কিকিরা বললেন, “নিশ্চয় খুব মূল্যবান মূর্তি?”
“তা তো হবেই–টাকায় শুধু মূল্যবান নয়, অমন মূর্তি ভূ-ভারতে খুঁজে পাবে কি না সন্দেহ! …আমাদের বংশে ওই মূর্তির অন্য মূল্য। সে তোমরা বুঝবে না। ছোটকাকা ওই মূর্তি নিয়ে পালিয়ে যাবার পর কাকাকে আমরা ত্যাগ করলুম। বাবা আর মেজকাকা শপথ করিয়ে নিলেন, ভবিষ্যতে কোনোদিন ওই কুলাঙ্গার, আর এই বংশের কারও কাছে যেন একদিনের জন্যেও আশ্রয় না পায়। তাকে বিষয় সম্পত্তির এক কানাকড়িও যেন না দেওয়া হয়। আমরা এই প্রতিজ্ঞা ভাঙিনি। কেমন করে ভাঙব?”
কিকিরা বললেন, “বেশ, প্রতিজ্ঞা না হয় না ভাঙলে কিন্তু তোমাদের ছোটকাকা যেন জীবিত, এটা জানতে?”
মাথা নাড়লেন ফকির।”না, আমরা জানতাম, কাকা মারা গিয়েছে। বিশেষ করে সাপের কামড়ে মারা যাবার খবর শুনে আমাদের মনে হয়েছিল, যা হওয়া উচিত তাই হয়েছে। মা মনসাই তাঁর শোধ নিয়েছেন।”
“কিন্তু ওই কাকা এখানে কেন এসেছিলেন? তাঁর উদ্দেশ্য কী ছিল?”
“উদ্দেশ্য কী ছিল, আগে বুঝিনি। যখন খবর পেলাম কাকা এসে ঘোড়া-সাহেবের কুঠির কাছাকাছি রয়েছে, গোপনে দেখা করতে বলেছে–তখন ভেবেছিলাম হয়ত কাকা বুড়ো বয়সে তার কৃতকর্মের জন্যে অনুতাপ জানাতে চায়। তারপর শুনলাম, কাকা আমাদের বংশের সেই মূর্তি আর সাপ নিজের কাছেই গচ্ছিত রেখেছিল, এখন তা ফেরত দিয়ে যেতে চায়।”
“কে তোমায় এ কথা বলেছে?”
“বিশু।”
“তুমি নিজে কেন কাকার সঙ্গে দেখা করতে যাওনি?”
“রাগে, ঘেন্নায়। তা ছাড়া আমি গেলে কাকা কিছু বলত না। বিশুকেই যেতে বলেছিল।”
কিকিরা অমূল্যর দিকে তাকালেন। বললেন, “তুমিও কি নিজে যাওনি, অমূল্য?”
“আমি নিজেই একদিন গিয়েছিলাম। কাকা আমায় ওই একই কথা বলেছিল–দাদা যা বলল।”
“তারপর? সাধুবাবা যেদিন বিশুকে নিয়ে এই কুঠিবাড়িতে এল, সেদিন তুমি নিজে না এসে তোমার শালা চরণকে পাঠালে কেন?”
অমূল্য চুপ। তার মুখ কেমন শক্ত, কালো হয়ে আসছিল। দাঁতে দাঁত চাপল অমূল্য। হঠাৎ দু’হাতে মুখ ঢেকে ফেলল।”আমি বলব না, বলতে পারব না।”
তারাপদ, চন্দন দুজনেই পাথরের মতন দাঁড়িয়ে।
কিকিরা বললেন, “আমি বলছি। জানি না, ঠিক বলছি কি না! …তোমার কাকা তোমায় বলেছিলেন, তিনি বিশুকে ভুলিয়ে কুঠিবাড়ির এই ঘরে নিয়ে আসবেন। তোমার কাজ হবে, বিশুকে গুলি করে মারা। তাকে আগে মারব, তারপর তিনি তোমায় মনসা-মূর্তি দেবেন। তাই না?”
অমূল্য ছটফট করছিল। বলল, “হ্যাঁ। কাকা তাই বলেছিল। কিন্তু আমি অমূল্য রায়। মামলা-মোকদ্দমা, জমিজিরাত নিয়ে লাঠালাঠি ফৌজদারি করতে পারি; নিজের ভাইপোকে গুলি করতে পারি না।”
“নিজের হাতে পারবে না বলে চরণদের পাঠিয়েছিলে?”
