নিজের সেই সিংহাসন-মাকা চেয়ারে কিকিরা বসে ছিলেন। সামনে এক মোড়া। মোড়ার ওপর তুলোর গদি। গদির ওপর কিকিরার বাঁ পা। পায়ের সঙ্গে দড়ির ফাঁস। অবশ্য কিকিরার বাঁ পায়ের পাতা থেকে গোড়ালির অনেকটা ওপর পর্যন্ত মোটা করে ক্রেপ ব্যান্ডেজ জড়ানো। দড়ির ফাঁসটা গোড়ালির ওপর দিকে বাঁধা। আলগা করে। সেই দড়ি এক বিচিত্র কায়দায় মাথার ওপর। ঝোলানো চাকার মধ্যে গলিয়ে দেওয়া হয়েছে। গলিয়ে দড়ির অন্য প্রান্তটা ঝুলিয়ে একেবারে কিকিরার বাঁ হাতের সামনে। মানে, কিকিরা যখন দড়ি টানছেন, তাঁর বাঁ পা উঠে যাচ্ছে, যখন দড়ি আলগা করছেন, পা এসে মোড়ার ওপর পড়ছে।
কিকিরার ডান হাতে তাঁর পছন্দের চুরুট। দেখতে আঙুলের মতন সরু-সরু। চুরুটের ধোঁয়ার গন্ধটা কিন্তু বিশ্রী।
তারাপদ যেন কতই বিমোহিত বাহবা দিয়ে বলল, “দারুণ স্যার। এ-জিনিস আপনিই পারেন।”
কিকিরা সাদামাটা গলায় বললেন, “পুলিসিস্টেম।”
“পাঙ্খা কুলি সিস্টেম?”
“পাঙ্খা কুলি দেখেছ?”
“চোখে দেখিনি, ছবিতে দেখেছি। ইলেকট্রিসিটির যুগে পাঙ্খ-কুলি আর কোথায় দেখতে পাব!”
“জ্ঞানের রাজা! ইলেকট্রিসিটির যুগ! এ-দেশে এখনো কেরাসিন তেলের যুগ চলছে। যাও না একবার ভেতর দিকের গাঁ-গ্রামে।”
“ভুল হয়েছে স্যার।” তারাপদ যেন চট করে অপরাধ স্বীকার করে নিল।
“বাঁশবেড়ের হিরুবাবুর নাম শুনেছ? মস্ত বড় শিকারি। এক সময় হাতি ধরে বেড়াতেন। বিরাট ওস্তাদ। হিরুবাবুর কথা হল, ইলেকট্রিক মানেই সর্বনাশ। ওতে চোখ খারাপ হয়, মাথা নষ্ট হয়।”
“তাই নাকি?”
“হিরুবাবু বলেন, রেড়ির তেলের যুগটাই ছিল বেস্ট। রেড়ির যুগ গিয়েছে, রবীন্দ্রনাথ, রামকৃষ্ণ ঠাকুরের মতন মানুষও গিয়েছেন।
তারাপদ হাসতে-হাসতে প্রায় মাটিতেই বসে পড়ে আর কী!
কিকিরা হাসলেন না। গম্ভীর মুখে বার দুই পায়ের দড়ি টানাটানির খেলা খেলে নিলেন।
হাসি থামলে তারাপদ বলল, “স্যার, আপনার লেগ কেমন?”
“পুল করতে পারছি। চাঁদু ডাক্তার কী বলে হে?”
“তিন হপ্তা নড়াচড়া চলবে না। মানে বাইরে বেরোতে পারবেন না।”
“তি-ন হপ্তা! আজ তো মাত্র দশ দিন হল তারাপদ, আরও দশ বারো দিন! আমি পারব না।”
“পারব না বললে চলবে কেন, স্যার! কে আপনাকে খানা-খন্দে পাগলাতে বলেছিল! গোড়ালির হাড় ভাঙেনি–এই যথেষ্ট। পা মচকানোর ব্যথা সারতে। সময় লাগে!”
“চাঁদু জ্বরজ্বালা, আমাশার ডাক্তার, হাড়গোড়ের সে কী বোঝে?”
তারাপদ রগড় করে বলল, “বলব চাঁদুকে। বলব, তুই বোগাস! কিস্যু জানিস না।”
কিকিরা একটু হেসে কথা পালটে বললেন, “বোসো। চা-টা খাও।” বলে চুরুটটা আবার ধরিয়ে নিলেন। ধোঁয়া আসছিল না। জোরে-জোরে টান মেরে ধোঁয়া বার করলেন।
তারাপদ বসে পড়েছে ততক্ষণে। মুখ মুছে নিচ্ছিল রুমালে।
কিকিরা নিজেই বললেন, “চাঁদুকে কাল-পরশু একবার পাঠিয়ে দিয়ে। আমি তিরিশ হাজার টাকা লোকসান দিতে পারব না।”
খেয়াল করে কথাটা শোনেনি তারাপদ, তবে কানে গিয়েছিল। টাকার অঙ্কটা মাথায় থাকেনি। সে কিকিরার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল।
“থারটি থাউজেন্ড ইজ এনাফ।” কিকিরা আবার বললেন।
তারাপদ বোকার মতন বলল, “তিরিশ হাজার!”
