মাথা নাড়লেন ফকির।”না কিঙ্কর আমি মোটেই তা চাইনি। তুমি কলকাতা থেকে হঠাৎ আমার কাছে সেবার বেড়াতে এলে! এসে দেখলে আমি ঝঞ্ঝাটে রয়েছি। আমি তোমায় সব কিছু খুলে বলতে পারছিলাম না। বিশু তখনো ধাক্কা সামলাতে পারেনি। আমি যে কী করব ঠিক করতে না পেরে বোকার মতন নিজের পায়ে কুড়ল মেরেছি। তোমায় মিথ্যে কথা বলেছি, ছেলেটাকেও জবুথবু করে রেখেছি। তুমি না এলে ব্যাপারটা এতদূর গড়াত না বোধহয়। তবে সত্যি বলছি, পরে আমার মনে হয়েছিল, তুমি যদি কুঠিবাড়ি থেকে মনসামূর্তি উদ্ধার করতে পারো–ভালই হয়। অবশ্য সে-আশা আমার কমই ছিল।”
“কম ছিল, তবু তোমাদের বিশ্বাস ছিল মূর্তিটা এই বাড়িতেই আছে।”
“হ্যাঁ,” অমূল্য বলল, “কাকা যদি ও-ভাবে পালিয়ে যায় তবে মূর্তি কোথায় থাকবে?”
কিকিরা বললেন, “সে-মূর্তি উদ্ধার হবে কেমন করে! তোমাদের ছোটকাকা অনেক আগেই বেচেবুচে দিয়েছেন। বাইরে সন্ন্যাসী হলেও ভেতরে কি তিনি তাই ছিলেন? যে মানুষ বাড়ি থেকে লক্ষ টাকার জিনিস চুরি করে, সে-মানুষ সাধু?” অমূল্য বলল, “তাই যদি হবে, তবে কাকা এসেছিল কেন এখানে?”
“কেন এসেছিল বুঝতে পারো না?”
“না।”
“প্রতিশোধ নিতে। যাকে তোমরা বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছ, বংশ থেকে বাদ দিয়েছ, এক কানাকড়ি সম্পত্তিও দাওনি, সে যে তোমাদের ক্ষমা করবে, একথা বিশ্বাস করা মুশকিল। তার হাতে যতকাল টাকা পয়সা ছিল, ফুর্তি ফাতা করে দিন কাটিয়েছে। তারপর হয়ত তার দুর্দিন গিয়েছে। শেষে যখন বুঝল, তোমাদের ভাইয়ে-ভাইয়ে সম্পত্তি নিয়ে ভাগাভাগি গণ্ডগোল রেষারেষি চলছে, তখন সে এল। এল মতলব নিয়ে। তোমাদের মধ্যে আরও রেষারেষি, খুনোখুনি বাধিয়ে এই বংশ প্রায় শেষ করে দিতে। ধরো, অমূল্য–তুমি যদি বিশুকে সত্যিই খুন করতে, ফকির তোমায় ছাড়ত না, সেও তোমায় খুন করত। দু’তরফে বিদ্বেষ, খুনোখুনি, রক্তারক্তি চলত। তারপর কোথায় গিয়ে এই শত্রুতার শেষ হত, ভগবানই জানেন।”
“কাকা এত নীচ?”
“নীচ, উন্মাদ। তার যদি অনুতাপ হত, সে গাছতলায় বসেই তোমাদের দুজনকে ডেকে মনসামূর্তি ফেরত দিত। কেন সে এই ষড়যন্ত্রের মধ্যে যাবে?”
অমূল্য রাগে কাঁপছিল। বলল, “আমি সেদিন চরণকে বলেছিলাম, ওকে কুকুরের মতন গুলি করে মারতে। আর কোনোদিন যদি দেখতে পাই, আমি তাকে নিজের হাতে গুলি করে মারব।”
“আর কোনোদিন তাকে পাবে না। আর কি সে আসে? …নাও চলো, রাত হয়ে যাচ্ছে।”
ঘরের বাইরে এসে কিকিরা অমূল্যকে বলল, “ওই ঘোরানো সিঁড়ি, ওই জানলার কথা তুমি আগে জানতে?”
