচ্ছে লোচন দত্ত আর মোহন দত্তের কথা। তুমি ভুলে যেয়ো না, মরা মানুষ আবার জ্যান্ত হয়ে ফিরে এসে লোক ঠকিয়ে বেড়াবে–এটা খুব ইজি কাজ নয়। কথা হল, কাদের ঠকাচ্ছে? যাদের ঠকাচ্ছে তারা যদি লোচনদের জানাশোনা লোক হয়-তবে সেই বোকা, বুন্ধুগুলো কি জানে না যে, মোহন অনেক আগেই মারা গিয়েছে?”
তারাপদ বলল, “হয়ত লোচনের অপরিচিতদের ঠকাচ্ছে!”
“যুক্তি হিসাবে সেটাই হতে পারে। কিন্তু কথা হল, কেন ঠকাবে? যে-লোক অন্যকে ঠকাচ্ছে–তার উদ্দেশ্য কী? যে ঠকছে তারই বা কী দায় পড়েছে ঠকার! ধরো, রামবাবু বলে একটা লোককে জাল মোহন ঠকাবার চেষ্টা করছে। কেন করছে? আর রামবাবু কি এতই বোকা যে, ঠকাবার আগে একবার লোচনদের খোঁজ-খবর করবে না? বাড়ি, সম্পত্তি, দোকান-সংক্রান্ত যদি কিছু হয়–তবে এইসব জিনিস এমনই যে, লোকে এই ধরনের জিনিসের সঙ্গে কোনো কারবার করতে হলে ভাল করে খোঁজ-খবর নেয়। খোঁজ নিলেই মোহন ধরা পড়ে যাবে।”
“তাই তো যাচ্ছে।”
“যাচ্ছে কি না আমি জানি না। তবে আমার মনে হচ্ছে, ব্যাপারটা অত সহজ নয়। তিরিশ হাজার টাকা পুরস্কার কেউ এমনি-এমনি দেয় না। জাল লোক ধরতে নয়। তার জন্যে থানা-পুলিশ আছে। লোচন থানায় ডায়েরি করিয়েছে? কেন সে কাগজে সরাসরি লিগ্যাল নোটিস না দিয়ে এইরকম একটা ব্যক্তিগত বিজ্ঞপ্তি ছাপল!”
চা খাওয়া শুরু করেছিল তারাপদ। বলল, “আপনিই বলুন, কেন?” কিকিরা বললেন, “আমি ভেবে দেখেছি, দুটো কারণে হতে পারে। প্রথম কারণ, বড়াল লেনের লোচনবাবুটি মোহনচাঁদকে ধরতে চাইছে। নিজেই সে জানিয়েছে, জালিয়াত মোহনকে ধরে দিতে হবে। দ্বিতীয় কারণ, মোহন লোকটাকে সে ভয় পাচ্ছে। “
“জাল মানুষকে ভয়?”
“যদি জাল না হয়।”
তারাপদ অবাক হয়ে বলল, “কী বলছেন আপনি! লোচন, সাল-সময় দিয়ে তার ভাইয়ের মরার খবর জানাচ্ছে, তবু বলছেন এ জাল মোহন নয়।”
কিকিরা চা খেতে-খেতে স্বাভাবিক গলায় বললেন, “তুমি জাল প্রতাপচাঁদ, ভাওয়াল মামলা–এ-সব শুনেছ? নিশ্চয় শোনোনি! শুনলে এত অবাক হতে না। দীনরাম মামলার কথাও শোনোনি। বম্বের মামলা। দীনরামকে পাক্কা আট বছর মামলা লড়তে হয়েছিল, সে আসল দীনরাম প্রমাণ করতে।”
“স্যার, ভাওয়াল মামলার কথা আমি শুনেছি। সে তো সাঙ্ঘাতিক ষড়যন্ত্র ছিল।”
কিকিরা বললেন, “লোচনও যে সাঙ্ঘাতিক ষড়যন্ত্র করেনি তুমি কেমন করে বুঝলে?”
তারাপদ চা খেতে শুরু করেছিল, বলল, “লোচনের কাছে নিশ্চয় ডেথ সার্টিফিকেটের প্রমাণ আছে…।”
“প্রমাণ থাকতে পারে, নাও পারে। আর ডেথ সার্টিফিকেট? টাকায় কী না হয়। তা ছাড়া, ছোটখাটো কোনো জায়গায় অজ গাঁ-গ্রামে মারা গেলে ডেথ। সার্টিফিকেট বড় একটা থাকে না। থানায় জানিয়ে দিলেই হয়। তা ছাড়া, কোথায় কখন কী অবস্থায় মোহন মারা গিয়েছে না জানলে কোনো কিছুই বলা যায় না। ধরো, ট্রেন অ্যাকসিডেন্টে দশ-বিশটা লোক মারা গেল। তার মধ্যে অনেকের যা হাল হল–মাংসের খানিকটা তাল–মাথা নেই, হাত নেই, পা নেই–কোনোরকমেই ট্রেস করা গেল না তারা কারা। তাদেরই পুড়িয়ে ফেলা হল। শনাক্তকরণই তো হল না। কী করে তুমি তাদের যথার্থ সার্টিফিকেট পাবে! কে দেবে! থানাতেই বা কী লেখা থাকবে?”