“এখন তিরিশ, পরে হাজার পঞ্চাশও হতে পারে।”
তারপদ এবার যেন ধাতে এল। রসিকতা করে বলল, “আপনার লেগ-প্রাইস…? মানে ইনসিওরেন্সের কোনো কমপেনসেশান…”
“দুঃ।” কিকিরা অদ্ভুতভাবে ‘দুঃ’ বললেন।
“লটারি পাচ্ছেন?”
“নো।”
“তা হলে ব্যাপারটা কী? তিরিশ হাজারের সঙ্গে আপনার পা মচকানোর সম্পর্কটা কোথায়?”
কিকিরা বললেন, “কাগজ-টাগজ পড়া হয় মশাইয়ের?”
“হয়। তবে পড়া না বলে চোখ বুলনো বলতে পারেন। কাগজে পাঠ্য বলতে তো মন্ত্রী-সংবাদ…!”
“বুঝেছি। তা একবার ওখানে যাও। ওই যে দেওয়ালে ঝোলানো বাস্কেট দেখছ, ওর মধ্যে তিনটে কাগজ আছে। নিয়ে এসো।”
তারাপদ উঠল।
কিকিরার এই ঘরে না আছে কী? চোরবাজারের দোকানও এমন বিচিত্র নয়। চন্দন কি সাধে বলে, ওল্ড কিউরিয়োসিটি শপ! সেকেলে গ্রামাফোন, পাদরিটুপি, দেওয়াল ঘড়ি, পায়রা-ওড়ানো বাক্স, ম্যাজিক পিস্তল, কালো আলখাল্লা, পুতুল, ভাঙা বেহালা, তরোয়াল, কাঁচের মস্ত বড় বল, আরও কত কী!
দেওয়ালে এক মাদুর কাঠির সরু টুকরি আটকানো ছিল। তারাপদ কাগজ নিয়ে ফিরে এল।
কিকিরা বললেন, “লাল পেনসিলে দাগ দেওয়া আছে। দেখো।”
তারাপদ খবরের কাগজগুলো দেখল। তিন দিনের কাগজ। তারিখ আলাদা। দু-তিন দিন বাদ-বাদ তারিখ। কাগজ একই। লাল পেনসিলের দাগ-দেওয়া জায়গাটা বার করে নিল সে।
“এটা কী স্যার?”
“পড়ো।”
“মনে-মনে, না, জোরে-জোরে?”
“জোরে-জোরে।”
তারাপদ পড়তে লাগল “আমি লোচন দত্ত, পুরা নাম ত্রিলোচন দত্ত, সাতাশের এক, যদু বড়াল লেন, কলকাতা বারোর নিবাসী, এই মর্মে জানাইতেছি যে–জনৈক প্রতারক আমার ছোট ভাই মোহন দত্ত সাজিয়া নানা জনের সঙ্গে প্রতারণা করিতেছে বলিয়া সংবাদ পাইতেছি। আমার ভাই মোহন দত্ত উনিশশো পঁচাশি সালে একুশে অগস্ট মারা গিয়াছে। আমার অন্য কোনো ভাই নাই। আমাদের উক্ত নম্বরের বসতবাটী এবং দত্ত অ্যান্ড সন্স-এর একমাত্র উত্তরাধিকারী আমি ও আমার দুই নাবালক পুত্র–বিশ্বনাথ ও যোগনাথ। মোহন দত্ত আর জীবিত নাই। ওই নামে কেহ যদি কোথাও আমাদের তরফ হইতে ব্যক্তিগত, ব্যবসায়গত ও সম্পত্তিগত কোনো কাজকারবার করেন, আমরা তাহার জন্য দায়ী থাকিব না। উপরন্তু কেহ যদি প্রতারক মোহন দত্ত নামের মানুষটির বিস্তারিত খবরাখবর দেন ও তাহাকে ধরাইয়া দেন–আমাদের। পক্ষ হইতে তাঁহাকে নগদ ত্রিশ হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়া হইবে প্রতিশ্রুতি দিতেছি। যোগাযোগের ঠিকানা : সাতাশের এক, যদু বড়াল লেন, কলকাতা বারো। সময় সকাল আটটা হইতে বেলা দশটা।”