মাথা নাড়ল অমূল্য।”না, কেমন করে জানব। এখানে কে আসে? যদি জানতাম, তা হলে কি কাক পালাতে পারত! আমরা ভেবেছিলাম, গুলি খেয়ে জানলা দিয়ে লাফ মেরেছে। পরের দিন খোঁজ করতে গিয়ে সিঁড়িটা দেখি। সিঁড়িটা বড় অদ্ভুত, বাগানে গিয়ে শেষ হয়েছে। গাছপালার মধ্যে। কাকা ওখান থেকেই পালিয়েছে।”
কিকিরা বললেন, “শশিপদ বলেছে, তোমাদের কাকা এখনো বেঁচে আছে।”
“শশিপদ কাকার হয়ে খবরাখবর দিত। আমি তাকে পয়সা দিয়ে কাজে লাগিয়েছিলাম। আজ সে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছে। ভয়ে। সহজে আর আসছে না।”
কুঠিবাড়ির নিচে এসে কিকিরা বললেন, “তোমার লোকজন কোথায়? ডাকো।”
অমূল্য একটু হাসল। তারপর শিস দেওয়ার মতন করে শব্দ করল। তীক্ষ্ণ শব্দ। বলল, “চলুন, ওরা আসবে। পেছনেই।”
হাঁটতে হাঁটতে কিঙ্কর বললেন, “একটা কথা তোমাদের দুজনকেই বলি। রক্তে যদি তোমাদের মামলা-মোকদ্দমা থাকে ভাই, সেটা আর কে রুখবে। তবে এই খুনোখুনি-রক্তারক্তিটা ভাইয়ে-ভাইয়ে না থাকাই ভাল। …তা ছাড়া, যা গিয়েছে তা যখন আর ফিরে আসবে না, তখন তোমরা ও নিয়ে আর চিন্তা কোরো না। তোমাদের কাকা যা চুরি করে নিয়ে পালিয়েছেন, সেটা তোমাদের বংশের সৌভাগ্যের লক্ষ্মী হতে পারে কিন্তু তিনি যা দিতে এসেছিলেন, সেটা দুভাগ্য। তোমরা বেঁচে গিয়েছ।”
ফকির চঞ্চল হয়ে পড়েছিলেন, কিকিরার হাত ধরে ফেললেন আবেগে। বললেন, “কিঙ্কর, আমি তোমার কাছে বড় ছোট হয়ে গেলাম। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি যা করেছি, তা দায়ে পড়ে। বোকার মতন কাজ করেছি। আমায় ক্ষমা করো।”
কিকিরা ফকিরের কাঁধে হাত রেখে হেসে বললেন, “আমি সবই বুঝেছি। নাও, চলো। চলো, অমূল্য।”
পেছনে পায়ের শব্দ শোনা গেল। মুখ ফিরিয়ে তাকালেন কিকিরা। তারপর হেসে অমূল্যকে বললেন, “তুমি দেখছি, অনেক সৈন্যসামন্ত এনেছিলে।”
অমূল্য লজ্জা পেয়ে হাসল।
তারাপদ আর চন্দন কিকিরার পেছনে। চাঁদের আলোয় অতগুলো মানুষ ঘোড়া-সাহেবের কুঠির বাগান দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল, যেতে-যেতে শুনল দমকা বাতাস এসে গাছপালার পাতায় কেমন এক শব্দ তুলেছে।
১.৪ সেই অদৃশ্য লোকটি
০১.
বর্ষার পালা শেষ হয়ে আশ্বিন পড়েছিল। বৃষ্টি তবু বিদায় নেয়নি। মাঝে-মাঝেই এক-আধ পশলা জোর বৃষ্টি হচ্ছিল।
তারাপদ পর-পর দু দিন আটকে পড়ল বৃষ্টিতে। একেবারে বিকেলের শেষে এমন ঝমাঝম বৃষ্টি নেমে গেল দু দিনই যে, সে আর কিকিরার কাছে আসতেই পারল না।
আজ কোথাও কোনো বিঘ্ন ঘটেনি। অফিস থেকে সোজা কিকিরার বাড়ি এসে হাজির তারাপদ।
এসে যা দেখল তাতে চমৎকৃত হল।
কিকিরা যথারীতি তাঁর বসার ঘরেই ছিলেন। এই ঘরটিকে তারাপদরা বলে জাদুঘর। এখানে না আছে কী। দেওয়াল জুড়ে নানান জিনিস, মাটিতেও পা রাখার জায়গা নেই।