অমূল্য রুক্ষভাবে কিকিরার দিকে তাকাল।”হ্যাঁ। …কিন্তু আপনি যা বলছেন, তা নয়। আমি চরণকে বলেছিলাম, ওই শয়তানের কাছ থেকে আগে মূর্তির খবর জেনে নেবে, তারপর তাকে কুকুরের মতন গুলি করে মারবে। বিশুর গায়ে যেন আঁচড় না পড়ে।” কথা শেষ করার আগেই অমূল্য প্রায় কেঁদে ফেলল; জড়ানো গলায় বলল, “আমি ইতর নই, জন্তু নই; বিশুকে চরণরাই যে পরে কুঠির বাইরে এনেছে, সে-খবর আপনি রাখেন?”
“না। তবে আমার সন্দেহ ছিল।”
“দাদা আপনাকে যা বলেছে, আপনি তাই বিশ্বাস করেছেন।”
কিকিরা সামান্য অপেক্ষা করে অমূল্যকে বললেন, “আমি তোমার সমস্ত কথা। বিশ্বাস করছি, অমূল্য। বিশুকে গুলি করার দরকার হলে চরণরা যে-কোনো সময়ে সেটা করতে পারত। সাধুবাবার সঙ্গে বচসা করত না।” বলে অমূল্যের কাঁধে হাত দিলেন, যেন সান্ত্বনা জানালেন।
অমূল্য ক্ষোভের গলায় বলল, “দাদা আপনাকে ভুল বুঝিয়েছে। বিশুর সঙ্গে আমার শত্রুতা নেই।”
ফকির চুপ করে ছিলেন।
কিকিরা ফকিরকে বললেন, “ফকির, তুমি আমার কাছে অনেকগুলো বাজে কথা, মিথ্যে কথা বলেছ। শুধু মিথ্যে বলোনি, নিজের ছেলেটাকে তুমি লোকের চোখের আড়ালে রেখেছ, তাকে অনর্থক একগাদা ঘুমের ওষুধ খাইয়েছ, অ্যাবনরমাল করে রেখেছ! কেন? তোমার কি সবসময় ভয় হত, বিশু স্বাভাবিক থাকলে সব কথা সাফসুফ বলে দেবে?”
ফকির মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকলেন। অনেকক্ষণ পরে বললেন, “হ্যাঁ সে-ভয় ছিল। তবে তোমায় আমি আগেই বলেছি, আমাদের বংশের এমন কয়েকটা কথা আছে, যা আমরা বাইরে বলতে চাই না। বলতে পারি না। বলা নিষেধ। ছোটকাকার কথা, মনসার মূর্তির কথা আমি বাইরে প্রকাশ করতে চাইনি। আজ বাধ্য হয়ে বললাম তোমায়।”
“তা অবশ্য বললে, ফকির,” কিকিরা একটু ইতস্তত করে বললেন, “আমার কিন্তু মনে হচ্ছে, তুমি আমার অমূল্য–দুজনেই আলাদা-আলাদা ভাবে তোমাদের কাকার কাছ থেকে মূর্তিটি পেতে চেয়েছিলে। তার জন্যেই এত!”
ফকির চুপ। অমূল্যও কথা বলল না।
কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর কিকিরা বললেন, “ফকির, আমি যেদিন তারাপদকে নিয়ে তোমার বাড়িতে এলাম, দোতলা থেকে কে বন্দুক ছুঁড়েছিল? তুমি বলছ বিশু। কিন্তু আমার বিশ্বাস হয়নি।”
“আমি ছুঁড়েছিলাম,” ফকির বললেন।
”কেন?”
“তোমায় ঠকাতে চেয়েছিলাম। না না, ঠকানোই বা কেন। আমি তোমায় বোঝাতে চেয়েছিলাম, বিশু কেমনকী বলব–পাগল-পাগল ব্যবহার করছে। …আমায় তুমি ক্ষমা করো, ভাই।”
কিকিরা কেমন ম্লান মুখ করে হাসলেন। বললেন, “আমায় তুমি সব কথা যদি খুলে বলতে ফকির, ভাল হত। তুমি অন্যায় করেছ! তা ছাড়া, আমার মনে হয় তুমি আমায় অন্যভাবে একটা কাজে লাগাতে চেয়েছিলে–সেই মনসামূর্তি যদি আমি খুঁজে বার করতে পারি এই কুঠিবাড়ি থেকে, তাই না?”।
